যত ভোগান্তি সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে

বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহরিফ ইসলাম খুলনা যাওয়ার উদ্দেশে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন রাজধানীর সায়েদাবাদে সোহাগ পরিবহনের কাউন্টারের সামনে। তিনি একটু পর পর কমলাপুরের দিকে তাকাচ্ছেন। অপেক্ষা কখন আসবে নির্ধারিত বাস। এ ছাড়া সোহাগ পরিবহনের কোনো বাস দেখলেই দৌড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বাসের কাছাকাছি গিয়ে হেলপারের কাছে সেটি তার বাস না শোনার পর ফুটপাতের ওপর উঠে বিরক্তি প্রকাশ করেন। 

দেশ রূপান্তরের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বুধবার রাতে অনলাইনে টিকিট কিনেছি। বৃহস্পতিবার (গতকাল) বেলা ২টায় সায়েদাবাদ থেকে গাড়ি ছাড়ার কথা। এসে দেখি কাউন্টার ভাঙচুর করা এবং শাটারে তালা ঝোলানো। পরে সোহাগের কল সেন্টারে কল করে বাসের সুপারভাইজারের নম্বর নিয়ে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি।’

মাহরিফ ইসলাম বলেন, ‘ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় দাঁড়িয়ে। কোথাও বসার জায়গা নেই। শহরের মধ্যে জ্যামের ভোগান্তিতে না পড়ার জন্য সায়েদাবাদ থেকে বাসে ওঠার পরিকল্পনা করেছিলাম। এখন চরম বিপাকে পড়তে হলো।’

শুধু মাহরিফই না, তার মতো অসংখ্য যাত্রী সায়েদাবাদ বাস কাউন্টারে এসে ভোগান্তিতে পড়েন। গত বৃহস্পতিবার বেলা ১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত গোলাপবাগ মোড় থেকে সায়েদাবাদের জনপদ মোড় পর্যন্ত এমনই চিত্র দেখা গেছে। সরেজমিন দেখা যায়, গোলাপবাগ মোড় থেকে একটু সামনেই সৌদিয়া পরিবহন, এরপর হানিফ পরিবহন, তারপর সোহাগ পরিবহন পর্যায়ক্রমে শ্যামলী ও গ্রিন লাইনসহ জনপদ মোড় পর্যন্ত ৯৮টি বাসের টিকিট কাউন্টার ছিল। সব কাউন্টারের বিলবোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সব বাস কাউন্টার সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় গতকাল বৃহস্পতিবার সায়েদাবাদ বাস কাউন্টারগুলোর সামনে দেখা গেছে উপচে পড়া ভিড়। এদিন ভোগান্তির শিকার আরেক যাত্রী আরিফ রাইয়ান। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘স্ত্রী, শিশুসন্তান ও মাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর উদ্দেশে বের হয়েছি। সায়েদাবাদ বাস কাউন্টারে এসে দেখি এই অবস্থা। এখন আরামবাগ ও কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা বাসে উঠতে হবে। দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ফুটপাতেই অপেক্ষা করছি।’

সায়েদাবাদ এলাকায় সব বাস কাউন্টার সিলগালা করায় কাউন্টারের কর্মীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে টিকিট ইস্যু করে বাসে যাত্রী তুলছেন। বাকির হোসেন নামের একজন কাউন্টার কর্মী বলেন, ‘বৃহস্পতিবার এসব এলাকায় পা ফেলার জায়গা থাকে না। কিন্তু এখন যাত্রীর চাপ কম। তবে যারা আসছেন, তাদের টিকিট দেওয়া হচ্ছে।’ অভিযোগের সুরে তিনি বলেন, ‘৩০ মিনিটের নোটিশে সব কাউন্টার বন্ধ করে দিয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।’

সৌদিয়া পরিবহনের ম্যানেজার আবু বকর সবুজ বলেন, ‘সরকার ঢাকা সিটির মধ্যে থাকা সব বাস কাউন্টার টার্মিনালে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। এজন্য নোটিস দিয়ে কাউন্টারগুলো বন্ধ করেছে।’ তবে কাউন্টারগুলো সিটি করপোরেশনের টার্মিনালের মধ্যে যেতে চায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেখানে যাত্রী ওঠানামাসহ কোনো পরিবেশ নেই। নিরাপত্তা নেই।’ তিনি বলেন, ‘নতুন করে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার জন্য এই অভিযান।’

প্রসঙ্গত গত ২৯ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপসচিব মোহম্মদ নাছিম আহমেদের সই করা একটি আদেশে এক সপ্তাহের সময় বেঁধে নোটিস জারি করা হয়। ওই নোটিসের পরেও সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের বাইরে সড়কের পাশের টিকিট কাউন্টার সরিয়ে না নেওয়ায় এগুলো বন্ধ করে দেয় সিটি করপোরেশন।

এদিকে ১১ এপ্রিলের মধ্যে শহরের মধ্যের বাস কাউন্টার সরিয়ে না নিলে বন্ধ করে দেওয়ার গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যানজট নিরসন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও উন্নত নাগরিক সেবা প্রদানে ঢাকা মহানগরে অনুমোদনহীন বা রুট পারমিট ছাড়া পরিচালিত আন্তঃজেলা নাইট কোচ কাউন্টার অপসারণ প্রয়োজন। সাত দিনের মধ্যে মহানগরের অভ্যন্তরে অবস্থিত আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল এলাকা (গাবতলী, মহাখালী ও সায়দাবাদ) ছাড়া শহরের অন্য কোথাও বাস কাউন্টার পরিচালিত হলে তা উচ্ছেদ করা হবে।

সায়েদাবাদ টার্মিনালের অবস্থা : গোলাপবাগ থেকে বাস টার্মিনাল শুরু। টার্মিনালে প্রবেশের পরই রয়েছে চট্টগ্রামসহ ওই রুটে যাত্রায়াতকারী যাত্রীদের জন্য একটি কাউন্টার। তবে সেখানের পরিবেশ দুর্গন্ধময় এবং অস্বাস্থ্যকর। কাউন্টারজুড়ে ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা। যাত্রীদের বসার জায়গায় শুয়ে-বসে রয়েছেন বাসশ্রমিকরা। কোথাও তারা জটলা পাকিয়ে লুডু খেলছেন। এরপর দক্ষিণবঙ্গ টার্মিনাল। সেখানকার কাউন্টারে লোকজন দেখা গেলেও যাত্রীর দেখা মিলেছে হাতেগোনা। এখানে পাশাপাশি সিলেট টার্মিনাল, বরিশাল টার্মিনাল, কুমিল্লা টার্মিনাল ও সিটি টার্মিনাল। পুরো টার্মিনালের ভেতরে যাত্রীদের ওঠা-নামার কোনো পরিবেশ চোখে পড়েনি।

টার্মিনালে ভেতরে যাত্রীদের জন্য নেই কোনো বিশ্রামগার। শৌচাগারও মানসম্মত নয়। এ ছাড়া চুরি-ছিনতাইয়ের প্রভাব বেশি হওয়ায় যাত্রীরা রাস্তাতেই নেমে পড়েন। টার্মিনালজুড়ে টং দোকানের অনুমতি দিয়ে ভাড়া আদায় করছে সিটি করপোরেশন। ধারণক্ষমতা না থাকলেও একটা টার্মিনালের ছাউনিতে ১৫-২০টি বাস কাউন্টারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টিসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে যাত্রীদের সুরক্ষার জন্যও রাখা হয়নি কোনো ব্যবস্থা।

এ বিষয়ে ডিএমপির মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘সায়েদাবাদে বাস কাউন্টার সিলগালা অভিযান পুলিশের না। সেটা সিটি করপোরেশন চালিয়েছে।’

৫০ অবৈধ বাস কাউন্টার সিলগালা : সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল এলাকার সড়কে শৃঙ্খলা ও যানজট নিরসনে গতকাল উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। অভিযানে স্টারলাইন, হিমাচল, শ্যামলী, সাকুরা, লাবিবা, শান্তি, ইকোনো, সারা এক্সপ্রেস, ইউনিক লাক্সারি, দোলা, গোল্ডেন পরিবহনসহ মোট ৫০টি বাস কাউন্টারে ১০০টি তালা লাগিয়ে সিলগালা করা হয়।