পদ্ধতির ঝুঁকি ও সংকট

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৯ এএম

ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) ব্যবহারের কথা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এক মারাত্মক সমস্যা। যে কারণে অধিকাংশ ব্যাংক ঠিকমতো চলতে পারছে না। ব্যাংকিং খাতকে রক্ষা করতে হলে, খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান করতে হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আবার খেলাপি ঋণ সমস্যার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধানও নেই। একেক দেশের ব্যাংকিং খাতের সমস্যার মাত্রা ও জটিলতা অনুযায়ী, বিভিন্ন রকম সমাধানের পথ অনুসরণ করা হয়। তবে ব্যাংকিং খাতের এই সমস্যা সমাধানে এএমসির প্রয়োগ একটি উপায় মাত্র। অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি মূলত একটি মধ্যম সারি বা ইন্টারমিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান, যা খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই প্রতিষ্ঠানকে তৃতীয় পক্ষের সংস্থা বা থার্ড পার্টি এনটিটি, বাহক প্রতিষ্ঠান বা ভেহিক্যাল এন্টারপ্রাইজ, খারাপ ব্যাংক বা ব্যাড ব্যাংক প্রভৃতি নামে আখ্যায়িত করা হয়। এই প্রতিষ্ঠান মূলত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ব্যাংকের হিসাব থেকে, নিজেদের হিসাবে নিয়ে নেয়। এতে ব্যাংকের হিসাব খেলাপি ঋণ মুক্ত হয় এবং ব্যাংকের অবস্থান উন্নত হয়। ব্যাংকে যখন খেলাপি ঋণ না থাকে, তখন ব্যাংক দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে সহজ শর্তে ব্যবসা করতে পারে। বিশেষ করে সহজ এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বৈদেশিক লেনদেন সম্পন্ন করা, অল্প সুদে ক্রসবর্ডার লেনদেনের জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং দেশের অভ্যন্তরেও অল্প সুদে ঋণ প্রদান সম্ভব হয়। খেলাপি ঋণমুক্ত ব্যাংকিংব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে ব্যবসা-বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক লেনদেন, আর্থিক খাত এবং সর্বোপরি দেশের অর্থনীতি লাভবান হয়।

খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে গঠিত এএমসির মালিকানাও আর দশটি প্রতিষ্ঠানের মতো বিভিন্নভাবে হতে পারে। যেমন সরকারি মালিকানা, সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্মিলিত মালিকানা, সম্পূর্ণ বেসরকারি মালিকানা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে মালিকানা বা যৌথ উদ্যোগের মালিকানা। তবে সুশৃঙ্খল এবং সুনিয়ন্ত্রিত আর্থিক খাত যেখানে আছে, যেমন: আমেরিকা, সেখানে সম্পূর্ণ বেসরকারি মালিকানায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। উল্লেখ্য, আমেরিকায় শুধুমাত্র খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে কোনো ভেহিক্যাল এনটিটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং এর প্রয়োজনও নেই। কেননা, সেখানে ঋণ ক্রয়-বিক্রয় বা লোন ট্রেডিংয়ের সুবিধা আছে। যেখানে ভালো এবং খারাপ, সব ধরনের ঋণ ক্রয়বিক্রয় হয়। ইতালি এবং আয়ারল্যান্ডের মতো উন্নত দেশে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই ধরসের প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, অবশ্যই সরকারের অধীনে থাকতে হবে। একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ যখন সেই ব্যাংকের নিজ উদ্যোগে সমাধানের বাইরে চলে যায় এবং সমস্যার কারণে যখন ব্যাংকের অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে পড়ে, তখন তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠান হিসেবে এএমসিকে কাজে লাগানো হয়। তবে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধানে এই পদ্ধতির প্রয়োগ বিশ্বে খুব একটা নেই। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে, এটি সবচেয়ে উন্নতমানের এবং অত্যধিক মানসম্পন্ন একটি ব্যবস্থা মূলত যা সুশৃঙ্খল এবং সুনিয়ন্ত্রিত আর্থিক খাতে কাজ করে। আয়ারল্যান্ড ভেহিক্যাল এনটিটি প্রতিষ্ঠা করে, যথেষ্ট সফল হয়েছে। ভারতও ব্যাড ব্যাংক ধারণা ব্যবহার করে, খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানের কথা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করলেও সেভাবে ইন্ডাস্ট্রিব্যাপী ব্যবহার করে সফল হয়েছে, এমন কথা শুনিনি। এ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে, সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে না পারলে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমার পরিবর্তে বেড়ে যেতে পারে, স্বার্থান্বেষী মহলের যোগসাজশে খারাপ ঋণের পরিবর্তে ভালো ঋণ ব্যাংক থেকে এএমসির কাছে চলে যেতে পারে যার অন্যতম উদ্দেশ্য হবে, এএমসিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। আর এএমসির মাধ্যমে যদি ঋণের হাতবদল শুরু হয়, তাহলে সেই ঋণও এক সময় খারাপ ঋণে পরিণত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে। যদি তেমনটা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে আগের খেলাপি ঋণ যেখানে ছিল সেখানেই আছে।  উল্টো, নতুন খেলাপি ঋণের সৃষ্টি হয়েছে যা সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়াবে। তাছাড়া ব্যাংকগুলো তাদের হিসাব থেকে খেলাপি ঋণ সরিয়ে যে অর্থ হাতে পাবে, তা নতুন ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারবে। তা করলে নতুন ঋণের একটি অংশ স্বাভাবিকভাবে পুনরায় খেলাপি হবে। ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

খেলাপি ঋণের আজকের যে স্ফীত চিত্র, তা ২/৪ বছরে তৈরি হয়নি। এর নেপথ্য কারণ অনেক। রাজনীতিও এর জন্য বহুলাংশে দায়ী। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এএমসি ব্যাংকিং খাতের বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ কীভাবে গ্রহণ করবে, অর্থাৎ ক্রয় করবে নাকি ভিন্নভাবে সাময়িক গ্রহণ করবে? আবার ক্রয় করুক বা সাময়িক গ্রহণ করুক, এএমসিকে খেলাপি ঋণের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংকগুলোকে প্রদান করতে হবে। সেক্ষেত্রে এএমসি, সেই পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করবে কীভাবে সরকার প্রদান করবে, নাকি জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে? এর চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, এএমসি এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ গ্রহণ করে আসলে করবে কী? তারা কি বিশেষ পদক্ষেপ নিয়ে খেলাপি ঋণ আদায় করবে, নাকি একটি নির্দিষ্ট সময় পর এই ঋণ অবলোপন বা রাইট-অফ করবে? আবার অবলোপন করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থই বা আসবে কোত্থেকে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এবং বিষয়গুলো সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা হলে দেখা যাবে বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ব্যবহার করে খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানের সুযোগ নেই। একটি কথা মনে রাখতে হবে, খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানের গ্রহণযোগ্য পথ হচ্ছে, অবলোপন বা রাইট-অফ। সেটি হতে পারে খেলাপি ঋণের বিপরীতে সংরক্ষিত স্থিতি বা প্রভিশন দিয়ে। না হলে, বর্তমান মুনাফা অথবা ভবিষ্যতে অর্জিত মুনাফা ব্যবহার করে। ঋণখেলাপি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, অবলোপন করা অথবা শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণের পদ্ধতি অনুসরণ করলে, এমন সমস্যা দেখা দেয় না। এটাই মানসম্পন্ন খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা। কিন্তু যখন ঋণখেলাপি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবলোপন করা বা শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করা না হয়, তখনই খেলাপি ঋণ সমস্যা দেখা দেয়। এর ওপর যদি ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণে অস্বাভাবিক ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণের সৃষ্টি হয়, তখন এই সমস্যা ব্যাংকের সমাধানের বাইরে চলে যায়। যেমনটা আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে হয়েছে। আর এই মাত্রার সমস্যা সমাধানে, সরকারের সহযোগিতা বা বেইল-আউট প্যাকেজের প্রয়োজন হয়। যার একটি মাত্র মাধ্যম হতে পারে, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। পদ্ধতিটি কীভাবে কাজ করতে পারে, তা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে গেলে যে মাত্রার আলোচনা প্রয়োজন, সেই সুযোগ এখানে নেই।        

অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ধারণাটা শুনতে বেশ ভালো শোনা গেলেও, এই পদ্ধতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেভাবে ব্যবহৃত হয়নি। যদিও অধিকাংশ দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ সমস্যা আছে। অবশ্য তাদের খেলাপি ঋণ সমস্যা আমাদের দেশের মতো এত তীব্র নয়। এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান করতে হলে, বেশ কিছু পূর্বশর্ত মেনে চলার বাধ্যবাধকতা আছে। প্রথমত, ব্যাংকগুলোকে স্বনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি নিশিচত করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং প্রধান নির্বাহী ও ম্যানেজমেন্টের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা থাকতে হবে এবং তা মেনে চলার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। চতুর্থত, ব্যাংকের ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ পরিচালনায় (লোন অপারেশন) সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করে আধুনিকায়ন করতে হবে। পঞ্চমত, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিরপেক্ষতার সঙ্গে কঠোরভাবে আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এএমসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এরকম আরও অনেক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন আছে।  যার তালিকা দিতে গেলে, লেখার স্থান সঙ্কুলান হবে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ব্যবসা এবং অর্থনীতির অনিবার্য পরিণতি ছাড়া নতুন ভাবে খেলাপি ঋণ হওয়ার পথ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে, খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধানে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ব্যবহারের চিন্তা করা যেতে পারে। তা না হলে, এই পদ্ধতি বুমেরাং হয়ে দেখা দিতে পারে।

লেখক : ব্যাংকার, সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট টরন্টো, কানাডা।

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত