সেনা-ইমরান সমঝোতা হচ্ছে!

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫২ এএম

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কারাগার থেকে মুক্তি পেলে দেশটির সামরিক বাহিনী বা সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে নতুন করে বিরোধে জড়াবেন না বলে দাবি করেছেন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি। তার এই বক্তব্যকে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইমরানের দলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালো ইঙ্গিতগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত বুধবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুখারি বলেন, ইমরান খান মুক্তি পেলে দেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো পদক্ষেপ তিনি নেবেন না। দেশের স্বার্থে নিজের কষ্ট ও ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। বুখারি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে, আপনি সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাতে যাবেন। নিজের কষ্ট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, নিজের যন্ত্রণা দমন করতে হবে এবং দেশের কল্যাণের জন্য তা মেনে নিতে হবে।’

বুখারির এই বক্তব্য এমন এক সময়ে আসে যখন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরানকে চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে একটি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়। আদালতের এই সিদ্ধান্তকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান ও সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের টানাপড়েন কমানোর সম্ভাব্য একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

তবে গতকাল শুক্রবার ইমরান খানকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ‘চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ’ ঘোষণা করার পর আবার রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী শুক্রবার ভোরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে আবার আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

ইমরান খান ও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই তিক্ত। ২০২২ সালে সংসদে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ইমরানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়েছে। ২০২৩ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হলে তার সমর্থকরা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন।

ইমরানের সমর্থকদের একটি বড় অংশ মনে করে, সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের কারণেই তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। ইমরান নিজেও অতীতে মুনিরকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। গত নভেম্বরে তার নামে প্রচারিত এক বক্তব্যে তিনি মুনিরকে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘স্বৈরাচারী একনায়ক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। একই সঙ্গে তার ও তার স্ত্রীর ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানোর অভিযোগও করেছিলেন।

তখন ইমরান বলেছিলেন, তার সঙ্গে যা-ই করা হোক না কেন, তিনি সামরিক নেতৃত্বের কাছে মাথা নত করবেন না। তবে এখন তার দলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বক্তব্যে ভিন্ন সুর দেখা যাচ্ছে। তাহলে সেনাবাহিনী ও ইমরানের দলের কোনো সমঝোতা হয়েছে?

বুখারি আসিম মুনিরকে পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সেনাপ্রধান চাইলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, পিটিআই ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি বা আলোচনাও চলছে না।

পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনী বুখারির বক্তব্য নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এর আগে থেকেই দেশটির সামরিক বাহিনী বলে আসছে, তারা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। অন্যদিকে সরকার বলে আসছে, ইমরানের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আদালতের বিষয়।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, পিটিআইয়ের বর্তমান নেতৃত্বের বক্তব্য আর ইমরান খানের ব্যক্তিগত অবস্থান এক নাও হতে পারে। দলের অনেক শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে আছেন। অনেকে কারাগারে রয়েছেন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের অভিযানে পিটিআইয়ের সাংগঠনিক কাঠামোর বড় অংশও দুর্বল হয়ে গেছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘ইমরান কারাগারে থাকা অবস্থায় সম্ভাব্য কোনো আলোচনা বা সমঝোতায় পিটিআইয়ের নেতৃত্ব কতটা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে পারবে, তা পরিষ্কার নয়।’

এদিকে বুখারি নিজেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ইমরানকে দীর্ঘ সময় ধরে অনেকটা একাকী অবস্থায় রাখা হয়েছে। ফলে তার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি কোনো বক্তব্যও পাওয়া যাচ্ছে না।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আপাতত সংঘাত কমানোর ইঙ্গিত দিলেও আন্দোলনের কর্মসূচি থেকে সরে আসছে না পিটিআই। বুখারি জানিয়েছেন, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী পদযাত্রার কর্মসূচি পালন করবে দলটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত