রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামে বাস করেন মৃত মকবুল হোসেনের বৃদ্ধ স্ত্রী রাবেয়া বেগম। তার গর্ভে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেয় দুই ছেলে ও এক মেয়ে। জন্ম নেওয়ার দুই দশক পেরিয়ে তিন সন্তানই এখন প্রতিবন্ধী। বড় ছেলে বিপুু (৩৫) দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ছোট ছেলে শিমুল (৩০) ও মেয়ে তাছলিমা (২৮) বাক্্প্রতিবন্ধী। একসময় হাসি-আনন্দে ভরা সচ্ছলতার ছোঁয়া ছিল পরিবারে। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে ঘিরেই ছিল মায়ের স্বপ্ন। তারা সুস্থ অবস্থায় জন্ম নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠে স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলে পড়ালেখা করেছে। প্রাপ্ত বয়সে দুই ছেলে বিয়ে করে সংসার শুরু করে। সংসারের অভাব অনটন ঘোচাতে ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করেন।
সময়ের নির্মম পরিহাস ও বাস্তবতায় সেই মায়ের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় তিন সন্তানই এখন প্রতিবন্ধী। তাদের স্ত্রীরা এই দুর্দিনে কেউই পাশে নেই। ছোট ছেলে শিমুলের স্ত্রী সাত বছর বয়সি একমাত্র কন্যাসন্তান ফেলে বাবার বাড়ি চলে গেছে। বিপুর স্ত্রীও তাকে রেখে প্রায় ১০ বছর আগে চলে গেছে বাবার বাড়ি।
জন্মের সময় তারা তিন ভাই বোন কেউ প্রতিবন্ধী ছিল না। অর্থ উপার্জন করে ছোট বোন তাসলিমাকে বিয়ে দেয় পার্শ্ববর্তী পলাশবাড়ি উপজেলায়। ভাগ্যের কী নির্মম বাস্তবতায় কয়েক বছর আগে তিন জনই অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়ে যায় অসংলগ্ন। বিপু দৃষ্টি হারিয়ে হয়ে যান দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, আবার শিমুল হাত-পা বাঁকা হয়ে বনে যান শারীরিক প্রতিবন্ধী। ফলে কারখানা থেকে চাকরি হারিয়ে দুই ভাই বাড়িতে ফিরে আসেন। এদিকে, প্যারালাইসিস না হয়েও কথাবার্তা অস্পষ্টভাব ফুটে উঠে তাসলিমার কণ্ঠে। স্বামীর বাড়িতে দুই সন্তানের মা হয় তাসলিমা। স্বামীর পরিবারের লোকজন মানবিক হওয়ায় সেখানে এখনো সংসার করছেন তাসলিমা।
এখন দুই ছেলে ও নাতনির দায়িত্ব বৃদ্ধা দাদি রাবেয়া বেগমের ওপর। ভিটামাটি ছাড়া জমিজমা কিছুই নেই। বহু দৌড়ঝাঁপের পর বিপুর ভাগ্যে মিলেছে সমাজ সেবার প্রতিবন্ধী কার্ড। সমাজ সেবা বিভাগ থেকে আজও ছোট ছেলে শিমুলের নামে প্রতিবন্ধী কার্ড মেলেনি ।
রাবেয়া বেগমের স্বামী মকবুল হোসেনকে হারিয়েছেন ২০ বছর আগে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এখন তিনি নিজেই। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে অন্যের বাড়ি ও মাঠে কাজ করতে যান। দিন শেষে যা পান, তা দিয়েই কোনোমতে চলে অসহায় পরিবারের অন্নসংস্থান।
বৃদ্ধা মা রাবেয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘মানষের বাড়িত কাম করি খায়া নাখায়া বেটা আর নাতনিক নিয়া কোনো রকমে বাঁচি আছো।’
পীরগঞ্জ উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের এখানে প্রতিবন্ধীভাতা শতভাগ। যোগাযোগ করলে তাদের দুজনেরই ভাতার আওতায় আনতে পারবেন বলে জানান তিনি ।