প্রাতিষ্ঠানিক এবং আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না-জানা মোগল সম্রাট আকবর ছিলেন প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত, বিচক্ষণ, বস্তুজ্ঞানী এবং অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী। তার দীর্ঘ শাসনামলে মোগল সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃতি লাভ করেছিল। আকবর ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ তিনি কখনো নেননি। হিন্দু-মুসলিম প্রধান দুই সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় দেশ-শাসন করেছেন। উত্তর ভারতের অসীম সাহসী ও স্বাধীনচেতা রাজপুতদের সমর্থন লাভে এবং বশে আনতে, রাজপুত নারী যোথাবাঈকে বিয়ে করেছিলেন। যোথাবাঈয়ের ভ্রাতা মান সিংহ ছিলেন আকবরের সেনাপতি। মান সিংহ বঙ্গে এসেছিলেন ঈশা খাঁকে দমন করতে। এই ঢাকাতেই মান সিংহ প্রাণত্যাগ করেছিলেন। অসংখ্য ভাষাভাষী ভারতীয়দের ধর্মাচার-জাতীয়তাকে আকবর যথার্থ মর্যাদা প্রদান করেছিলেন বলেই তার শাসনামলে রাজ্যে রাজ্যে বিদ্রোহ তেমন দানা বাঁধেনি। রাজক্ষমতার সামাজিক ভিত্তি প্রসারে হিন্দু ধর্মাবলম্বী তীর্থযাত্রীদের কর মওকুফ ঘোষণাসহ, জিজিয়া কর পর্যন্ত বাতিল করেছিলেন। ভারতীয়দের একক ধর্মের অধীন করতেই দীন-ই-ইলাহি (দিব্য বিশ্বাস) ধর্ম প্রবর্তন করেছিলেন। এতে মুসলিম ধর্মাবলম্বী রক্ষণশীলরা সম্রাটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। ধর্মদ্বেষী আখ্যায়িত করে, তাকে সিংহাসনচ্যুত করতে নানা চেষ্টা করেছিল ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ-সমাজপতিরা। আকবর দীন-ই-ইলাহির মাধ্যমে ভারতবর্ষের প্রধান ধর্মসমূহকে একীভূত করতে চেয়েছিলেন। আকবরের জোড়াতালির ধর্ম-বিশ্বাস ভারতীয় সমাজপতিদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ সম্রাটের বিরোধিতা না করলেও, এই ধর্মীয় নীতির বিরুদ্ধে অসহিষ্ণু প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তোলেন যেমন ধর্মীয় নেতারা, তেমনি অবস্থাপন্ন সমাজপতিরা। মুসলিম ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের এ কারণে নিগৃহীত ও নির্যাতন পর্যন্ত ভোগ করতে হয়েছিল।
অত্যন্ত বিচক্ষণ, বুদ্ধিদীপ্ত আকবরের ছিল প্রখর বৈষয়িক বুদ্ধি। রাজ্যদখল, ধনরত্ন, সম্পদ লুণ্ঠন সম্রাটদের শাসনামলের স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে গণ্য ছিল। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের এক-তৃতীয়াংশ রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হতো। এর ব্যতিক্রমে কৃষকের ওপর নেমে আসত নিষ্ঠুর খড়গ। সব আবাদি জমিতে চাষাবাদে বাধ্য করা হয়েছিল। তেমনি অনাবাদি একখণ্ড জমিও যেন অবশিষ্ট না থাকে সে জন্য তৎপর ছিল রাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় সামন্ত মোড়ল। জমির জরিপে অতীতের দড়ি দিয়ে জমি মাপার পদ্ধতি বাতিল করে তিনি লম্বা বাঁশ দিয়ে জমি মাপার পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন। যেন জমির পরিমাপে হেরফের না হয়। সম্রাটের নিয়োজিত সামন্ত মোড়লদের ওপরই অর্পিত ছিল জমির প্রতিটি অংশের খাজনা ধার্য ও আদায়ের। আকবর নিজ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চলগুলোতে দ্রব্যসামগ্রীর পরিবর্তে অর্থমূল্যে খাজনা আদায়ের নির্দেশ জারি করায়, কৃষকরা মারাত্মক দুর্ভোগের মুখে পড়েছিল। মোড়লদের প্রত্যক্ষ তদারকিতে উৎপাদিত ফসল হাটে বিক্রি করে, কৃষকরা খাজনা প্রদানে বাধ্য হয়েছিল। খাজনা প্রদানের পাশাপাশি কৃষকদের রাষ্ট্রীয় কাজে বিনা মজুরিতে শ্রম দিতে হতো। ফলে ভারতবর্ষের কৃষি অর্থনীতি গড়ে ওঠার পেছনে সম্রাট আকবরের নানা উদ্যোগ ছিল।
কৃষক থেকে বঙ্গাব্দের যাত্রা শুরু হলেও, সব পেশার মানুষ বঙ্গাব্দ অনুসরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর ইংরেজ শাসনের কবলে প্রচলিত বঙ্গাব্দ, খ্রিস্টীয় সালের প্রভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ভারতে বঙ্গাব্দের ব্যবহার শঙ্কার মুখে পড়েছিল বটে, তবে পরিত্যক্ত হয়নি। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর, পূর্ববাংলায় বঙ্গাব্দকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিত্যাগে রাষ্ট্র নানামুখী কর্মকাণ্ড ও অপপ্রচারে মানুষকে বিভ্রান্ত করে তুলেছিল। এটা অস্বীকারের উপায় নেই বঙ্গদেশে হিন্দু সম্প্রদায় শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থে-বিত্তে, জমি-জমিদারিতে প্রায় সব ক্ষেত্রে ছিল অগ্রসর। সে তুলনায় মুসলিম সম্প্রদায় ছিল পশ্চাৎপদ। বাংলা সন-তারিখের ব্যবহার হিন্দু সম্প্রদায়ে অধিক ব্যবহৃত হতো বলে, বঙ্গাব্দ তথা বাংলা সনের ওপর হিন্দুয়ানি মোড়ক সহজে সেঁটে দেওয়ার পথ পেয়েছিল পাকিস্তানি শাসকরা। সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান বঙ্গাব্দের বিরোধিতা করেছিল বটে, তবে হিজরি সনকে চাপানোর উদ্দেশ্যে নয়। বঙ্গাব্দকে নির্মূল করতেই। পাকিস্তানি রাষ্ট্র শত্রু এবং প্রতিপক্ষরূপে কেবল হিন্দুদেরই বিবেচনা করত না। পূর্ববঙ্গে বাঙালিমাত্র ছিল শত্রুতুল্য। পাকিস্তানি আমলে বাংলা সন-তারিখের ব্যবহার গ্রামীণ বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে ব্যবহৃত হতো। নগরকেন্দ্রিক মানুষের মধ্যে ততটা ছিল না। পাকিস্তানি নববর্ষকেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমানদের উৎসব-পার্বণে অংশ নেওয়ার তেমন নজির ছিল না। আমাদের জাতীয়তাবাদী উন্মেষে শহরকেন্দ্রিক বাংলা নববর্ষ পালনের প্রবণতা গড়ে ওঠে। তবে ব্যাপক আকারে নয়। অপর দিকে হিন্দু সম্প্র্রদায় কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালনের পাশাপাশি চৈত্রসংক্রান্তি মেলার আয়োজন করত। সেই চৈত্রসংক্রান্তি মেলা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হিন্দু-অধ্যুষিত অঞ্চলে হতো। বাংলা নববর্ষের দিন হিন্দু সম্প্রদায় স্নান শেষে নতুন জামা-শাড়ি গায়ে চড়িয়ে অভুক্ত অবস্থায় আমের শাখা-ঘট ইত্যাদি পূজার উপকরণ নিয়ে ছুটত মন্দিরে পূজা দিতে। সেখান থেকে ফিরে আহার করত। হিন্দু পরিবারগুলোতে বিরাজ করত উৎসবের আমেজ। তবে মুসলিম পরিবারে এদিনে তেমন উৎসব-পার্বণের আয়োজন ছিল না। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ব্রাহ্মণ দিয়ে পূজা-অর্চনার মতো মুসলিম ব্যবসায়ীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মৌলবি দিয়ে মিলাদের আয়োজন করত। একবার নববর্ষে কলকাতায় ছিলাম। সেখানের বাংলা নববর্ষের উৎসব আনুষ্ঠানিকতা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। বিকেলে বিচ্ছিন্ন কিছু মাঠে নববর্ষকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান দেখেছি। কলকাতা বাঙালি প্রদেশের রাজধানী হলেও, কলকাতা শহরে বাঙালি এখন সংখ্যালঘু। মাড়োয়ারি, শিখ, পাঞ্জাবি, বিহারি, নানা জাতির মানুষের সংখ্যা বিচারে কলকাতার বাঙালিরা প্রায় সংখ্যালঘু। সে কারণে কলকাতায় বাংলা নববর্ষ নিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী প্রবণতা কম দেখা যায়। তারা নিজেদের ভারতীয় পরিচয়ে যতটা আগ্রহী, বাঙালি হিসেবে ততটা নয়। তবে শহরতলি ও মফস্বলে রয়েছে ক্ষুদ্র পরিসরে। তবে আমাদের দেশে প্রতিটি শহরে বাংলা নববর্ষে উৎসব-আনুষ্ঠানিকতা নজির সৃষ্টি করেছে। এত অধিক মাত্রায় অন্য কোনো উৎসব পালন হতে দেখা যায় না। তবে বঙ্গাব্দের সন-তারিখের ভিত্তিতে একমাত্র এই দিনকেই আমরা পালন করি। রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে দ্বিতীয় অপর একটি দিন খুঁজে পাওয়া যাবে না, যা বাংলা সন-তারিখের ভিত্তিতে পালিত হয়। বাংলা নববর্ষ রাজস্ব বর্ষের সূচনার দিন। এখনো দেশের তহশিল অফিসগুলোতে খাজনা আদায় হয় বঙ্গাব্দ অনুসরণে।
গ্রামীণ জনপদে কৃষকের খাজনা প্রদানের ওপর ভিত্তি করে যে বঙ্গাব্দের উৎপত্তি, কালক্রমে সেই কৃষকের জীবনাচারে বাংলা নববর্ষ পালনের দৃষ্টান্ত এখন নেই। তা শুধু শহরের মানুষদের আনন্দ-বিনোদনের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীদের হালখাতার প্রচলনও তেমন নেই। সামগ্রিক বিবেচনায় আমাদের সমাজ জীবনে বঙ্গাব্দের আবেদন ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে। বিস্মৃত প্রায় বঙ্গাব্দ পহেলা বৈশাখের দিন প্রবল বেগে জেগে ওঠে। সেটা উৎসবকেন্দ্রিকতার আকর্ষণে। তবে চেতনার স্থান অন্তঃসারশূন্য। রাজধানীসহ দেশের সব শহরে নববর্ষ আড়ম্বতায় পালিত হয়। নববর্ষ পালনে ভোগবাদিতার সীমা-পরিসীমা থাকে না। আমাদের ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা, বিশ্বায়ন নামক হুমকির কবলে। এটি আমাদের ভাষা-সংস্কৃতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। একদিনের নববর্ষ পালনে, বাঙালিয়ানার নজির সৃষ্টি করলেও; জাতীয়তার চেতনা ক্রমাগত নিম্নমুখী। উৎসবের আধিক্যে ভোগবাদিতা যে পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। অন্তঃসারশূন্য উৎসবের আধিক্যে জাতীয়তাবোধ আমাদের সমাজ-জীবনে প্রভাব ফেলছে বলে ভাবতে পারি না। সমষ্টিগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন শহরের সুবিধাভোগী শ্রেণির এই ভোগবাদিতায় জাতীয়তার চেতনার স্থান নেই। নববর্ষকেন্দ্রিক ভোগবাদিতার মূলে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ মুনাফার কারণেই নানা তৎপরতায় শামিল হয়। দেশজ সংস্কৃতি পরিত্যাগে যারা নিজেদের সমষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে, সেই সুবিধাভোগী শ্রেণি আড়ম্বরে পালন করে বছরের একটি দিনের বাংলা নববর্ষ। পুঁজিবাদ একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। যার মূল লক্ষ্য মুনাফা। মুনাফার প্রয়োজনে সে সব ক্ষেত্রে হাত বাড়ায়। ভোগবাদিতা পুঁজিবাদের সৃষ্টি। নববর্ষকেন্দ্রিক নানা আয়োজন উৎসব আনুষ্ঠানিকতায় করপোরেট পুঁজির প্রভাব লক্ষণীয়। একদিনের বাঙালি হওয়ার অভিলাষই প্রমাণ করে জাতীয়তার টানে নয়, একমাত্র উৎসবে গা-ভাসানো ভোগবাদিতাই প্রধান ও একমাত্র উপলক্ষ। এক কেজি ওজনের ইলিশ মাছ দুই-তিন হাজার টাকায় ক্রয়ের সামর্থ্য সাধারণের নেই। মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের পক্ষেই তা সম্ভব। একদিনের বাঙালি হওয়ার অমরত্বে, নববর্ষে খাদ্য ও বস্ত্রবিলাস তারা সহজে মিটিয়ে থাকে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নববর্ষের উত্তাপ থেকে যোজন যোজন দূরে। এই উৎসব-আনন্দ তাদের স্পর্শ করতে পারে না অর্থনৈতিক কারণে।
নববর্ষ পালনের বিরোধিতা নিশ্চয় করছি না। আমাদের জাতীয় উৎসব-পার্বণের ক্ষেত্রে এই একটি মাত্র ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পালিত হয়। তবে এ উৎসব পালনকে কেন্দ্র করে বৈষম্যের নজরকাড়া দৃষ্টান্ত কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। দেশের হিন্দু সম্প্রদায় ১৪ এপ্রিলের সরকারি নির্দিষ্ট দিনে নববর্ষ পালন করে না। তারা লগ্ন, তিথি, লোকনাথ পঞ্জিকা অনুসারে দিনটি পালন করে। এই বিভক্তি আমাদের জন্য নিশ্চয় শুভবার্তা বহন করে না। বঙ্গাব্দের নববর্ষে ধর্মযোগ প্রত্যাশিত নয়। নববর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটিকে সাম্প্রদায়িকতার নিরিখে পালন কাক্সিক্ষত হতে পারে না। বঙ্গাব্দ ধর্মীয় বিবেচনায় প্রবর্তিত হয়নি। এখানে ধর্মের বিন্দুমাত্র যোগসূত্রতার অবকাশ নেই। আমরা চাই, ধর্মনিরপেক্ষ এই উৎসব আমাদের জাতিসত্তার প্রতিটি মানুষের মিলিত উৎসবে পরিণত হোক। বাঙালি পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতায়-সহমর্মিতায় এক নতুন দিনের সৃষ্টি করুক। বৈষম্যমূলক আচার-আচরণ নিরসন হোক। পারস্পরিক সৌহার্দ্যে আমরা সামষ্টিক বিবেচনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারব। ভোগবাদিতার অবসান হোক। জাতীয়তার চেতনা শাণিত হোক। এর ফলে মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন সব মানুষের অংশগ্রহণে পালিত হবে বাঙালির একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ বাংলা নববর্ষ।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
mibabla71@gmail.com