শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় ২২ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। এর মধ্যে সংরক্ষিত শাল-গজারি বাগান রয়েছে কয়েক হাজার একর। দীর্ঘদিন থেকেই এসব বনভূমিতে প্রতিরাতেই হানা দিচ্ছে কাঠ চোরেরা। এমনকি সংশ্লিষ্ট এলাকার উপকারভোগী বা বাগান রক্ষণাবেক্ষণ পার্টিসিপেন্ট সদস্যদের অনেকে এ গাছ চুরির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই বনের গাছ কাটার পরিমাণ বেড়েছে। দিন দিন কাঠচোরেরা যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে পারছে না বিজিবি, বন বিভাগ, এমনকি পুলিশও। তারা যেমন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে, ঠিক তেমনি কেউ কেউ ধরা পড়লেও অদৃশ্য শক্তির ছোঁয়ায় অপরাধী জাল থেকে বেরিয়ে আসছেন। শুষ্ক মৌসুম এলেই বন থেকে গাছ কাটার পরিমাণ বেড়ে যায়। এতে একাধারে ধ্বংস হচ্ছে প্রাণিকূল, নেমে আসছে পরিবেশগত বিপর্যয়, যা ভবিষ্যতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। তাই বনরক্ষায় পাহাড় থেকে গাছ কাটা বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান পরিবেশকর্মীরা।
সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ এপ্রিল প্রকাশ্যে দিনের বেলায় রাংটিয়া রেঞ্জের গজনি বিট এবং ১২ এপ্রিল গভীর রাতে বালিজুরি রেঞ্জের সদর বিট এলাকায় গাছ চোরেরা অসংখ্য গাছ কেটে নেয়। এসব ঘটনায় বালিজুরি রেঞ্জ এলাকা থেকে গাছ কাটার সরঞ্জামাদিসহ দুই চোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে রাংটিয়া রেঞ্জের গজনি বিট এলাকার গাছ চোরকে ধরতে না পারলেও অসংখ্য কাটা গাছ উদ্ধার করেছে বন বিভাগ।
তবে এ ঘটনায় নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে বলে গজনি বিট কর্মকর্তা আবু সালেহীন জানিয়েছেন। এ ছাড়াও বন এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
গতকাল রবিবার ভোরে জেলার শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী রানীশিমূল ইউনিয়নের বালিজুরি রেঞ্জের সদর বিট এলাকার বন বাগান থেকে বনের গাছ ও গাছ কাটার ব্যবহৃত সরঞ্জামসহ দুজন গাছ চোরকে আটক করেছে বন বিভাগ। আটকরা হলেন হালুয়াহাটি গ্রামের মৃত আব্দুস সালামের ছেলে জজ মিয়া (৫০) ও বালিজুরি এলাকার কাসেম আলীর ছেলে জুমুর আলী (৪০)। তারা স্থানীয়ভাবে বনের গাছ চোর হিসেবে পরিচিত।
বন বিভাগের বালিজুরি ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, গতকাল ভোরে বালিজুরি রেঞ্জের সদর বিটের আওতাধীন ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের সৃজিত ৪০ হাজার হেক্টর উডলট বাগান থেকে আকাশমনি গাছ কাটা হচ্ছে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন মিয়ার নেতৃত্বে বালিজুরি সদর বিট কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলামকে নিয়ে বন বিভাগের একটি দল অভিযান চালিয়ে গাছ কর্তন ও পরিবহনের উদ্দেশ্যে মজুদকালে দুজনকে আটক করা হয়।
এদিকে বন বিভাগের উপস্থিতি টের পেয়ে বালিজুরি অফিস পাড়া এলাকার মোজাহাত আলীর ছেলে লাল চান বাদশাসহ (৪৫) তার অন্য সহযোগীরা পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে কাঠ পাচারের কাজে ব্যবহৃত একটি ব্যাটারিচালিত অটো ভ্যান, ১২ টুকরো আকাশমনি গোল কাঠ, চারটি আকাশমনি গাছের মোথা, দুটি হাত করাত ও একটি দা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন মিয়া আটকের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘আটক জজ মিয়া ও জুমুর আলী ওই পাহাড়ি অঞ্চলের পেশাদার কাঠ চোর। আমাদের অভিযানের সময় তাদের আরেক সহযোগী লাল চাঁন বাদশা পালিয়ে যায়। আটককৃতদের শেরপুর আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। বনের গাছ চুরি প্রতিরোধে বন বিভাগের দিনে ও রাতে টহল কার্যক্রম জোরদার করা
হয়েছে। বনজসম্পদ রক্ষার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
অন্যদিকে রাংটিয়া রেঞ্জের গজনি বিট এলাকায় গত শনিবার বিকেলে সামাজিক বনায়নের একটি বাগান থেকে ওই বাগানের উপকারভোগী ফাইজুদ্দিন এবং তার সহযোগী সামেদুল মিলে ১০টি আকাশমনি গাছ কেটে টুকরো করে পাচারের পরিকল্পনা করছিলেন। খবর পেয়ে সামাজিক বনায়নের উপকারভোগী কমিটির সভাপতি দুলাল ম-ল ও তার সহযোগীদের নিয়ে গাছগুলো আটক করে। এদিকে অভিযানের খবর পেয়ে ফয়েজ উদ্দিন ও সামিদুল পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় গজনি বীটের অফিসার আবু সালেহীনকে খবর দিলে গাছগুলো জব্দ করে বিট কার্যালয়ে নিয়ে যায়।
এ বিষয়ে সামাজিক বনায়ন কমিটির সভাপতি দুলাল মন্ডল বলেন, ‘ফয়জুদ্দিন একজন উপকারভোগী হয়েও নিজেই এই বাগানটি গোপনে ৮ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। কাঠ চোরদের মাধ্যমে
প্রায় প্রতি রাতেই গাছগুলো কেটে নিতে সহায়তা করছেন তিনি।’
উপকারভোগী বা বাগান রক্ষণাবেক্ষণ পার্টিসিপেন্ট সদস্যদের গাছ চুরির বিষয়ে জানতে চাইলে গজনি বেটের বীট কর্মকর্তা আবু সালেহীন বলেন, ‘গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত উপকারভোগী ফাইজুর ও সামিদুল চতুর প্রকৃতির মানুষ। তাদের বিরুদ্ধে বন বিভাগের মামলার প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া বন এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে।’