৯০ ভাগ ভাটাই অবৈধ, বিপন্ন পরিবেশ

কুষ্টিয়ায় ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপনে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্সসহ আনুষঙ্গিক ছাড়পত্র নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানছেন না ভাটা মালিকরা। কুষ্টিয়া জেলার ছয়টি উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে গড়ে ওঠা ২০৯টি ইটভাটার ৯০ শতাংশই নিয়ম মেনে স্থাপন করা হয়নি। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হারুন অর রশিদ।

পরিবেশ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার উপ-পরিচালক এমদাদুর হক জানান, সমগ্র জেলায় ২০৯ ইটভাটার মধ্যে অদ্যাবধি ১৬টি ইটভাটার মালিক পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েছেন। বাকি ১৯৩টি ইটভাটার মালিক কোনো ছাড়পত্র নেননি। এছাড়া বিগত দুই বছরের মধ্যে নতুন করে ছাড়পত্র প্রদান বন্ধ আছে। এরপরও এসব ইটভাটা আইন না মেনে কীভাবে চলছে তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বলতে পারবে। চলতি অর্থবছরে পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে এসব অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ২৯টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এ সময় এসব ভাটা ধ্বংসসহ প্রায় অর্ধকোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শওকত হোসেন ভুঁইয়া বলেন, ‘জেলার ১ লাখ ১৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে ৭৬ হাজার হেক্টর তিন ফসলি জমি। প্রতিবছর এসব কৃষিজমিতে উৎপাদিত খাদ্যশস্য জেলার ২২ লাখ মানুষের বার্ষিক খাদ্য চাহিদা পূরণ করেও উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য দেশের অন্যান্য জেলার খাদ্য চাহিদা পূরণে জোগান দিচ্ছে। জেলার কৃষি খাতের এই সমৃদ্ধির গৌরব প্রতিনিয়ত ম্লান হচ্ছে আইন না মেনে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দুই শতাধিক ইটভাটা স্থাপনের কারণে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে আরও জানা যায়, ‘বাংলাদেশে কৃষি ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইটভাটা। গত এক দশকে জেলার অতি উর্বর তিন ফসলি ৭৫ হাজার ৮৮০ হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে ২৮৮ হেক্টর জমিতে গড়ে ওঠা ইটভাটা প্রত্যক্ষভাবে কৃষি ও পরিবশকে ধ্বংস করেছে। অর্থাৎ জেলার মোট কৃষিজমির ৭ শতাংশের অধিক পরিমাণ বন্ধ্যত্বের শিকার হচ্ছে এসব অবৈধ ইটভাটার কারণে।’

ইটভাটা মালিক সমিতির সদস্য বশির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ভ্যাট-ট্যাক্সসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরেই নিয়মিত টাকা দিচ্ছি। যদি অবৈধ হই তাহলে আমাদের কাছ থেকে তারা টাকা নিচ্ছেন কেন? কেনই-বা মাসে মাসে প্রশাসন অভিযানের নামে এসে জরিমানা আদায়, ভাটা ভাঙচুরসহ নানাভাবে আমাদের আর্থিক ক্ষতি করছে? আমরাও চাই এর একটা সঠিক সমাধান হোক।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার যুগিয়া গ্রামের কেএইচবি ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। সেখানকার মিস্ত্রি রাজু মিয়া বলেন, ‘কাঠ পোড়ালে ইটের উৎপাদন ভালো হয়। কয়লা পোড়ালে মোট ইটের তিন ভাগের মধ্যে এক ভাগ ইট নষ্ট হয়ে যায়। সমানতালে পোড়ে না। সে কারণে বনের কাঠ পোড়ানো হয়। পাঁচ লাখ ইটের একটি ভাটায় প্রতিদিন ৪০০ মণ কাঠ পোড়ানো হয়।’

পরিবেশ বিপন্নের একটি চিত্র তুলে ধরে পরিবেশবিদ গৌতম কুমার রায় বলেন, জেলা প্রশাসনের তালিকাভুক্ত ১৫২টিসহ ভ্যাট অ্যান্ড কাস্টমসের তালিকায় উল্লিখিত রয়েছে ২০৯টি ইটভাটা। এক মৌসুমে প্রতিটি ইটভাটা গড়ে দুই হাজার টন কাঠ পোড়ায়। অর্থাৎ জেলার সবগুলো ইটভাটায় এক মৌসুমে তিন লক্ষাধিক টন কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। এতে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও বর্জ্যে বিপন্ন হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশ। ভাটার আশপাশের এলাকা, নদী, শহরাঞ্চল ও গ্রামীণ জনপদের জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, উদ্ধৃত্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনে দেশের হাতেগোনা কয়েকটি জেলার মধ্যে কুষ্টিয়া অন্যতম। অবৈধ ইটভাটা, আইন ভেঙে কৃষিজমিতে শিল্পকারখানা স্থাপনসহ নানাবিধ কারণে উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনের এই ধারা ক্রমান্বয়ে নিম্নগামী হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বলেন, জেলায় ভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে ভাটা মালিকরা নীতিমালা লঙ্ঘন করেই এসব করছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতেও অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।