সরকারি দল বিএনপি সব শেষ করে দেওয়ার অপকৌশল নিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা আজ মুখের উপরেই বলেছি, আপনারা(সরকার দল) ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। আপনাদের উপর আমাদের কোন আস্থা নাই। উনারা সব শেষ করে দেওয়ার অপকৌশল নিয়েছেন। সেই অপকৌশলের ফাঁদে আমরা পা দিতে চাইনি বলেই তো ওয়াকআউট করেছি। শুক্রবার(১০এপ্রিল) রাতে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই সংসদ ফাংশন শুরু করেছে গত ১২মার্চ থেকে। বিধি মোতাবেক বিগত সরকারের অর্থাৎ ইন্টেরিম গভমেন্টের ১৩৩টা জারি করা অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়, বিধি মোতাবেকই হয়েছে, এটাই নিয়ম। উত্থাপনের ৩০ পঞ্জিকা দিবসের ভেতরে এটা নিষ্পত্তি করতে হবে। ওই দিনই সংসদ থেকে একটা বিশেষ কমিটি করে দেওয়া হয়। এই বিশেষ কমিটি সরকারি দলের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জায়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে করা হয়। সরকারি দল ছিল, বিরোধী দল ছিল। আলাপ-আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন সেশন হয়েছে। বিভিন্ন সেশনের পরে হঠাৎ করে দেখা গেল যে একটা রিপোর্ট তৈরি হয়ে গেছে।
আমরা বিরোধী দলের যারা মেম্বার ছিলেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম এই যে বিশেষ কমিটির রিপোর্ট তৈরি হয়েছে এটা আপনারা একসাথে বসে ফাইনাল করেছেন? না এই ধরনের তো চূড়ান্তকরণ কোন বৈঠকই হয়নি। আমরা তখন বললাম যোগাযোগ করেন। তারা যোগাযোগ করলেন। যোগাযোগ করে দেখা গেল যে শুধু সরকারি দলের সদস্যরা মিলেই তাকে একটা ফাইনাল করে ফেলেছে। উচিত ছিল সবাই মিলেই ফাইনাল করা। অথবা ওখান থেকে দুই তিন/চারজনকে দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া। যেখানে সরকারি ও বিরোধী দল থাকবে। তার কোনটাই করা হয়নি। এরপরে আমাদের আপত্তির মুখে কিছু কিছু জিনিস সংযোজন করা হয়েছে। এটা তো সঠিক সুস্থ ধারা হলো না। ওখান থেকেই শুরু হয়ে গেল সমস্যা।
তিনি বলেন, আমরা দেখলাম যে বিলের রিপোর্টের একটা জায়গায় ক, খ, গ ইত্যাদি ভাগ করা হয়েছে। আমরা এটা দেখে পরবর্তী কার্য উপদেষ্টা কমিটির যে মিটিং ছিল সেই মিটিংয়ে আমরা বললাম যে ১৩৩ টা অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপিত উত্থাপন হয়েছে। অধ্যাদেশগুলোর উপর যে বিশেষ কমিটি করা হয়েছে, সেই কমিটির ফাংশন হল আবার তারা এটার উপরে কাজ করে এইটাকে সংসদে এনে উত্থাপন করবে। তারা তো এখান থেকে বাদ দেওয়া বা কিছু রাখার, কিছু ছাড়ার অধিকার রাখে না। এটা সংসদের প্রপার্টি। কাজেই আমাদের দাবি হচ্ছে ১৩৩ এর সবগুলো অধ্যাদেশ নিয়েই এখানে আলোচনা হতে হবে। এটা নিয়ে দীর্ঘ সময় কার্য উপদেষ্টা কমিটির মিটিংয়ে এটার আইনি দিক, সুবিধা, অসুবিধা।নিয়ে মন্ত্রীরা অনেকে কথা এনেছেন। শেষ পর্যন্ত আমাদের যুক্তির সাথেই একমত হয়ে স্পিকার বলেছেন-প্রত্যেকটাই আলোচনার জন্য আসবে, আনতে হবে। এর জন্যে আমরা শুক্রবার দিন সরকারি ছুটির দিনও আমাদের সংসদ বসার দরকার পড়বে। রাত ১২টা হলেও সবকিছু আলোচনা করে আমরা নিষ্পত্তি করবো। আমরা রাজি হয়েছি।
তিনি বলেন কিন্তু আজকে কি হলো? আমরা দেখলাম জাতির নিরাপত্তার স্বার্থের সাথে জড়িত, প্রত্যেকটি নাগরিকের জীবনের সাথে জড়িত সবগুলোকে উপেক্ষা করে এটাকে ল্যাপসের খাতায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। তারা আজকে এগুলো উত্থাপনই করবে না। সর্বশেষ বিলের আগে ছিল জুলাই জাদুঘর বিল। জুলাই জাদুঘর বিলে সবাই ঐক্যমত্য হয়েছিল। যেভাবে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করেছে, এটাকে ইনটেক্ট রেখেই পাশ করা হবে, সংসদে আনা হবে। উত্থাপনও হলো সেইভাবে। হঠাৎ করে দেখা যায় সরকারি দলের একজন তিনি হাত উঠালেন। সাধারণত বিল উত্থাপন করে সরকারি দল কনসার্ন বা আপত্তি থাকলে হাত উঠায় বিরোধী দল। এখানে হাত উঠালেন একজন সরকারি দলের সদস্য, স্পিকার প্রথম তাকে বসিয়ে দিলেন তারপরে তাকে কথা বলার সুযোগ দিলেন। দেওয়ার পরে তিনি তিনটা সংশোধনী এখানে নিয়ে আসলেন। তিনটা সংশোধনীর ব্যাপারে আমাদের নীতিগত আপত্তি আছে। তার চাইতে বড় আপত্তির জায়গাটা হলো যে আমরা তো জানলামই না যে কি সংশোধনী উনি এনেছে। এটা জানার সুযোগ হয় নাই। তারা বলবেন মেমোতে দিয়েছেন।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, হঠাৎ করে এটাকে একটা দলীয় শেপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বলা হলো, মন্ত্রণালয় যেহেতু এটা তদারকী করবে কাজেই মন্ত্রী না থাকলে এটা হবে কিভাবে? পরে তারা খোলামেলা বলেই ফেললেন যদি এখানে সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণ না থাকে তাইলে এটা চলবে কিভাবে? এমনকি আমাদেরকে বুঝ দেওয়ার জন্য এটাও বলে ফেললেন যে আজকে আপনারা বিরোধী পক্ষে বসেছেন আগামীতে তো আপনারা সরকারি দলে আসতে পারেন তখন এই সুবিধাটা আপনারাও নেবেন। আমরা বললাম শেইম(লজ্জা)। আমরা এখানে সুবিধা নেওয়ার জন্য আসিনি। আমরা এসেছি জনগণের অধিকার রক্ষার করার জন্য। ওরকম হলেও আমরা এটা চাইনা। শেষ পর্যন্ত আমাদের কোন আপত্তি স্পিকার শুনলেন না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদেরকে কমপক্ষে একদিন আগে এই সমস্ত ডকুমেন্ট সাপ্লাই দেওয়ার কথা। সেইটাও দেওয়া হয়নি। আমরা গিয়ে বসেছি এক ঘন্টা আগে। একটার পরে একটা, এক বস্তা কাগজ আমাদের সামনে আসছে। তাহলে আমরা যেটা দেখলাম না, যেটা শুনলাম না, যেটা নিয়ে চিন্তা করলাম না, সেখানে আমরা রায় দেই কিভাবে? তারপরেও যেহেতু সরকারি দল বিরোধী দল মিলে বিশেষ কমিটি হয়েছিল এবং যে সমস্ত বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন আমরা তাদের উপরে আস্থা রেখেছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে এই আস্থাটাও সরকারি দল ভঙ্গ করেছে। তারা যুক্তি দেখালেন মন্ত্রী ছাড়া সকল সদস্যই বেসরকারী। কিন্তু যদি বেসরকারি হয়ে থাকেন তাহলে আপনি সংস্কৃতি মন্ত্রী আপনি এটা গ্রহণ করলেন কেন? আপনি গ্রহণ করার মাধ্যমে তো আর এটা বেসরকারি থাকলো না। এখন তো আপনার মেমো হিসেবে এটা আপনি তো আর বেসরকারি বলতে পারেন না। আমরা যখন তাকে ধরলাম তিনি বক্তব্যে উঠে বললেন আমিও জানতাম না।
জামায়াত আমির বলেন, এই পার্লামেন্টে যিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, তিনিও যদি না জানেন তাহলে কোন জায়গা থেকে এই কলকাঠি নাড়ানো হয়? এইভাবে একটা গণতান্ত্রিক পার্লামেন্ট চলতে পারে না। আমরা স্পিকারের কাছে সুস্পষ্টভাবে জানতে চাইলে, আপত্তি দিলে তিনি বুঝ দেয়ার চেষ্টা করেন।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, স্পিকার সংসদের সর্বোচ্চ ব্যক্তি। তার কাছে আমরা স্পষ্ট জানতে চাই, দুদকের বিল, পুলিশ সংস্কার কমিশন বিল, গুম কমিশনের বিল, পিএসসির বিল আসবে কিনা? যেগুলোর সাথে প্রত্যেকটি নাগরিকের ভাগ্য জড়িত। যেগুলো দিয়ে অতীতে ফ্যাসিজম কায়েম করা হয়েছে, অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গণভোট অধ্যাদেশ আছে। এগুলো তারা আনবেন না। তারা আনবেন কোনগুলো? যেগুলোতে ফ্যাসিজম বহাল থাকবে। যেগুলো ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য দরকার সেগুলো তারা আনবেন।স্থানীয় সরকার বিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারাই তাদের নির্বাচনী এশতেহারে বলেছেন, তাদের ৩১ দফা সংস্কারের প্রস্তাবে বলেছেন। যে কোন স্তরে তারা অনির্বাচিত কোন প্রতিনিধি দেখতে চান না। তারা নিজেদের সাথেই নিজেরা তাদের কথা রক্ষা করেন নাই। জাতির সাথে রক্ষা করেন নাই। এই আচরণ স্ববিরোধী আচরণ।
সরকার সংসদে আস্থাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এই পার্লামেন্ট আমরা মেনে নিয়েছি। এই পার্লামেন্ট নিয়ে অনেক কথা আছে। এ নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা আছে। সেই নির্বাচনের পক্ষে মিনিমাম দুজন রাজ সাক্ষী পাওয়া গেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং এর ব্যাপারে সাবেক উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য আর বর্তমান সরকারি দলের একজন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। উনি বলেছেন, আন্দোলন করেছে ছাত্ররা। আমরাও ছিলাম। তবে ক্যাপ্টেনের হাতে প্রফেসর ডক্টর ইউনুস লন্ডনে নিয়ে ট্রফি তুলে দিয়ে এসেছে। শেইম।
জামায়াত আমির বলেন, ট্রফি যদি ওখানেই দিয়ে থাকেন তাইলে কিসের নির্বাচন? তাইলে তো নির্বাচনের ভাগ্য যোগাযোগ করে পর্দার আড়ালে ঠিক করে জাতিকে ব্ল্যাকমেইলিং করা হয়েছে। যার প্রমাণ আপনারা গতকাল দেখেছেন।
দেশবাসীকে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, কথা দিচ্ছি, জনগণের অধিকারের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে আমরা কোন জায়গায় চুল পরিমাণ কোন ছাড় দেবো না। আমাদের অবস্থান অক্ষুন্ন থাকবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের এই লড়াই জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই। জনগণের গণরায়, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলেই আমরা মনে করি যে সবগুলো সমাধানের রাস্তা খুলে যাবে। সংসদে আমরা তার সুবিচার পাই নাই। ইনশাল্লাহ জনগণের কাছে আমরা। জনগণকে নিয়েই সেই দাবি আদায় করে ছাড়বো।
তিনি বলেন, অতীতেও এই এই ধরনের সংসদে কিছু কিছু বিলকে পাত্তাই দেওয়া হয় নাই। পরে তারা নিজেরাই বাধ্য হয়েছেন সেগুলোকে নিজেরা দিতে। গণভোটের গণরায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করার মানে হচ্ছে গণতন্ত্রকে জনগণকে অপমান করা। সব দাবি আদায় হবে এবং সেই দাবি আদায় করতে গিয়ে যতো। ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, আমরা প্রস্তুত। দেশের জন্য, জনগণের জন্য অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই অব্যাহত থাকবে।