কথার গুরুত্ব অনেক। কথা মানুষকে আনন্দ দিতে পারে। আবার কারও হৃদয় ভেঙে দিতে পারে। আমরা অনেক সময় কথাকে খুব সাধারণ বিষয় মনে করি। যা মনে আসে, বলে ফেলি। রাগের সময় মুখে যা আসে, বলে দিই। আড্ডায় হাসতে হাসতে কাউকে নিয়ে মন্তব্য করি। সামাজিক মাধ্যমে কোনো কিছু দেখে সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য করে বসি। কিন্তু একজন মুমিন জানেন, তার উচ্চারিত কোনো কথাই অর্থহীন নয়। তার প্রতিটি কথার হিসাব রয়েছে। তার মুখের প্রতিটি শব্দ আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ রেখো, দুই ফেরেশতা মানুষের ডানে ও বামে বসে তার কাজ লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা সংরক্ষণের জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।’ (সুরা কাফ ১৭-১৮)
এই দুই আয়াত মানুষের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। মানুষের প্রতিটি কাজের হিসাব রাখা হচ্ছে। তার প্রতিটি কথাও সংরক্ষিত হচ্ছে। আমরা অনেক কথা ভুলে যাই। কিন্তু আমাদের বলা সব কথাই সংরক্ষিত হচ্ছে। তাই কারও সঙ্গে কথা বলার সময় মুমিনের সতর্ক থাকা উচিত। কারণ কথা শুধু মুখ থেকে বের হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যায় না। তা আমলের অংশ হয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস একজন মুমিনের কথাবার্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। কথা বলার আগে ভাবতে হবে। কথাটি কি ভালো? এতে কি কারও উপকার হবে? এতে কি আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন? যদি উত্তর না হয়, তাহলে নীরব থাকাই উত্তম।
আমাদের অনেক সমস্যার শুরু হয় মুখ থেকে। রাগের সময় মানুষ এমন কথা বলে ফেলে, যা পরে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। ক্ষমা চাইলেও সেই কথার আঘাত অনেক সময় মানুষের মনে থেকে যায়।
একটি কঠিন বাক্য বছরের পর বছর মনে থাকতে পারে। অথচ কথাটি বলতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তাই রাগের সময় জবানকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তখন চুপ থাকা অনেক বড় বুদ্ধিমানের কাজ।
গিবতও জবানের বড় গুনাহ। কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ আলোচনা করা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে, সেটিই গিবত। আল্লাহতায়ালা সুরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে গিবত থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। মিথ্যা, অপবাদ, কুৎসা, বিদ্রƒপ, অশ্লীল কথা এবং মানুষের দোষ ছড়িয়ে দেওয়াও জবানের ভয়ংকর ব্যবহার।
আবার জবান দিয়েই মানুষ আল্লাহর জিকির করতে পারে। কোরআন তেলাওয়াত করতে পারে। সালাম দিতে পারে। কাউকে ভালো কাজে উৎসাহিত করতে পারে। অসহায় মানুষকে সান্ত্বনা দিতে পারে। বাবা-মায়ের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলতে পারে।
অর্থাৎ জবান মানুষের জন্য এক বিরাট নেয়ামত। এই নেয়ামত দিয়ে সে জান্নাতের পথও বেছে নিতে পারে। আবার নিজের জন্য ক্ষতির পথও তৈরি করতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা কখনো এমন একটি কথা বলে ফেলে, যার পরিণতি সম্পর্কে সে চিন্তা করে না, অথচ সেই কথার কারণে সে জাহান্নামে এমন গভীরে পতিত হয়, যা পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যকার দূরত্বের চেয়েও বেশি।’ (সহিহ বুখারি)
হাদিসটি আমাদের সতর্ক করে। কথা বলার আগে ভাবা জরুরি। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমের যুগে এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখন শুধু মুখের কথাই নয়, মানুষের আঙুলের লেখাও তার বক্তব্যের অংশ। কোনো মন্তব্য, পোস্ট, শেয়ার, মিথ্যা তথ্য বা অপমানজনক বাক্যও মানুষের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
অনেকেই মনে করেন, অনলাইনে লেখা কোনো বিষয় হয়তো পরে মুছে দিলেই সব শেষ। কিন্তু একজন মুমিন জানেন, মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও আল্লাহর জ্ঞান থেকে কিছুই আড়াল করা যায় না। তাই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারেও তাকওয়া প্রয়োজন।
কোনো সংবাদ দেখেই মন্তব্য করার আগে যাচাই করতে হবে। কাউকে নিয়ে কিছু লেখার আগে ভাবতে হবে। কারও সম্মান নষ্ট হতে পারে এমন কিছু প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা কোনো ফাসেক যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা হুজুরাত ৬)
একজন মুমিনের কথা শুধু সত্য হলেই যথেষ্ট নয়। কথাটি প্রয়োজনীয়ও হওয়া উচিত। সত্য কথা হলেও তা যদি অন্যায়ভাবে কারও ক্ষতি করে, তাহলে বলার আগে তার পরিণতি ভাবতে হবে। কথার সৌন্দর্যও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সুরা বাকারা ৮৩)
কোমল কথার মূল্য অনেক। একজন ক্লান্ত মানুষকে একটি সুন্দর কথা নতুন শক্তি দিতে পারে এবং একজন হতাশ মানুষকে আশাবাদী করতে পারে। ভুল কাজ করে ফেলা কোনো মানুষকে অপমান না করে সুন্দরভাবে বোঝানো যায়। সুন্দর কথা বলা ইমানি চরিত্রের অংশ।
প্রতিদিন নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন করা উচিত। আজ আমি কী কী কথা বলেছি? কাউকে কষ্ট দিয়েছি কি না? কারও গিবত করেছি কি না? মিথ্যা বলেছি কি না? অপ্রয়োজনীয় কথা বলে সময় নষ্ট করেছি কি না? আবার কাউকে ভালো কথা বলেছি কি না? এই আত্মসমালোচনা মানুষকে জবান সংযত করতে সাহায্য করে।
মনে রাখতে হবে, মানুষ তার অনেক কাজের হিসাব ভুলে যেতে পারে। কিন্তু মানুষের কথা, কাজ ও নিয়ত মহান আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে। তাই কথা বলার আগে একটু থামা দরকার। শব্দগুলো মেপে নেওয়া দরকার। কথাটি প্রয়োজনীয় কি না, সত্য কি না, সুন্দর কি না, কারও ক্ষতি করবে কি না, তা ভাবা দরকার।
আসুন, কথা বলার আগে ভাবি। ভালো কথা বলি। প্রয়োজনীয় কথা বলি। সত্য কথা বলি। আর যে কথায় মহান আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, সে কথা না বলে নীরব থাকি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জবানের হেফাজত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক