হামে মৃত্যু থামছে না

পৃথিবীর আলো ভালো করে দেখা হলো না! মাত্র তিন মাসেই নিভে গেল জীবনপ্রদীপ! মায়ের কোল এখন শোকের পাহাড়! আর বাবার বুকজুড়ে হাহাকার! কত স্বপ্ন, কত আশা; সবই যেন দুঃস্বপ্ন! শুরু না হতেই সব শেষ!

হামের উপসর্গ নিয়ে গতকাল বুধবার দুপুরে নেত্রকোনায় তিন মাসের এই শিশুর মৃত্যু হয়। ১৭ মার্চ শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২২ দিন টিকে থাকার সংগ্রাম করেও হেরে গেল।

এর আগে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে ১০ শিশুর মৃত্যু হয়। তার আগের দিনে মৃত্যু হয় আরও ১১ জনের। যাদের একজনের হাম নিশ্চিত হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দুই দিনেই ঝরে গেল ২১টি প্রাণ। গত ২৪ দিনে মৃত্যু হয়েছে ১৫৯ শিশুর।

মৃত্যু রোধে জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সে জন্য একদিকে অতিদ্রুত টিকা কার্যক্রম শুরু করেছে, অন্যদিকে জটিল রোগীদের মৃত্যু রোধে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বাবল সিস্যাপ পদ্ধতিও চালু করা হচ্ছে।

বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে হামের উপসর্গ নিয়ে এক দিনে যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, এদের ৬ জন ঢাকায়, ৩ জন রাজশাহী এবং ১ জন খুলনায়। এ সময়ে হাম সন্দেহজনক রোগী ১ হাজার ২৪৮ জন। নিশ্চিত হাম রোগী ১৮৯ জন।

হাম সন্দেহজনক রোগী ঢাকায় বেশি হলেও মৃত্যু বেশি হয়েছে রাজশাহীতে। ঢাকায় হাম সন্দেহজন রোগী ৪ হাজার ৬৬৭ জন। মৃত্যু হয়েছে ৫৭ জনের। রাজশাহীতে হাম সন্দেহজন রোগী ২ হাজার ২৩ জন। মৃত্যু হয়েছে ৬১ জনের।

টিকাদান কর্মসূচি : হাম প্রতিরোধে গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ৩০ উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি সিটি করপোরেশন এলাকায় আগামী ১২ এপ্রিল থেকে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটিতে এই কার্যক্রম চালু হবে। পরে ৩ মে থেকে তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করার কথা থাকলেও তা এগিয়ে আনা হচ্ছে। সংসদে প্রশ্ন উত্তরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন আগামী ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে টিকা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।

এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারগুলোর ব্যর্থতায় দেশে হামের প্রকোপ বেড়েছে। টিকা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা না হওয়া এবং যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তবে বর্তমান সরকার হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং টিকাদান কার্যক্রম সফল করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

টিকা শুরু হলে দুই সপ্তাহ পর মৃত্যু কমে আসবে : জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জীবাণুবিদ (লিড ভাইরোলজিস্ট- এনপিএমএল ল্যাব) ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, সারা দেশে ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরুর দুই সপ্তাহ পর হামের প্রাদুর্ভাব কমে আসতে শুরু হবে।

যেসব শিশুর মৃত্যু হচ্ছে তাদের পুষ্টিহীনতায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। সরকার সেই বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে পুষ্টির ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা করছে। জানা গেছে এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক সিনিয়র স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার।

ছয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বাবল সিপ্যাপ, আশঙ্কামুক্ত ২৯ শিশু: আইসিডিডিআর,বির কমিউনিকেশনস হেড একেএম তারিফুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বাবল কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশারের (বিসিপ্যাপ) ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশের ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ২৯ জন শিশু এই সেবা গ্রহণ করেছে। এই স্বল্পমূল্যের জীবনরক্ষাকারী পদ্ধতি সময়মতো প্রয়োগে এ শিশুরা বড় রকমের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেয়েছে। তাদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়েছে যারা আরও স্বাস্থ্য জটিলতা সৃষ্টির ঝুঁকিতে ছিল, যার চিকিৎসায় আরও জটিল ও কম সহজলভ্য।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতী ও তার সহকর্মীদের উদ্ভাবিত বাবল সিপ্যাপ একটি সহজলভ্য শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়তা পদ্ধতি। এটি গুরুতর নিউমোনিয়া ও হাইপোক্সেমিয়ায় (রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা) আক্রান্ত শিশুদের ফুসফুস সচল রাখতে এবং অক্সিজেন সরবরাহ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এই কার্যক্রমের সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আইসিডিডিআর,বি এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিনামূল্যে বাবল সিপ্যাপ সেটআপ প্রদানসহ হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ এবং সার্বক্ষণিক ক্লিনিক্যাল সাপোর্ট হটলাইন সেবা দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেশব্যাপী ৩০টিরও বেশি হাসপাতালের ৭৫ জনেরও বেশি চিকিৎসক ও নার্সকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যা তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে অবিলম্বে বাবল সিপ্যাপের ব্যবহার করে চিকিৎসাসেবা শুরু করতে সক্ষম করে তুলবে।

ময়মনসিংহে মৃত্যু ৮ জন : প্রতিনিধি মো. মঈন উদ্দিন রায়হান জানান, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন মাস বয়সী শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হামজনিত মৃত্যু বেড়ে দাঁড়াল ৮ জনে।

শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম মাওলা জানান, গত ১৭ মার্চ নেত্রকোনা থেকে আসা তিন মাস বয়সী শিশুটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। শিশুটির পাশাপাশি অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতাও ছিল।

মৃত ৪৬ শিশুর কারও শরীরেই মেলেনি হামের জীবাণু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক (রাজশাহী) আহসান হাবীব অপুকে জানিয়েছেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে উপসর্গ থাকলেও রামেক হাসপাতালে মারা যাওয়া রোগীদের কারও শরীরেই হামের জীবাণু পাওয়া যায়নি। এটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গবেষণা দরকার। হামে যেহেতু মারা যায়নি, তাহলে কী কারণে মারা গেল এটি জানতে পারলে চিকিৎসাব্যবস্থা সহজ হবে।

শরীয়তপুরের জাজিরায় প্রকোপ বেড়েছে : শরীয়তপুর প্রতিনিধি মো. ছগির হোসেন জানিয়েছেন, এ  জেলায় এ পর্যন্ত ১১১ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জাজিরা উপজেলায়। এক রোগীর বাবা নোমান সিদ্দিক জানান, চার দিন মেয়েকে নিয়ে সদর হাসপাতালে আছি। ডাক্তার ঠিকমতো পাই না। সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এটা নামেই হাসপাতাল, কাজে নেই।

শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, মৃত্যুর হার ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে জাজিরা উপজেলায় হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে। আগামী তিন সপ্তাহে জাজিরায় অন্তত ৩০ হাজার শিশুকে এই টিকার আওতায় আনা হবে।

হাম নিয়ে সংসদে রুমিন ফারহানার উদ্বেগ : দেশে হামের সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ নিয়ে সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দেশে হামের টিকার মজুদ স্থিতিশীল আছে। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে হামের টিকাদান শুরু হবে। গতকাল বুধবার সংসদ অধিবেশনে দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিস উত্থাপন করেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা ব্যবস্থাপনায় অবহেলার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। সেই সংকট কাটিয়ে উঠছে সরকার। হামের টিকা নিয়ে কোনো সংকট নেই। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি আরও বলেন, যারা গত ৯ মাস যাবৎ বেতন পাচ্ছেন না, তাদের বেতন পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা শুরু হয়েছে। অন্য সমস্যাগুলোও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাম নিয়ে অযথা আতঙ্ক না ছড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদকে জানান, এ পর্যন্ত ২ কোটি ১৯ লাখ হামের টিকা পাওয়া গেছে। মজুদ আরও রয়েছে। দুর্নীতি ও বিলম্ব এড়াতে এবার টেন্ডার প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে সরাসরি ইউনিসেফ থেকে টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ৫ এপ্রিল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলাগুলোয় টিকা কার্যক্রম চালানোর জন্য ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ডোজ টিকা বিতরণ করা হয়েছে। এক ভয়েলে ১০ ডোজ টিকা দেওয়া যায়। হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইনের জন্য সরকার সর্বমোট ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহ করেছে। তিনি আরও জানান, ইউনিসেফের মাধ্যমে ৪১৯ কোটি টাকার ভ্যাকসিন ক্রয় প্রক্রিয়া চূড়ান্তপর্যায়ে রয়েছে। ইপিআই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদ- অনুযায়ী কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা বজায় রেখে ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও পরিবহন নিশ্চিত করছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ টিকা আমাদের আছে এবং কোল্ড চেইন রক্ষা করা হচ্ছে। এ সময় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনকে উদ্দেশ করে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, রোগীকে ভয় দেখাতে হয় না, সাহস দিতে হয়। আমি তো জানতাম, আমি ৩০০ জন সংসদ সদস্যের সামনে কথা বলছি। ৩০০ জন হামের রোগীর সামনে তো আমি কথা বলছি না। তিনি বলেন, এই সংসদে যারা বসেছেন আপনারা কোনো না কোনো সন্তানের পিতা এবং বলা হয় সন্তানের পিতার কাঁধে সন্তানের লাশের চেয়ে আর ভারি কিছু হতে পারে না। এই যে, আমরা যে পরিসংখ্যানগুলো দিচ্ছি এই শিশু কোনো না কোনো পিতার কাঁধে কবরে গেছে। সুতরাং এটাকে কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে একটা মায়ের কান্না, একটা পিতার আর্তনাদ, একটা পরিবারের ধস এবং চিরজীবনের জন্য একটা পরিবারে যে শোক নেমে আসে সেটার দিকে আমরা একটু তাকাই। রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী বলেন, আল্লাহর রহমতে সন্তানের পিতা আমরা সবাই। কাজেই আমাদের দরদ আছে। সন্তান মারা গেলে পিতার কাঁধে যে এটার ভার কত বেশি, এটাও জানি।