অপরের কল্যাণকামিতার নামই দ্বীন

ইসলাম আমাদেরকে সর্বজনীন কল্যাণের শিক্ষা দিয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি সৃষ্টি, প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আমাদের অটুট এক সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্ক মানবতার। দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তে কেউ কষ্ট পেলে তার ভার যেন আমাদের মনেও লাগে। কেউ সুখে থাকলে সেই আলো যেন আমাদের জীবনকেও স্পর্শ করে। এ অনুভূতিই ইসলামের চাওয়া। ইসলাম মানুষের ভেতরে এমন এক কোমলতা গড়ে তোলার শিক্ষা দেয়, যা তাকে অন্যের জীবনের প্রতি দায়িত্বশীল করে। অন্যের মঙ্গলের জন্য দোয়া করা, কারও ক্ষতি না করা, এমনকি প্রাণীদের প্রতিও সহমর্মিতা দেখানো এই দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

ইসলামের দৃষ্টিতে সব সৃষ্টি মিলে একটি পরিবার। এক হাদিসে গোটা সৃষ্টিকে আল্লাহর পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সব সৃষ্টি আল্লাহর পরিবার। (বায়হাকি) সপরিবারের প্রতিটি সদস্য যেমন পরস্পরের কল্যাণকামী হয়, তেমনি শরিয়াতের চাহিদা হলো, মানুষকে সব সৃষ্টির প্রতি কল্যাণকামিতার মনোভাব পোষণ করতে হবে।

পরিবারের একজনের কষ্ট যেমন সকলের কষ্ট, একজনের সুখ যেমন সকলের সুখ, তেমনি মহাবিশে^ ছড়িয়ে থাকা সকল সৃষ্টির কল্যাণকে নিজের কল্যাণ বলে ভাবতে হবে। অন্যের অকল্যাণ, অমঙ্গলকে নিজের অকল্যাণ ও অমঙ্গল বলে মনে করতে হবে। একটি হাদিসে বিষয়টিকে সাধারণ মূলনীতি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘অপরের কল্যাণকামিতার নামই হলো দ্বীন। ইসলাম হলো মঙ্গল কামনার নাম।’ (সহিহ মুসলিম)

একবার এক সাহাবিকে দেখে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, ইনি একজন জান্নাতি মানুষ। এরূপ কথা তিনি একের পর এক তিন দিন বলেছিলেন। এতে জনৈক সাহাবি এই সাহাবির সঙ্গী হয়ে যান এবং তিন দিন পর্যন্ত তার সঙ্গে অবস্থান করেন। পরে তাকে বলেন, আপনার তো আলাদা কোনো বিশেষ আমল দেখলাম না, কিন্তু নবীজি (সা.) তিন দিন ধরে এ কথা বলেছেন যে, এখন মসজিদে এমন একটি লোক প্রবেশ করবে, সে হলো জান্নাতি। আর এই কথার পর তিন দিনই দেখলাম আপনি এসে মসজিদে প্রবেশ করলেন। বিষয়টি কী? এই সাহাবি বলেন, আমি তো কারণ জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি যে, পৃথিবীর কারও ক্ষেত্রে আমার মধ্যে কোনো অমঙ্গল চিন্তা নেই। (মুসনাদে আহমদ)

আরেক বর্ণনায় পাওয়া যায়, নবীজি (সা.) বলেছেন, এমনভাবে ভোর ও সন্ধ্যা করবে যে, কারও প্রতি তোমার অকল্যাণ চিন্তা নেই। (মুসনাদে আহমদ) হাদিসে বর্ণিত আছে, একটা তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি খেতে সাহায্য করায় একজন পাপী নারীকে আল্লাহপাক ক্ষমা করে দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি) পক্ষান্তরে একটা বিড়ালকে না খেতে দেওয়ায় একজন নেককার নারীকেও জাহান্নামি হতে হয়। (সহিহ বুখারি)

এই ক্ষেত্রে নবী (সা.) একটি অতিসুন্দর দিকনির্দেশনা দিয়ে গিয়েছেন। বলেছেন, ‘নিজের জন্য যা পছন্দ করো, তোমার অন্য ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে।’ (সহিহ বুখারি)

অপরের কল্যাণকামিতাই ইসলামের প্রকৃত চেতনা। হৃদয়ে হিংসা ও বিদ্বেষ না রেখে সবার মঙ্গল কামনা করাই মুমিনের পরিচয়। মানুষ, প্রাণী ও সমগ্র সৃষ্টির প্রতি দয়া ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুললে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ পথেই অর্জিত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও চিরস্থায়ী সফলতা।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার