একই পদে কত মধু বেবিচকে!

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাফরুল হাসান। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে একই পদে চাকরি করছে তিনি। বদলি করেও সরানো যাচ্ছে না তাকে। জাফরুলের মতো আবুল খায়ের ইবনে আলী এবং হাবিবা আফরোজও একই পদে চাকরি করছেন প্রায় ১৭ বছর ধরে। আরও অন্তত অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীও একই পদে দীর্ঘমেয়াদে চাকরি করছেন। পাশাপাশি বেবিচকের একাধিক চক্র ঘুরে-ফিরে একই স্থানে চাকরিরত অবস্থায় মানবপাচারসহ নানা অপকর্ম চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কারও কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) অভিযোগ রয়েছে। তারপরও তাদের ‘টলানো’ যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে অনেকে আবার ঠিকভাবে অফিসও করেন না। শুধু হাজিরা দিয়েই চলে যান।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সবকটি বিমানবন্দরের অপরাধমূলক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করতে নানা উদ্যোগ নিলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

বেবিচকসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, দেশের আকাশপথের নিরাপত্তা এবং বিমানবন্দরগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বর্তমানে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর ‘আখের গোছানোর’ নিরাপদ চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। সংস্থাটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বছরের পর বছর ধরে জেঁকে বসে আছেন একদল সিন্ডিকেট সদস্য। একই পদে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে অনিয়ম আর দুর্নীতির পাহাড় গড়ে তুলেছেন তারা। নিয়মানুযায়ী তিন বছর পরপর বদলির বিধান থাকলেও অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে তারা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কোনো কারণে বদলির আদেশ হলেও প্রভাবশালী মহলের তদবিরে তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাতিল হয়ে যাচ্ছে। বেবিচকের সদর দপ্তর থেকে শুরু করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরে এমন অন্তত অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, যারা গত ১০ থেকে ২৬ বছরের বেশি সময় ধরে একই ডেস্কে বা একই শাখায় কর্মরত। সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী, সংবেদনশীল পদে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু বেবিচকে এ আইন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ।

বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাবলুর রহমান জানিয়েছেন, সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী একই পদে কতদিন থাকতে পারবে তার নিয়ম আছে। বেশি দিন ধরে যারা আছেন, তাদের তালিকা করা হচ্ছে।

বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেবিচকের প্রতিটি চেয়ারেই মধু। বদলি করেও তাদের সরানো যায় না। যখনই কোনো সৎ প্রশাসনিক কর্মকর্তা এই সিন্ডিকেটে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেন বা তাদের বদলির ফাইল সই করেন, তখনই শুরু হয় নানামুখী চাপ। ওপর মহল থেকে টেলিফোন আসা, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং ক্ষেত্রবিশেষে বড় অংকের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সেই বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। বেবিচকের বিভিন্ন খাতে অনিয়ম হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার-বাণিজ্য হচ্ছে বেবিচকে। পাস জালিয়াতি, অবৈধ লোকবল নিয়োগ এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্রয়ে কারসাজি হচ্ছে। বিমানবন্দরের জমি লিজ দেওয়া এবং দোকান বরাদ্দ নিয়ে বিশাল অংকের লেনদেন হচ্ছে। প্রয়োজনীয় মালামাল না কিনেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করছে বিশাল ওই সিন্ডিকেটটি। অভিযোগ আছে বেবিচকের অনেক নিম্নপদস্থ কর্মচারীও কোটি টাকার মালিক। রাজধানীতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি এবং বিদেশে অর্থপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অথচ তাদের দৃশ্যমান আয়ের উৎস কেবল সরকারি বেতন।

ক্ষমতার অপব্যবহারের খতিয়ান : অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেবিচকের সদর দপ্তরের একজন উচ্চমান সহকারী গত এক দশক ধরে একই ফাইলে কাজ করছেন। তার মাধ্যমে ঠিকাদারদের বিল পাস হয়। গত পাঁচ বছরে তিনি অন্তত চারটি বদলি আদেশ বাতিল করিয়েছেন। অন্যদিকে বিমানবন্দরের অ্যাপ্রন এলাকায় কর্মরত এক কর্মকর্তা ডিউটি রোস্টার পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোকে সুবিধা দিয়ে মাসিক মাসোহারা আদায় করেন। তাকে বদলি করা হলেও ‘অপরিহার্য জনবল’ হিসেবে নিজেকে জাহির করে তিনি একই পদে বহাল আছেন।

এ প্রসঙ্গে বেবিচকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিষয়টি স্বীকার করে জানান, অভ্যন্তরীণ এই সিন্ডিকেট ভাঙা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা অনেক সময় চেষ্টা করেন চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু রাজনৈতিক এবং প্রভাবশালী মহলের এমন চাপ আসে, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ২০১৯ ও ২০২১ সালে দুদক বেবিচকের দুর্নীতি প্রতিরোধে ১১ দফা সুপারিশসংবলিত একটি প্রতিবেদন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। সেখানে ‘একই পদে দীর্ঘদিন অবস্থান’কে দুর্নীতির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

তারা আরও জানান, বেবিচক একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এখানে দুর্নীতির কারণে যদি অযোগ্য লোক বছরের পর বছর একই পদে বসে থাকে, তবে তা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং আকাশপথের নিরাপত্তার জন্যও চরম হুমকি। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কঠোর হস্তক্ষেপ এবং ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন না করলে এই ‘মধু’ খাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া কঠিন।

দিনের পর দিন একই চেয়ারে যারা : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেবিচকের বিভিন্ন বিভাগ এবং বিভিন্ন বিমানবন্দরে সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ১০ থেকে ২৬ বছর একটানা একই দপ্তরে কর্মরত আছেন। তার মধ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুমিনুল ইসলাম ১০ বছর, ফায়ার বিভাগের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম ১২ বছর, শাহ আমানত বিমানবন্দরের এরোড্রাম অফিসার আবু মো. ওমর শরীফ ১৬ বছর, উচ্চমান সহকারী আবদুল করিম ১৬ বছর, প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাফরুল হাসান ২২ বছর, মোশাররফ হোসেন ১৬ বছর, আবুল খায়ের ইবনে আলী ১৯ বছর, হাবিবা আফরোজ ১৯ বছর, সামসুন্নাহার লিজা ১৯ বছর, উচ্চমান সহকারী লিটন চন্দ্র সরকার ১০ বছর, প্রশাসন বিভাগের সিনিয়র অফিসার সুব্রত চন্দ্র দে ১৮ বছর, সিনিয়র অফিসার সেলিম মিয়া ১৮ বছর, ওয়াহিদা ওলিউর ইসলাম ২৬ বছর, পার্সোনেল অফিসার কাজী ফৌজিয়া নাহার ২৬ বছর, উচ্চমান সহকারী জিয়াউর রহমান ১৬ বছর, খালেদা ফেরদৌস ১৬ বছর, উচ্চমান করণিক রুহুল কুদ্দুস ১৬ বছর, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল বাশার ১৬ বছর, উচ্চমান সহকারী পি-এ টু সদস্য (প্রশাসন) এসএম সায়েজুল হক ১৬ বছর, সহকারী সমন্বয় কর্মকর্তা রুহুল আমীন ১৬ বছর, প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহীন হোসেন ১৬ বছর, হিসাবরক্ষক ফারজানা আক্তার ১৬ বছর, সুশান্তকুমার বিশ্বাস হিসাবরক্ষক ১৯ বছর ধরে একই দপ্তরে রয়েছেন।

৩৬ খাত নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান : দীর্ঘদিন ধরেই দুদক বেবিচকের কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান করে আসছে। কোন কোন খাতে বেশি দুর্নীতি হয়, সেই তথ্য উদ্ঘাটন করে সংস্থাটি। তার মধ্যে বেবিচকে ৩৬ খাত নিয়ে বেশি অভিযোগ উঠায় এসব তদন্ত শুরু হয়েছে। সেবাকে বাণিজ্য বানিয়ে কেউ কেউ অর্থ কামাচ্ছেন। ইতিমধ্যে দুদক একটি তালিকা করেছে। সেই তালিকায় বলা হয়েছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ারকন্ডিশনার ডাক্ট স্থাপন, এয়ারকন্ডিশনিং সিস্টেম আপগ্রেডেশন, বিমানবন্দরে কাউন্টার এবং কনভেয়ার বেল্ট স্থাপন, তার যন্ত্রাংশ সরবরাহ, নতুন বোডিং ব্রিজ স্থাপন, পুরাতন বোডিং ব্রিজে যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও স্থাপন, বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে এলইডি লাইট কেনা ও ফিটিংস, বাগান আলোকসজ্জা, এইচটি এবং এলটি সুইচগিয়ার স্থাপন কাজের নামে অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে।

ভবনের ডেকোরেশন নিয়েও দুর্নীতি : দুদক নিশ্চিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে দেশের সবকটি বিমানবন্দরের ফ্লোর মাউন্টেড এবং ওয়াল মাউন্টেড প্যানেল স্থাপন, বিমানবন্দরে বিভিন্ন সাইজের পাওয়ার ক্যাবল সরবরাহ, এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম স্থাপন, রানওয়ে, টেক্সিওয়ে, অ্যাপ্রোন লাইট ও লাইট ফিটিংস সরবরাহ, আবাসিক ভবনে ইন্টারন্যাল ইলেকট্রিফিকেশন কাজ, সিএএবির নতুন সদর দপ্তরের ভবনের বিভিন্ন ইকুপমেন্ট সরবরাহসহ ইএম-সংক্রান্ত কাজ, টার্মিনাল বিল্ডিংসহ বিমানবন্দরের অন্যান্য ভবনের ডেকোরেশেন-সংক্রান্তকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইএম কাজ, বিভিন্ন স্থানে অ্যাপ্রোন মাস্ট লাইট স্থাপন, সিসিআর বিল্ডিং সংশ্লিষ্ট সব ইএম কাজ, রানওয়ে লাইটিংয়ের জন্য বিভিন্ন সাইজের ক্যাবল সরবরাহ ও সংস্থাপন কাজেও জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।