যুগে যুগে দ্বীনের দাওয়াত

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, এর অন্যতম মৌলিক দিক হলো দাওয়াত বা আল্লাহর পথে আহ্বান। মানুষ সৃষ্টির সূচনা থেকেই ভুল-সঠিক, হক-বাতিলের মাঝে পথ খুঁজেছে। এই পথনির্দেশের দায়িত্ব নিয়েছেন আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসুলরা। তারা যুগে যুগে আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন মানুষকে। তাই বলা যায়, দাওয়াত কোনো নির্দিষ্ট যুগ বা সময়ের বিষয় নয়, বরং এটি অবিরাম ধারায় প্রবাহিত এক আলোকিত পথ, যা আদম (আ.) থেকে শুরু হয়ে মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করেছে।

দাওয়াতের পরিচয় : আরবি ‘দাওয়াহ’ শব্দের অর্থ আহ্বান করা, ডাকা বা আমন্ত্রণ জানানো। ইসলামি পরিভাষায় দাওয়াত অর্থ হলো- মানুষকে আল্লাহর প্রতি আহ্বান করা, তাওহিদ, রিসালাত ও আখেরাতের প্রতি ইমান আনার জন্য উদ্বুদ্ধ করা। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘বলুন, এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও।’ (সুরা ইউসুফ ১০৮)

দাওয়াতের সূচনা : মানবজাতির প্রথম নবী আদম (আ.)-ই ছিলেন প্রথম দাঈ। মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতে সৃষ্টি করে শয়তানের চক্রান্তের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ার করেছিলেন। পৃথিবীতে আগমনের পর তিনি নিজের সন্তানদের ইমান ও সৎ পথের দিকে আহ্বান করেন। এখান থেকেই দাওয়াতি মিশনের সূচনা হয়।

নুহ (আ.)-এর ধারাবাহিক প্রচেষ্টা : নুহ (আ.) দীর্ঘ ৯৫০ বছর তার সম্প্রদায়কে মহান আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেন। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি তো আমার প্রভুর বার্তা পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদের জন্য উপদেশ দিয়েছি। আর আমি আল্লাহর কাছ থেকে এমন কিছু জানি, যা তোমরা জানো না।’ (সুরা আরাফ ৬২) তার দাওয়াতি জীবনে ছিল ধৈর্য, কৌশল ও দীর্ঘ সময়ের লড়াই, যা আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।

ইবরাহিম (আ.)-এর যুক্তিপূর্ণ দাওয়াত : ইবরাহিম (আ.) ছিলেন যুক্তির মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়ার অনন্য উদাহরণ। তিনি তার পিতা ও কওমকে যুক্তি ও প্রজ্ঞা দিয়ে আহ্বান করেছিলেন তাওহিদের পথে। কোরআন বর্ণিত হয়েছে, ‘যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, হে আমার পিতা! আপনি কেন এমন কিছুর পূজা করেন যা না শুনে, না দেখে এবং না উপকারে আসে?’ (সুরা মারইয়াম ৪২)

মুসা (আ.)-এর দাওয়াত : মুসা (আ.)-কে মহান আল্লাহ ফেরাউন, হামান ও কারুনের মতো শক্তিধর নেতাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তার দাওয়াতের মূল কথা ছিল, ‘তোমরা দুজন যাও ফেরাউনের কাছে, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে। তার সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলো। হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে বা ভয় পাবে।’ (সুরা তাহা ৪৩-৪৪) এখানে দাওয়াতের সৌন্দর্য ও নম্রতা শেখানো হয়েছে।

ঈসা (আ.)-এর দাওয়াত : ঈসা (আ.) ছিলেন এক মমতাময় দাঈ। তিনি বনি ইসরাইলকে অহংকার ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে মহান আল্লাহর পথে ফেরার আহ্বান জানান। তার দাওয়াত ছিল আধ্যাত্মিক ও মানবিক।

মুহাম্মদ (সা.)-এর দাওয়াত : সব নবীর দাওয়াত ছিল একই, কিন্তু মুহাম্মদ (সা.)-এর দাওয়াত ছিল সর্বজনীন ও চূড়ান্ত। তিনি ছিলেন ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ তথা পৃথিবীবাসীর জন্য রহমত স্বরূপ। ২৩ বছরব্যাপী তার দাওয়াতি জীবন ছিল তিনটি পর্যায়ে।

এক. গোপন দাওয়াত (৩ বছর) : ঘনিষ্ঠজনদের ইসলাম গ্রহণে আহ্বান জানানো হয়। যেমন খাদিজা (রা.), আবু বকর (রা.), আলি (রা.) প্রমুখ।

দুই. প্রকাশ্য দাওয়াত (১০ বছর) : কুরাইশ, তায়েফ, ওকাজ মেলা ও বাইতুল্লাহর সামনে দাওয়াতের মাধ্যমে তার বার্তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

তিন. রাষ্ট্রীয় দাওয়াত ও বিজয় (১০ হিজরি পর্যন্ত) : মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দাওয়াতি কাজকে আরও সুসংহত ও কৌশলী করা হয়। অন্যান্য রাষ্ট্রনায়কদের নিকট চিঠি প্রেরণের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে দাওয়াত দেন।

সাহাবিদের মাধ্যমে দাওয়াতের বিস্তার : রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর সাহাবিরা দাওয়াতের এই মহৎ দায়িত্বকে নিজেদের জীবনের ব্রত বানিয়ে নেন। আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতের সময় ইসলাম আরবের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ওমর (রা.)-এর সময়ে পারস্য, রোম, মিসর পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে যায়। সাহাবিরা ছিলেন দাওয়াতি কাজের জীবন্ত মডেল।

তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের দাওয়াত : এই শ্রেণির মনীষীরা ছিলেন প্রচার ও প্রসারের মহান সেনানী। তারা জ্ঞান, তাকওয়া ও চরিত্র দিয়ে দাওয়াতি কাজ চালিয়ে গেছেন। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বাল (রহ.)-সহ বহু আলেম পরবর্তীদের জন্য দাওয়াতি শিক্ষার ভিত্তি গড়ে দেন।

আধুনিক যুগে দাওয়াত : বর্তমানে দাওয়াতের মাধ্যম ও কৌশল অনেক বদলে গেছে। আজ টেলিভিশন, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব, ব্লগ, বই-পুস্তক, কনফারেন্স, ক্যাম্পেইন ইত্যাদি দাওয়াতের নতুন নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে।

দাওয়াতের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় : বর্তমান বিশ্বে ধর্মবিদ্বেষ, ইসলামফোবিয়া, বিভ্রান্তি, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি বিষয় দাওয়াতের পথে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য দরকার জ্ঞানসমৃদ্ধ দাঈ তৈরি, সহনশীলতা, বহুমাধ্যমিক কৌশল, নির্ভেজাল আকিদা এবং আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধ।

মানবতার কল্যাণে দাওয়াত : দাওয়াত এমন এক আলো, যা যুগে যুগে নবী-রাসুল ও তাদের অনুসারীরা বহন করে এনেছেন। এই দাওয়াত কখনো তলোয়ার দিয়ে নয়, বরং হৃদয় দিয়ে জয় করেছে পৃথিবীকে। আজও সেই দাওয়াত অব্যাহত রাখতে হবে মানবতার কল্যাণে, সত্যের বিজয়ে। আমরা যদি এই দায়িত্ব গ্রহণ করি, তবে আমরা হব সেই মহান ধারার অংশ, যারা মানবতাকে হেদায়েতের আলো উপহার দিয়েছেন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে যুগের শ্রেষ্ঠ দাঈ হওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া গাজীপুর