নতুন আবরণে হবে পাবলিক পরীক্ষা

পাবলিক পরীক্ষায় খারাপ ফলের পর পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনের সুযোগ রয়েছে। প্রতিবছর সেই সুযোগে হাজারো শিক্ষার্থী আবেদন করে এবং অনেকের ফল পরিবর্তনও হয়ে থাকে। তবে আগামীতে পুনঃনিরীক্ষণের বদলে যুক্ত হতে যাচ্ছে পুনর্মূল্যায়ন। ফল চ্যালেঞ্জ করে শিক্ষার্থীরা যে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করে তেমন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খাতা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ চালু হতে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ফেল করা শিক্ষার্থীরা দুইবারের বেশি পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে না। এ ছাড়া পাবলিক পরীক্ষায় পরীক্ষকরা উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করছেন কি না, তা নজরদারি করতে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে মূল্যায়িত উত্তরপত্র নিরীক্ষণও করা হবে এবং পরীক্ষার কক্ষগুলো থাকবে সিসি ক্যামেরার আওতাধীন।

আগামী ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। আসন্ন এই পরীক্ষা নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করার পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁস যাতে না হয় এবং সুষ্ঠুভাবে যাতে সম্পাদিত হতে পারে সেজন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব নানা উদ্যোগের মধ্যে একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে আর তা হলো পাবলিক পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণের বদলে পুনর্মূল্যায়ন। মূলত পরীক্ষার্থীরা যাতে বঞ্চিত না হয় এবং তাদের উত্তরপত্র যাতে সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয় সেই ধারণা থেকেই উঠে এসেছে পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি। আর তা করতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন পাবলিক পরীক্ষা অ্যাক্ট সংশোধনের কথাও বলছেন। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আয়োজনে এসএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে কেন্দ্র সচিবদের উপস্থিতিতে এক মতবিনিময় সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, পাবলিক পরীক্ষায় ফল প্রকাশের পর পুনর্মূল্যায়ন চালু করতে পাবলিক পরীক্ষা অ্যাক্ট ১৯৮০ সংশোধন করা হবে। অনেক সময় যথাযথ উত্তর দিলেও পরীক্ষক কম নম্বর দিলে আইনের কারণে সেখানে পুনঃনিরীক্ষণের সময় নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এতে শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাবলিক পরীক্ষায় যাতে আর কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য আইন সংশোধনের মাধ্যমে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে পরীক্ষকরা যাতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে গিয়ে কম নম্বর কিংবা বেশি নম্বর না দেন, সেজন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি টিম কাজ করবে। এই টিম দৈবচয়ন ভিত্তিতে বিভিন্ন বোর্ডের উত্তরপত্র নিরীক্ষণ করে পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। আমরা চাই শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্রের যথাযথ মূল্যায়ন।

পুনঃনিরীক্ষণে কী দেখা হয়? : পাবলিক পরীক্ষা অ্যাক্ট ১৯৮০-এ বলা হয়েছে, উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণ বলতে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন বুঝাবে না। এতে উত্তরপত্রের অভ্যন্তরে কোনো প্রশ্নোত্তর পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষক কর্তৃক নম্বর না দিয়ে থাকলে তাতে নম্বর দেওয়া যাবে, উত্তরপত্রের অভ্যন্তরের কোনো নম্বর কভার পৃষ্ঠায় ওঠাতে ভুল হলে তা সংশোধন করা যাবে, কভার পৃষ্ঠায় ওঠানোর নম্বরের যোগফল ভুল হলে তা সংশোধন করা যাবে, পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষক কর্তৃক নম্বর কোনো অবস্থাতেই সংশোধন করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষা বোর্ডগুলো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সাত দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফিসহ পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন গ্রহণ করে। পরবর্তীতে আবেদিত রোল নম্বরগুলো যেসব বিষয় পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করে সেসব বিষয়ের উত্তরপত্র নিরীক্ষণ করে ফল প্রকাশ করে থাকে শিক্ষা বোর্ডগুলো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুনঃনিরীক্ষণে কোনোভাবেই উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হয় না। শুধু অমূল্যায়িত প্রশ্নোত্তর কিংবা প্রাপ্ত নম্বরের যোগফলে ভুল হলে তা সংশোধন করা হয়। একই সঙ্গে যোগফল যদি পূর্বের নম্বরের চেয়ে কমও হয় তাহলে পূর্বের নম্বরই বহাল থাকে এবং যোগফল বেশি হলে তা বাড়তি নম্বর যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ পুনঃনিরীক্ষণে নম্বর কমার কোনো সুযোগ নেই, তবে বাড়ার সুযোগ রয়েছে।’

পুনর্মূল্যায়ন কী? : ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, সাধারণ অর্থে পুনর্মূল্যায়ন বলতে আমরা বুঝি তা নতুন করে মূল্যায়ন করা। এতে নম্বর কমতেও পারে, আবার একই থাকতে পারে এবং বাড়তেও পারে। অর্থাৎ তিনটি সুযোগই রয়েছে। তবে ফলাফল পদ্ধতিতে পাবলিক পরীক্ষা আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কনক্রিট কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী। তিনি বলেন, পুনর্মূল্যায়নে নম্বর বাড়লে যেমন মেনে নিতে হবে তেমনিভাবে নম্বর কমে গেলেও মেনে নিতে হবে। এখানে উভয় ঘটনাই ঘটতে পারে।

অপরদিকে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট বিকাশ চন্দ্র মল্লিক বলেন, গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় পুনঃনিরীক্ষণে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ৭৩ হাজারের মতো উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণ করতে হয়েছে। এখন এসব খাতা পুনর্মূল্যায়ন করতে গেলে অনেক বেশি সময় লাগবে, সেই বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

বিশ^বিদ্যালয় মডেলে মূল্যায়ন হতে পারে : চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটি উত্তরপত্র দুই বিশ^বিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক মূল্যায়ন করেন। উভয়ের নম্বরের গড় করে ফল প্রস্তুত করা হয়। তখন আর অতি মূল্যায়িত কিংবা অব মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ থাকে না। পাবলিক পরীক্ষায় আমরা এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারি। আর তা করা গেলে প্রধান পরীক্ষক যেমন লাগবে না তেমনিভাবে ফল প্রকাশের পর পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনেরও সুযোগ রাখার দরকার হবে না।

এদিকে পাবলিক পরীক্ষায় প্রতিটি কক্ষে সিসি ক্যামেরা থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং বিদ্যুৎ চলে গেলে যাতে জেনারেটর দিয়ে হলেও ব্যাকআপ রাখা হয় সেই নির্দেশনা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। এ ছাড়া আগামী এইচএসসি পরীক্ষা থেকে দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।