মধ্যপ্রাচ্যে এবারের যুদ্ধ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই দেশ দুটিকে আলোচনায় বসাতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এ আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে দুই দেশই ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী দুই দিনের মধ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা এ আলোচনা শুরুর কথা বলছেন। তবে পাকিস্তানের সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশটির দুই ক্ষমতাধর ব্যক্তিই গুরুত্বপূর্ণ মিশনে দেশের বাইরে থাকায় ঠিক দুই দিনে এ আলোচনা শুরু নাও হতে পারে। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ আলোচনা আবার শুরুর হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তান সরকারের দুই শীর্ষ ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে আবার টেনে আনতে বেশ দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির গতকাল বুধবার ইরানের রাজধানী তেহরান পৌঁছেছেন। আর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী তিন দেশে চার দিনের সফরে রয়েছেন। দেশগুলো হলো সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েত।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন চালালে এ যুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শুরু হয়, যা আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফক্স নিউজকে গতকাল বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হ্ওয়ার ‘খুব কাছাকাছি’ রয়েছে। এবারও বৈঠকটি পাকিস্তানে হতে পারে, এমন ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইসলামাবাদে গত ১১ এপ্রিল আলোচনা শুরু করে। টানা ২১ ঘণ্টা চলার পর কোনো চুক্তি ছাড়াই তারা আলোচনা শেষ করে।
ফক্স নিউজে আবার আলোচনা শুরুর সম্ভাবনার দিকটি প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি ‘বড় ধরনের দরকষাকষি’ করতে চান।
যুক্তরাষ্ট্র এ আলোচনার বিষয়ে কথা বললেও ইরান গতকাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নৌঅবরোধ শুরুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আবার আলোচনার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
নৌ-অবরোধ : যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, গত সোমবার বিকেলে নৌ-অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো জাহাজ ইরান থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে বের হতে বা প্রবেশ করতে পারেনি। ছয়টি বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করলেও সেন্টকমের নির্দেশে পুনরায় ইরানের বন্দরে ফিরে গেছে।
সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের দাবি, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর করা হয়েছে। তিনি বলেন, সাগরপথে ইরানের সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তবে বিবিসি বলছে, ইরান-সম্পৃক্ত কমপক্ষে চারটি জাহাজের মধ্যে দুটি ইরানের বন্দরে কাজ শেষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। আর ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এমন আরও তিনটি জাহাজকে প্রণালি পার হতে দেখা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের ওপর চাপ তৈরি করে আলোচনায় সুফল পেতে যুক্তরাষ্ট্র এ নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে।
তেহরানের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করার জন্য ট্রাম্প দুটি নতুন শর্ত যোগ করেছেন। তিনি বলেন, নতুন করে আলোচনা শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ ও অবাধে পুনরায় চলাচলের জন্য খুলে দিতে হবে। আরেকটি শর্ত হলো, যেকোনো চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য ইরানের প্রতিনিধিদলকে অবশ্যই দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব পেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইসলামাবাদে পৌঁছানো যেকোনো সমঝোতায় ইরান সরকারের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্মতি থাকতে হবে।
তিন সাগরে চলাচল বাধার হুমকি ইরানের: ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার দেশকে ‘আত্মসমর্পণে’ বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যেকোনো প্রচেষ্টা ‘ব্যর্থ হতে বাধ্য’। গতকাল তেহরানে জরুরি পরিষেবা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান ‘যুদ্ধ বা অস্থিতিশীলতা নয়’, বরং সব সময়ই ‘গঠনমূলক আলোচনার’ পক্ষে।
তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়কারী সর্বোচ্চ অপারেশনাল কমান্ডের কমান্ডার আলী আবদুল্লাহি বলেছেন, অবরোধ অব্যাহত রেখে ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলের ট্যাংকারের জন্য নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করলে সেটি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সূচনা করবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখলে তার দেশ পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর ্এবং ওমান সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা দেবে।