মালয়েশিয়ায় ‘টিটি আল্ট্রা-২০২৬’ ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন মাহফুজুল হক

দেশর অন্যতম দৌড়বিদ এম মাহফুজুল হক ওরফে ‘মাহফুজ শাওন’ এবার বড় চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা লক্ষ্যে নিজেকে প্রস্তুত করছেন। জানা গেছে ‘টিটি আল্ট্রা-২০২৬’ নামের ইভেন্টে অংশ নিতে যাচ্ছেন তিনি।  ইভেন্টটি মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর রাজ্যে হতে যাচ্ছে। ২৫০ কিমি দূরত্বের মাইলফলক অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জ নিতে যাচ্ছেন তিনি। যেখানে তাকে ৪৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে ৩৯০০ মিটারেরও বেশি এলিভেশনসহ উল্লিখিত দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। সময়সীমা এবং এলিভেশন এর চ্যালেঞ্জকে ছাড়িয়েও এবারের যাত্রার সবচেয়ে বিশাল প্রতিকূলতা থাকবে প্রচন্ড গরম এবং হিউমিডিটি। আগামী ২৪ এপ্রিল বেলা ২টায় শুরু হবে মাহফুজের চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে দেশের সবার কাছে মাহফুজ সবার কাছে দোয়া প্রার্থী। 

বন্ধু মহল, সহকর্মী এবং রানিং কমিউনিটির অনেকেই তাকে ‘মাহফুজ শাওন’ সম্বোধন করে থাকেন। মাহফুজ  পেশায় একজন শিক্ষক এবং কোচ। তিনি দেশের একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজেরর শারীরিক শিক্ষা বিভাগের একজন প্রভাষক। কলেজের অ্যাথলেটিকস এবং ফুটবল দলেরও কোচ তিনি। দৌড়ের জগতে মাহফুজের সবচেয়ে উল্লখযোগ্য অর্জন হলো মরুভূমির বুকে ২২০ কিমি এর একটি ডেজার্ট আল্ট্রা ম্যারাথন এ বাংলাদেশের পতাকা বহন করা এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করা।

২০১৯ সালে ভারতের জয়সালমীর এ অনুষ্ঠিত ‘আল্ট্রা টাফম্যান ডেজার্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৯ এর ২২০ কিমি ক্যাটাগরিতে অংশ নেওয়া এবং সেখানে পোডিয়াম পাওয়াকে নিজের সেরা অর্জন বলে মনে করেন মাহফুজ। প্রতিযোগিতায় তিনি তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। সেখানে তিনি ২২০ কিমি  দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় নেন ৪৪ ঘন্টা ৫০ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড। এছাড়াও একই জায়গায় তিনি আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে  অনুষ্ঠিত ‘আল্ট্রা টাফম্যান ডেজার্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৮' এর ১৬১ কিমি ক্যাটাগরিতেও অংশ নিয়েছিলেন এবং সেই প্রতিযোগিতায়ও তিনি দ্বিতীয় রানার আপ হয়েছিলেন,যেখানে তিনি ১৬১ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন  ৩৩ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট ২৯ সেকেন্ড সময় নিয়ে। ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো মাহফুজ ১০,০০০ মিটারেরও অধিক দূরত্বের  কোনো একটি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

‘ঢাকা হাফ ম্যারাথন’ টাইটেলের এ প্রতিযোগিতার ২১.১ কিলোমিটার ক্যাটাগরিতে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় রানার আপ হন তিনি। পরের বছর তিনি একই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছিলেন । এগুলো ছাড়াও দেশের বাইরের একাধিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সফলতার সাথে সম্পন্ন করার কৃতিত্ব রয়েছে তার।  তার পুরস্কারের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত ‘Albatross Ultrail 2025’ প্রতিযোগিতাটির ৮৩ কিমি ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত  এ প্রতিযোগিতাটির ৮৩ কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিতে তিনি সময় নেন ১২ ঘন্টা তেইশ মিনিট। 

মাহফুজ ছোটবেলা থেকেই চঞ্চল প্রকৃতির। খেলাধুলায়ই বেশি মত্ত থাকতেন। সুযোগ পেলেই বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে চলে যেতেন। এ জন্য মা-বাবার বকুনিও কম খেতে হয়নি। তাতেও কাজ হচ্ছে না দেখে একপর্যায়ে ছেলেকে ‘ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে’ ভর্তি করে দেওয়া হলো। উদ্দেশ্য, খেলা থেকে দূরে রেখে পড়াশোনায় মনোযোগী করা। কিন্তু এটা যেন মাহফুজের জন্য শাপে বর হলো। এখানে তিনি আগের চেয়ে আরও বেশি খেলার সুযোগ পান। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ভারী করতে থাকেন পুরস্কারের ঝুলি। সেই স্কুলপর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত  পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাও চালিয়ে গিয়েছেন  সমানতালে। দীর্ঘ হয়েছে  পুরস্কারের তালিকা।

মাহফুজের দৌড়বিদ হওয়ার গল্পটাও মজার। তিনি বলেন ‘২০০৪ সাল। অলিম্পিক গেমস চলছে। সেবার আমাদের হোস্টেলে সিনিয়রেরা প্রতীকী অলিম্পিকের আয়োজন করে। দুই কিলোমিটারের একটা দৌড় ছিল যার নাম দেওয়া হয় ম্যারাথন। বেশ আগ্রহী হয়ে তাতে নাম লেখালাম। মজার ব্যাপার হলো, সেখানে প্রথম হলাম আমি’।

দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ৮০০ মিটার ও ১৫০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। কলেজে উঠে দুটিতেই সেরা হয়েছিলেন। এমনকি আন্তঃকলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ঢাকা জোনেও ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পরপর তিনবার ৮০০ ও ১৫০০ মিটার দৌড়ে সেরা হয়েছিলেন। পড়াশোনা ঠিক রেখেই করেন সব কিছু। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছেন। কলেজের পাট চুকিয়ে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনফরমেশন টেকনোলজি বিভাগে। ক্যাম্পাসে এসেই তিনি প্রথম বারের মতো অংশ নেন ৫ কিলোমিটার ও ১০ কিলোমিটার প্রতিযোগিতায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পূর্বে তার সর্বোচ্চ অতিক্রান্ত দূরত্ব ছিলো ১৫০০ মিটার। ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ৫০০০, ১০০০০ এবং ১৫০০ মিটার-এ তিন ক্যাটাগরিতেই চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। ৮০০ মিটারে হন দ্বিতীয়।

তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ ২ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে ৮০০ মিটার, ৪ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে ১৫০০ মিটার, ১৭ মিনিট ২৮ সেকেন্ডে পাঁচ হাজার মিটার এবং ৩৭ মিনিট ১৫ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে ১০ হাজার মিটার পথ দৌড়ে অতিক্রম করেছেন। তিনি ৪ বার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেরা খেলোয়াড়’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। এমনকি আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয়ের ৫কিমি দৌড়েও তার রয়েছে গোল্ড মেডেল।যেকোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে অন্তত ৪ থেকে ২ মাস আগে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন মাহফুজ। ব

ললেন, ‘কেমন দূরত্বের ইভেন্ট এ অংশগ্রহণ করতে হবে সে অনুযায়ী সম্ভাব্য ট্রেনিং ব্লক ঠিক করি। প্র্যাকটিসের সময় নিউট্রিশন মেইনটেইন করি। অন্যান্য যেকোনো খেলার মতোই আল্ট্রা ম্যারাথনেও ঝুঁকি রয়েছে। শুরুর দিকে ছোটখাটো চোটও পেয়েছিলাম। এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সঠিক এবং পর্যাপ্ত ট্রেনিং এর ঘাটতি থাকলে আল্ট্রা দূরত্বের ইভেন্ট গুলো তে ব্যার্থ হওয়ারও যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে।