রাজনীতির বাড়া ভাত

সম্প্রতি বিএনপির কিছু নারীনেত্রী সংসদের সংরক্ষিত আসনের জন্য নির্বাচনী মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। প্রথম দিন ৪ হাজার ফরম বিক্রি হয়েছে। প্রতি ফরমে টাকা লেগেছে ২ হাজার। কিন্তু জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে আড়াই লাখ। যারা গত ১৮-২০ বছর ধরে দলের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, হাসিনা-পুলিশের লাঠির বাড়ি খেয়েছেন, তারাই প্রধানত নির্বাচিত হওয়ার জন্য দলীয় ফরম কিনেছেন। এ ছাড়া কিছু নারীনেত্রী জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচনে লড়াই করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দল তাদের ওই রূপে মূল্যায়ন করেনি। তারাও শামিল হয়েছিলেন দলীয় মনোনয়নের। ৫০ আসনের মধ্যে বিএনপির আসন হলো ৩৮টি। এর জন্য ৪ হাজার ফরম কেনা অবাক বিষয় নয়। তারা তা কিনতে পারেন। তাদের অবদান মূল্যায়ন করবে দল, এটাই রীতি, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিকতাকে কী বলব? কেন এত নারী ‘সাংসদ’ হতে চান? আবার এটা মনে হলো যে, এত নারী রাজনীতিক থাকতে নেতারা কেন পুরুষকেন্দ্রিক মনন ও মানসিকতায়? অবশ্য জাতীয় নির্বাচনে তাদের মূল্যায়ন না করা থেকেই বোঝা গেছে। নারীর ক্ষমতায়ন যদি তারেক রহমান সরকারের লক্ষ্য হয়, যদি নারী-পুরুষের সমান সমান ক্ষমতাই প্রধান লক্ষ্য হয়, তাহলে রাজনীতিতে নারীর সংখ্যা কেন কম? মূল দলেও তো নারীর সংখ্যা কম থাকার কথা নয়। ফরম বিক্রি দেখে মনে হয়, তারা সংখ্যায় কম নন। তারা মূল দলে অন্তর্ভুক্ত না হলেও জাতীয়তাবাদী নারী দলের সদস্য, তা বলা বাহুল্য। ‘এ বিশে^র যা কিছু চিরকল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’ বিদ্রোহী কবির এই কবিতার দুটি পঙ্ক্তিকে আমরা কি মানব না? একটি সংসারের দিকে তাকালেও আমরা এ চিত্র দেখতে পাই। পুরুষশাসিত বলে যে কথাটি চালু আছে মানব সমাজে, তা যেন বাংলাদেশে প্রকটভাবে দেখা যায়। উন্নত দেশগুলোতে নর-নারীর মধ্যে ক্ষমতায়নের দ্বন্দ্ব এতটা প্রকট নয়।

আমরা দুজন নারী প্রধানমন্ত্রী পেয়েছিলাম। একজন গণতন্ত্রের জন্য নানা কীর্তি গড়েছেন। অন্যজন ফ্যাসিবাদী শাসক হয়ে আযদাহায় পরিণত হয়েছিলেন। ফলে জনরোষে তাকে পালাতে হয়েছে। গণতন্ত্র ভুলে ফ্যাসিবাদে আসক্তি কতটা নির্মম হতে পারে, সে পুরুষ বা নারী, হাসিনা ও এরশাদ তার রাজনৈতিক প্রমাণ। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে অতীব সজাগ। আমরা জানি,  সেই সচেতনতাই আমাদের রক্ষা কবচ হিসেবে কাজে আসবে। যারা এর মধ্যেই বিভেদের রাজনীতি উসকে দেওয়ার ফন্দিফিকির করছেন, তাদের বাড়া ভাতে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চা, তা প্রতিরোধ করবে। প্রশ্নটি তুলছি নারীদের উদগ্র আশা দেখে। তাদের চেহারা-সুরত দেখে একবারও মনে হয়নি, তারা রাজনীতির নারী চরিত্র। কিন্তু রূপে-গুণে শিক্ষা ও কর্মদক্ষতায় তারা যে দক্ষ, তা কি আমরা অস্বীকার করতে পারব? তবে এ জাতি মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়, পরিপূর্ণভাবে নারী শাসনায়নে। পুরুষের মানসিকতায় নারী সবসময়ই সহযোগী হিসেবে আছে। একবারও প্রধানচরিত্র হিসেবে দেখা হয়নি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া যখন দেশের পাঁচটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচত হলেন কোনো আসনে না হেরে, তখনও তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়নি শত শত পুরুষ যারা রাজনীতিতে ছিলেন প্রজ্ঞার অধিকারী। তিনি নারীর ক্ষমতায়নকে বুঝেছিলেন, খুব স্বাভাবিকভাবে। সংসার জীবনের মূল অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছিলেন, দেশ একটি বড় আকারের সংসার। সংসার পরিচালনা যেমন স্ট্যাটেজি নিতে হতো, তেমনি সরকার পরিচালনায়ও ওই একই স্ট্রাকচার অবলম্বন করতে হবে। তিনি তিনবার সরকারপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে প্রমাণ করেছেন, নারীর ক্ষমতায়ন জরুরি। তাই তিনি নারী শিক্ষাকে অবৈতনিক ও ১২ ক্লাস পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলেন। তবে কারিকুলাম রচনায় তিনি যদি আরেক ধাপ এগুতে পারতেন, একটু বিন্যাস করতে পারতেন, যদি শিক্ষা খাতের ১২ ক্লাসের শিক্ষক হিসেবে কেবল নারীদের বাধ্যতামূলক করে দিতেন, তাহলে আজকে আমরা মেধাবী নারীদের পেতাম। এখনও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন, শিক্ষকতায় ক্লাস ওয়ান থেকে ১২ শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের নিয়োগ দিলে সুফল পারেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীর শান্ত ব্রেন অনেক কাজ দেবে।

রাজনীতিতে নারীর সমতায়নের যে কথাটা তোলা হয়েছে, তাতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় নতুন ডাইমেনশন সৃষ্টি হতে পারে। নারী কেবল সংসদে অলংকার হিসেবে নয়, তাকে যোগ্য ও দক্ষ করে তুলতে পারলে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগানো যাবে। আমরা বলি, ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি হাত। এই ৩৬ কোটি হাতকে উন্নয়ন, শিক্ষা, উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে পারলে,  তার শক্তি কতটা হবে একবার কল্পনা করুন। আমাদের এটা জরুরি প্রয়োজন। সবক্ষেত্রে নারীর অবদান প্রয়োগ করতে চাইলে, নারীর হাতকে কাজে লাগাতে হবে। এই যে সংসদের অলংকার করে তোলার জন্য নারীদের জন্য প্রথমে ৩০টি পরে ৫০টি আসন সৃষ্টি করা হয়েছিল। সেই আসনের মধ্যে বিএনপি ৩৮টি আর বিরোধী জোটের ১২টি আসন থাকবে। এরা যদি নির্বাচত হয়ে আসতেন ভোটের মাধ্যমে, তাহলে তারা ন্যায় ও কল্যাণকেই প্রাধান্য দিতেন। এখন তারা মনোনীত হয়ে এসে দলের নির্দেশ মোতাবেক কাজ করবেন। উন্নয়ন কাজে তারা নিয়োজিত হবেন, কিন্তু তাদের মনে এটা থাকবে যে, তারা প্রকৃতপক্ষে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। এই মানসিকতা তাদের দুর্বল করবে। লাভবান হবে নানা অর্জনে। সাংসদ তিনি, এই তকমা লাগাতে পারবেন। আবার সেই তকমাই তাকে একটি বিশেষ শ্রেণিতে পুনর্বাসন করবে। সেই পুনর্বাসিত চরিত্র কী কী করবেন, তা ভেবে দেখতে হবে আমাদের। ভাগ্য ভালো আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার সূচনা বক্তৃতায় বলেছেন কোনো সাংসদই শুল্কমুক্ত গাড়ির সুযোগ নেবে না বা নিতে পারবেন না। তার মানে, তিনি প্রথম রাতেই বেড়াল মেরে দিয়েছেন। এখন আর কোনো সাংসদ কল্পনাতেও শুল্কমুক্ত গাড়ি কেনার কথা চিন্তা করবেন না। অতএব মূল্যবান গাড়ি আমদানি করে শুল্কমুক্ত গাড়ি কেনার যে নেশা এতকাল হয়েছিল, তা অবদমন করা গেছে। হুমু এরশাদ সাংসদদের ঘুষ হিসেবে এই ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন। হাসিনার ১৫ বছরে তার চর্চা এতটাই প্রবল হয়েছিল যে, লোকেরা সংসদ সদদ্য হওয়ার দৌড়ে উদগ্রভাবে মুখিয়ে থাকতেন। আমরা ওই উদগ্র ব্যবস্থার টুঁটি টিপে ধরতে পেরেছি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও সাধারণ একটি গাড়ি ব্যবহার করেন। তিনি যা করেন, তা তারই নিজস্ব চিন্তার ফসল। তার নেতৃত্বাধীন সরকার ও সংসদ সদস্যরা তা অনুসরণ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকা যেন কখনোই পরিত্যক্ত না হয়, আমরা তা প্রত্যাশা করি। জাতি যা প্রত্যাশ করে, তা যদি এতকাল অনুসৃত হতো তাহলে অনেক অপকর্ম দূরে থাকত।

প্রশাসন নিয়ে আমার কিছু বলার আছে। প্রশাসনের কর্ম ও কর্তাদের উচিত, বিলাসী জীবন বন্ধ করে জনপ্রতিনিধিদের চাওয়ার মতো করে জীবনযাপন করতে। এটা মনে রাখতে হবে, দেশের বৃহত্তর মানুষ উৎপাদনের মাধ্যমে যে অবদান রাখছেন, তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। তারা ফসল ফলায় বলেই আমরা সুবিধাভোগীরা নগরে, মহানগরে বাস করে সুখে জীবন কাটাই। শ্রমজীবী মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তারেক রহমান সাদাসিদা জীবন বেছে নিয়েছেন। ১৬ বছরে ইউরোপে তথা লন্ডনে জীবন অতিবাহিত করে, তিনি এটা বুঝতে পেরেছেন যে, এই জীবন বিলাসিতার জন্য নয়। এই জীবন ত্যাগের মহিমার। জীবনকে উপভোগ করতে হলে, নিজেকে আত্মমর্যাদায় সিক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, তাদের ভোটদাতারা কীভাবে জীবনযাপন করছেন। জীবনের মর্মে কি লুকিয়ে আছে, তা খুঁজে বের করাই হবে তাদের মূল লক্ষ্য। কতটা সেবা তারা দিতে পারছেন ভোটদাতা ও নিরক্ষর মানুষকে, তা মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, জাতি তাদের সংসদে পাঠিয়েছে ক্ষুধামুক্ত সমাজ ও সাম্যময় সমাজ গড়ে তোলার জন্য। যতদিন পর্যন্ত তারা সেই লক্ষ অর্জন করতে না পারবেন,  ততদিন পর্যন্ত তাদের এমন কাজ করা উচিত হবে না, যা জনগণবিরোধী। এই প্রশ্নে সরকারি ও বিরোধী দলকে মনে রাখতে হবে,  এবারকার নতুন সংসদ রচনার প্রেক্ষাপট। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান যে এবারকার সংসদের মাতৃভূমি,  তা মনে রেখে কাজ করতে হবে। এখানে এনসিপির অবদান বেশি কী কম, এখানে জামায়াতের অবদান বড় কী ছোট তা নিয়ে বাহাসের সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে, বিএনপি যে ১৭-১৮ বছর ধরে অব্যাহতভাবে আন্দোলন করেছে, ফ্যাসিস্টের নগ্ন নিষ্ঠুরতার নমুনা জড়ো করেছে জীবন ও সংগ্রাম দিয়ে, জনজোয়ারের সুনামি সৃষ্টিতে তাদের অবদান প্রধান হবেই। কিন্তু এখানে ভাগাভাগির প্রশ্ন আসে না। কেউ ১৯ শতাংশ, কেউ ২০ শতাংশ আর কেউ ২১ শতাংশ অবদান রেখেছে ফ্যাসিস্ট বিতাড়নে। এমনটি না ভেবে ‘আমরা সবাই মিলে করেছি’ এই মনোভাব পোষণ করা জরুরি।

সংসদে আলোচনার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের অধ্যাদেশগুলো এর মধ্যেই পর্যায়ক্রমে আইনে পরিণত হচ্ছে। ভুলত্রুটি সংশোধনের প্রয়োজন আছে। বৃহত্তর জনজীবনের আকাক্সক্ষাও মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, জনকল্যাণ ও মানুষের আত্মমর্যাদার বিষয় ও তাদের অবদানের মর্ম। তারপর অধ্যাদেশগুলো আইনি রূপরেখায় ফেলতে হবে। অযথা বিতর্ক তুলে পরিস্থিতিকে ঘোলা করার যে প্রোগ্রাম জামায়াত নিয়েছে, সেটা অনেকাংশেই ভুল পদক্ষেপ। নিজেদের আকাক্সক্ষা জনআকাক্সক্ষা হিসেবে চালনার কোনো যুক্তি নেই। হাইকোর্ট আইন মন্ত্রণালয় থেকে বিচার বিভাগকে পূর্ণাঙ্গ বিচার মন্ত্রণালয় করার লক্ষ্যে তিন মাসের যে ভারডিক্ট দিয়েছে, তার রিভিউ হবে সুপ্রিম কোর্টে। আমার ধারণা, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ভারডিক্ট করেই তা অনুমোদন দেবে। বহুকালের এই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন যদি করে তারেক রহমান সরকার, তাহলে এটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে। সরকারকে মনে রাখতে অনুরোধ করি দলীয় স্বার্থ নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থ নয়, জনগণের বিচারের স্বার্থ যেন কায়েম হয়। প্রশাসন বহু বছর ভুল ব্যাখ্যার সূত্র ধরে যে অন্যায় করে আসছে, তার অবসান হোক। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের উচিত হবে,  তাদের দায়িত্ব পালনে আরও মনোযোগী ও দক্ষ হয়ে ওঠা। নিজেদের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ভাবতে হবে, প্রভু নয়।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক

mahboob.hasan08@ gmail.com