শিশিরে নয় গরমে ভয়

বৈশাখ তার তাপস নিঃশ্বাস নিয়ে চলে এসেছে, চলছে তাপপ্রবাহ। নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা বাংলাদেশে পা রেখে বর্ষবরণের নান্দনিকতা কিছুটা টের পেয়েছেন তাদের আবাসস্থল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের বৈশাখি আয়োজনে। অনুশীলনে টের পেয়েছেন বৈশাখের রৌদ্ররূপ। নিউজিল্যান্ডের শরতের চমৎকার আবহাওয়া থেকে ঢাকার তপ্ত রোদে অনুশীলনে একেকজনের চেহারায় ফুটে উঠেছে লালচে ছাপ। সরকারের জ্বালানি সাশ্রয় নীতির কারণে ফ্লাডলাইটের ব্যবহার না করে ম্যাচগুলো আয়োজন করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, গ্রীষ্মের প্রখর রোদে ১০০ ওভারের ক্রিকেট খেলা নিয়ে দুদলেই আছে বাড়তি দুশ্চিন্তা। কারণ এই গরমে হিটস্ট্রোক থেকে পানিশূন্যতা, পেশিতে টান হতে পারে অনেক কিছুই।

নিউজিল্যান্ডের কোচ রব ওয়াল্টার মেনে নিচ্ছেন, পরিবেশটা ভিন্ন এবং মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটাই বাস্তবতা, ‘কন্ডিশনটা আলাদা এটাই স্বাভাবিক। এখানে আসার আগে আমরা এমনটাই প্রত্যাশা করেছিলাম, মানিয়ে নিতে কয়েক দিন সময় লাগে, প্রথম ম্যাচের আগে মাত্র দুদিন সময় পাওয়াটা পর্যাপ্ত নয়। অবশ্য আমাদের কয়েকজন ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলংকায় সিরিজ খেলে এসেছে, তারা হয়তো নিউজিল্যান্ড থেকে আসা ক্রিকেটারদের চেয়ে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবে। উষ্ণ রোদে মাঠে থাকাটা খুব দারুণ, তাই না?’ শীতপ্রধান অঞ্চলের মানুষেরা ছুটিতে রোদ পোহাতে যান সৈকতে, ঢাকার বৈশাখ হয়তো কিউই ক্রিকেটাদের ভিন্ন অভিজ্ঞতাই দেবে। খেলা শুরুর সময় এগিয়ে আনার ফলে পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না এমন প্রশ্নে ওয়াল্টার বলেন, ‘প্রস্তুতির দিক থেকে আসলে খুব একটা কিছু করার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত যেমনই হোক না কেন, কন্ডিশন আমাদের এখানেই খেলতে হবে। সময় পরিবর্তনের কারণটি বুঝতে পারি, আমাদের গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। নিজেদের প্রস্তুত রাখতে হবে এটি চ্যালেঞ্জেরই একটি অংশ। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রতিপক্ষ। আমাদের সবকিছু মাথায় রেখেই খেলতে হবে, গরম পুরো প্রক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র। গোটা ম্যাচটাই সূর্যের আলোয় হওয়াতে শিশিরের প্রভাব থাকার সুযোগ নেই।’ ওয়াল্টার বলেন, এতে করে উইকেট হয়তো একটু ধীর গতির হয়ে উঠতে পারে, ‘এ অবস্থায় গরম হাওয়া উইকেটে প্রভাব ফেলতে পারে, শিশিরের প্রভাব একেবারেই থাকবে না, তাতে করে বল ও ব্যাটের লড়াইয়ে একটা ভারসাম্য আসবে। শিশিরের প্রভাব না থাকলেও উইকেট সারাদিন রোদে পুড়ে কিছুটা ধীর গতির হয়ে যেতে পারে। সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।’

বাংলাদেশের কোচ ফিল সিমন্সও অনেকটা একই ধারণা পোষণ করছেন, ‘এটা সামান্য কিছুটা পার্থক্য তৈরি করে। আমার মানে হলো, দিনের বেলা খেলা হলে উইকেট কিছুটা বেশি গ্রিপ করতে পারে (বল উইকেটে কামড়ে ধরতে পারে), আবার উইকেটের গতি কিছুটা ধীরও হতে পারে। তবে যেহেতু আমাদের অনুশীলনগুলো এই সময়েই হচ্ছে, তাই আমরা সেই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি’, সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন এ সাবেক ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার।

শীর্ষ ক্রিকেটারদের ছাড়াই বাংলাদেশ সফরে এসেছে নিউজিল্যান্ড, এ নিয়ে সীমিত ওভারের খেলায় সবশেষ তিন সফরেই বাংলাদেশে ব্ল্যাকক্যাপরা এসেছে অচেনা মুখদের নিয়েই। ওয়াল্টার জানালেন, সবাইকে সুযোগ দিয়ে ভবিষ্যতের ক্রিকেটারদের প্রস্তুত রাখাটাই নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট সংস্কৃতির অংশ, যে কারণে শ্রীলংকায় খেলা ‘এ’ দলের সবাইকেই বাংলাদেশে না পাঠিয়ে কিংবা আইপিএল ও পিএসএল থেকে খেলোয়াড়দের না ডেকে যত বেশিসংখ্যক ক্রিকেটারকে নানান জায়গায় খেলার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে, ‘আমরা শ্রীলংকা সফরের দলটাকেই যদি বাংলাদেশে নিয়ে আসতাম, তাহলে হয়তো আরও ১২ জনকে শ্রীলংকায় খেলার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতাম। আমরা সেটা করতে চাই না, আমরা সুযোগের সর্বোচ্চটা কাজে লাগাতে চাই। এ মুহূর্তে আমাদের ৫৪ ক্রিকেটার বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় খেলছে, এই বাংলাদেশ সফরে থাকা খেলোয়াড়সহ। আমাদের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা মোট ক্রিকেটারের প্রায় অর্ধেক হবে সংখ্যাটা। আমরা সবাইকে বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সুযোগটা দিতে চাই, আমাদের খেলোয়াড় তুলে আনার পদ্ধতিটাকে জোরালো করতে চাই, সুযোগ-সুবিধাগুলো কয়েকজন ক্রিকেটারের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না।’

ভবিষ্যতের খেলোয়াড়দের প্রস্তুত করতে নিউজিল্যান্ড যেটা করছে, বাংলাদেশে করা হয় ঠিক তার উল্টো। উদীয়মান ক্রিকেটারদের আসরে পাঠানো হয় একাধিক বিশ্বকাপে খেলা অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের, তরুণ ও একাডেমির ক্রিকেটারদের টুর্নামেন্টে পাঠানো হয় টেস্ট ক্রিকেটারদের। উদ্দেশ্য থাকে শর্টকাটে সাফল্য কুড়ানো, কিন্তু সেটিও সফল হয় না। ২০১৯ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলে আসা সৌম্য সরকার একই বছর খেলেছেন ইমারজিং টিমস এশিয়া কাপে, খেলেছেন ২০২৩ সালেও, নিউজিল্যান্ড সিরিজের জাতীয় দলেও তিনি আছেন। অস্ট্রেলিয়ার টপ অ্যান্ড টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট যেখানে বেশিরভাগ দল হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার প্রাদেশিক কিংবা বিগব্যাশ ফ্র্যাঞ্চাইজির একাডেমি দল, সেখানেও ২০১৬ সালে অভিষেক হওয়া নুরুল হাসান সোহানকে অধিনায়ক করে দল পাঠানো হয়েছে। জাতীয় দলে দীর্ঘদিন সুযোগ পাওয়া নাঈম শেখ, আফিফ হোসেনরাও খেলেছেন এই টুর্নামেন্টে। উদীয়মানদের আসরে অভিজ্ঞদের পাঠিয়েও হয়নি শিরোপা জেতা, আর নিউজিল্যান্ডের কোচ স্পষ্ট করেই বলে দিলেন জেনে বুঝেই কেন শীর্ষ ক্রিকেটারদের বাইরে রেখে এসেছেন কিউইরা। এই দর্শন ও সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারণেই মাত্র ৫৪ লাখ মানুষের দেশ, যেখানে ক্রিকেট সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা নয়, তারাই ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির সবশেষ দুটো আসরের রানার্সআপ। আর বাংলাদেশ স্বপ্ন বুনছে সরাসরি ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলার।