নেপথ্যের কারিগর চীন

দীর্ঘ ৪০ দিনের সংঘাতের পর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই যুদ্ধবিরতি পুরো বিশ্বের জন্যই এক স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে। চলমান এই সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমশ অস্থিতিশীলতায় পর্যুদস্ত হচ্ছিল; তেল ও গ্যাসের সরবারহ কমে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ার পথে এগোচ্ছিল। তবে কূটনৈতিক সূত্র ও বিশ্লেষকরা বলছেন পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হলেও, উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চীন। ইসলামাবাদে বৈঠকের আগে থেকেই বেইজিংয়ের সক্রিয় কিন্তু নীরব ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান অল্প সময়ের মধ্যে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শেষ মুহূর্তে এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব করতে চীনের হস্তক্ষেপ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধবিরতির রাতে যখন আলোচনা ভেঙে পড়ার উপক্রম হচ্ছিল, তখনই চীন সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং ইরানকে প্রাথমিক সমঝোতায় রাজি করায়। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনিও জানিয়েছেন, ইরানকে আলোচনায় আনতে চীন বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনায় চীন হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘গ্যারান্টর’। কারণ ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা শক্তির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না এবং এমন একটি পক্ষ চায়, যাকে তারা নিরপেক্ষ ও প্রভাবশালী মনে করে। রাশিয়াও একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারত, কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোকে গ্রহণযোগ্য মনে করছে না। ফলে চীনই বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এই প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে। ‘আয়রনক্ল্যাড ব্রাদার’ হিসেবে পরিচিত দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রেখে চলেছে। চীন ইতিমধ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশ হিসেবে পাকিস্তানে বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গেও তাদের শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে দুই পক্ষের সঙ্গে সমানভাবে যোগাযোগ রাখার ক্ষেত্রে বেইজিং একটি বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

আলোচনা সহজ হবে না : তবে এই আলোচনা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং লেবানন ইস্যু এসব বিষয় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে লেবানন নিয়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট। পাকিস্তান ও ইরান যেখানে যুদ্ধবিরতির আওতায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, সেখানে ইসরায়েল তা মানতে নারাজ এবং হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই আলোচনা অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল। একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে। এদিকে, চীন প্রকাশ্যে খুব বেশি ভূমিকা নিতে না চাইলেও পর্দার আড়ালে তাদের সক্রিয়তা অব্যাহত রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন এবং বিশেষ দূত যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে নিয়মিত সফর করছেন। সব মিলিয়ে ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া এই আলোচনা শুধু পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্যের পরীক্ষা নয়; বরং চীন কতটা কার্যকরভাবে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি নিশ্চিত করতে পারে, সেটিও এখন বৈশ্বিক রাজনীতির বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো কার্যত ‘অকেজো’ : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত এক ডজন সামরিক স্থাপনা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, সেগুলোর উপস্থিতি এখন সুবিধার চেয়ে বরং বেশি ঝুঁকি তৈরি করছেএমনটাই দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গত মাসে এই ঘাঁটিগুলোর অবস্থা সম্পর্কে প্রথম তথ্য প্রকাশ করে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। সেখানে বলা হয়, এসব স্থাপনা ‘প্রায় বসবাসের অযোগ্য’ হয়ে পড়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ‘প্রজেক্ট অন মিডল ইস্ট পলিটিক্যাল সায়েন্স’-এর পরিচালক মার্ক লিঞ্চ ‘আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসি’-র বার্ষিক সম্মেলনে বলেন, এগুলোই ছিল আমেরিকার প্রভাব প্রতিষ্ঠার ভৌত অবকাঠামো, আর ইরান এক মাসের মধ্যেই কার্যত এগুলোকে অকার্যকর করে দিয়েছে। এই স্থাপনাগুলোযেগুলোর কিছু সক্রিয় ঘাঁটি নয়; বরং লজিস্টিক কেন্দ্র, সেগুলোতে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে পেন্টাগন এবং সংশ্লিষ্ট উপসাগরীয় দেশগুলো।