সম্প্রীতির নববর্ষ

শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। বাঙালি জীবনের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ও সম্প্রীতির বর্ষবরণ উৎসব হচ্ছে পহেলা বৈশাখ। এই উৎসব কেন্দ্রে রেখে উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শ্রমজীবী মানুষ পুরনো বছরের ক্লান্তি-ভ্রান্তি, খেদ-সংকট ধুয়ে মুছে, নতুন বছর বরণ করে নিয়ে নতুন হিসাবের খাতা খোলে। ব্যবসা-বাণিজ্যের দোকানে দোকানে, গদি-আড়তে হালখাতা খোলার ধুম পড়ে। মিষ্টি খাওয়ানো ও বকেয়া পরিশোধের ভেতর দিয়ে নাড়ির যোগ, আন্তরিকতা দেয় নিবিড় স্পর্শের আস্বাদ। হালখাতা একটি অর্থনৈতিক যাত্রা বাঙালির। বিগত বছরের অর্জনের ওপর ভর করে, নতুন বছরে নবউদ্যমে যাত্রার এ উৎসবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, পহেলা বৈশাখে মিলিতভাবে আয়োজন করে মেলার। প্রাণে প্রাণে জেগে-ওঠা আবেগ-উচ্ছ্বাসের মিলনমেলা পরিণত হয় অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি উৎসবে। সেই সব মেলায় কী পাওয়া যায় না? নানারকম পণ্যে ভরে যায় মিলনমেলার মাঠ। দা, বঁটি, ছুরি-কাটি, হাঁড়ি-পাতিলসহ সংসারের যাবতীয় উপকরণ তো মেলেই। আসে মিষ্টি, মোয়া-মুড়কি, চিনির তৈরি হাতি-ঘোড়া, মাছের চিনিসাজ আর শিশুর জন্য খেলাধুলার নানা ব্যবস্থা চলে চরকি, নাগরদোলা, তাসের খেলা। সব মিলিয়ে বৈশাখী মেলা নববর্ষের সর্বজনীন লোকউৎসবগুলোর অন্যতম।

রাজধানী ঢাকা কেবল নয় দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা, হাটবাজার, গ্রাম-গঞ্জে ছোটবড় অনেক মেলা বসে। স্থানীয় লোকেরা এসব মেলার আয়োজন করে। মেলার স্থাায়িত্বকাল সাধারণত এক থেকে সাত দিন। তবে কোথাও কোথাও এ মেলা বৈশাখ মাস ধরে চলে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর জেলার নেকমর্দানে পহেলা বৈশাখে যে মেলা বসে, তা হচ্ছে, উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় এবং জাঁকজমকপূর্ণ মেলা। সাধারণত এ মেলা এক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। উত্তরবঙ্গের এমন বস্তু নেই, যা এ মেলায় পাওয়া যায় না। এ মেলাকে সর্বসাধারণের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। নাচ, গান, নাগরদোলা প্রভৃতি মেলার হাজার বছরের ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত। মেলার দিনগুলোতে ছেলেবুড়ো সবার মধ্যেই বিরাজ করে সাজ সাজ রব। বাংলাদেশের মেলাগুলোতে খুঁজে পাওয়া যায়, দেশের হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী, যা বাঙালির ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক বলে বিবেচিত। বৈশাখী মেলা বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্যের মিলনমেলা।

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে হিজরি ও সৌর ক্যালেন্ডার মিশিয়ে সম্রাট আকবর ‘তারিখ-ই-এলাহী’ নামে নতুন বর্ষপঞ্জি চালু করেন। পরে বাংলা একাডেমি ও গবেষকদের উদ্যোগে বাংলা সন সংশোধন হয়ে ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলাদেশের নববর্ষ উদযাপনের তারিখ নির্দিষ্ট করা হয় ১৪ এপ্রিল। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী চান্দ্র-সৌর পঞ্জিকা অনুসারে তা ১৪ বা ১৫ এপ্রিল পালিত হয়। উদযাপনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য: হালখাতা, বৈশাখী মেলা, লোকনৃত্য-গান ও বৈশাখী খাবার (বিশেষ করে পান্তাভাত-ইলিশ)। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের আনন্দ শোভাযাত্রা এ উৎসবের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ২০১৬ সালে এটি ইউনেস্কোর ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বাংলা নববর্ষ আধুনিক বাংলাদেশে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। আজকের নবযাত্রার গণতান্ত্রিক শাসনের শুভলগ্নে, জনআকাক্সক্ষার পরিপূরক  বৈশাখী মেলা। নতুন ধানের সৌরভে জেগে ওঠে কৃষকের উঠোন। নবান্নের মতোই যেন, আমাদের তা রসালো আস্বাদ সৃষ্টি করে। শাসক ও শাসিতের মধ্যে যে দূরত্ব ও ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে, বৈশাখ ও নতুন ধান তাকে নতুন চিন্তার দ্যুতিতে পূর্ণ করে দেয়। আমরা শাসকদের দৃষ্টিকে, কৃষকের অবদানের দিকে মনোযোগী করে তোলার পক্ষে।  কেননা, তাদের অবদানে নগরের শোভা ও সৌন্দর্য পরিশীলিত হয়। এই সাংস্কৃতিক বিভা সংস্কৃত হয় কর্ষণ ও সৃজনে। সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে জীবন পায় নতুন সংগ্রামের হাতিয়ার। আমরা সেই লক্ষ্যে, মানুষের সৃষ্টি ও মননশীলতা ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত রাখার পক্ষে। আমরা চাই, সম্প্রীতির বাংলাদেশ।