দেশের জ্বালানি সক্ষমতার ঘাটতি দৃশ্যমান হয়েছে

শিল্প-কারখানায় পণ্য উৎপাদন, বিপণন, পরিবহনসহ জন-জীবনের সবক্ষেত্রে জ্বালানির বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের ফলে বিশেষ করে জ্বালানি খাতে দেশের সক্ষমতার ঘাটতির বিষয়টি ফুটে উঠেছে। এতে সংশ্লিষ্ট খাতে দীর্ঘদিনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যবসায়ীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ঢাকা চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে তারা এমন মতামত দিয়েছেন। এ সময় সংকট সমাধানে সংরক্ষণে সক্ষমতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির আহ্বান জানান তারা।

‘বৈশি^ক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। অনুষ্ঠানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান প্রধান অতিথি এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম খান ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার (অব.) বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদান করেন।

সভাপতির বক্তব্যে তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের সব স্তরের দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে অফশোর ও অনশোরে গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো, জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, সৌর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিদ্যমান শুল্কহার হ্রাস, এ খাতের উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা প্রদানসহ সর্বোপরি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দীর্ঘসূত্রতা কমানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা একান্ত অপরিহার্য।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেন, বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি বাণিজ্য প্রতিদিন হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় এবং বাংলাদেশ মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে, যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডলার সংকটের কারণে আমাদের জ্বালানি খাত বর্তমানে একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুদ ক্রমশ কমে যাচ্ছে, যা দ্রুত আমদানির মাধ্যমে সমাধান করা না হলে পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।

ডিসিসিআই সভাপতি জানান, বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বছরে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় এবং যদি তেলের দাম ১২০ ডলারের ওপরে উঠে, তবে অতিরিক্ত জ্বালানি খাতে খরচ বাড়বে বছরে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার বা ৬১০ বিলিয়ন টাকা, ফলে সরকারের লোকসান বাড়বে পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালন ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট উৎপাদন ব্যয় ২৫ থেকে ৩০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রতি কন্টেইনার অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে এবং সর্বোপরি জীবনযাত্রায় ব্যয়ের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। বিদ্যমান জ্বালানি সংকটে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি সরবরাহ, সংগ্রহ ও স্বল্পমেয়াদি কৌশল গ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প সচিব বলেন, জ্বালানি প্রাপ্তির স্বল্পতা অনেক দিন ধরেই রয়েছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এটিকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী জুন পর্যন্ত কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য দেশে ৬ লাখ টনের সার মজুদ রাখা প্রয়োজন, যদি গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ঘাটতি থাকবে প্রায় ৪ লাখ টন।

তিনি বলেন, এ খাতে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা হ্রাসে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার, তবে গ্যাস অনুসন্ধানে সরকারের সক্ষমতা যেমন কম, সেই সঙ্গে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়াতে শৈথিল্যতার বিষয়টি বিদ্যমান রয়েছে, যা বেগবান করা প্রয়োজন।

সচিব জানান, বিদ্যুৎচালিত যানবাহনবিষয়ক একটি নীতি সম্পন্নের শেষপর্যাায়ে রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, যা শিগগির চূড়ান্ত করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আমাদের রাজস্ব নীতিমালা অনেকক্ষেত্রে ভোক্তাসহায়ক নয়, যার সংস্কার দরকার। এ ছাড়াও শিল্প মন্ত্রণালয়াধীন রুগ্ন শিল্প-কারখানাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে স্থানীয় ও বৈদেশিক উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান শিল্প সচিব। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলার একটি কার্যকর পন্থা হতে পারে, তবে শিল্পসহ অন্যান্য খাতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অফশো ও অনশোরে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া, বিজিএমইএর সহ-সভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক, বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. সিরাজুল মাওলা, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা নাজমুল হক প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।