কুমিল্লায় ট্রাকচাপায় থেমে গেল ৭ শ্রমিকের স্বপ্ন

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশের গ্রামগুলো ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে দাউদকান্দির হাসানপুর এলাকা। ছুটে আসেন স্থানীয়রা। দেখেন খাদে উল্টে আছে চালবোঝাই একটি ট্রাক আর তার নিচে চাপা পড়া কয়েকটি নিথর দেহ। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে গত সোমবার রাত সোয়া ৩টার দিকে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সাত শ্রমিক। আহত হন আরও ছয়জন, যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহতরা সবাই দিনাজপুর জেলার বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে অল্প খরচে দূরের পথে পাড়ি দিতে তারা বেছে নিয়েছিলেন পণ্যবাহী ট্রাক। নতুন কাজ, নতুন আশার খোঁজে তাদের গন্তব্য ছিল চট্টগ্রাম। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে তাদের জীবনের শেষ পথচলা।

এ ছাড়া গতকাল বুধবার বিকেলে কুমিল্লার দেবীদ্বারে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় সিএনজি চালিত অটোরিকশা উল্টে মৃত্যু হয়েছে মা ও ছেলের। কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবীদ্বার পৌর এলাকার বারেরা সরকারবাড়ি সংলগ্ন স্থানে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন মুরাদনগর উপজেলার জাড্ডা গ্রামের দিদার মিয়ার স্ত্রী রওশন আরা বেগম (৩৮) এবং তার ছেলে ইয়ামিন (৬)। আহত হয়েছেন আরও চারজন। এ ঘটনায় কাভার্ডভ্যান ও চালককে আটক করেছে পুলিশ। এদিকে গত মঙ্গলবার রাতে নীলফামারী-সৈয়দপুর মহাসড়কে ট্রাকেরচাপায় পিষ্ট হয়ে দুই সহোদর, নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস-পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে পিকআপ চালক নিহত হয়েছেন এবং গতকাল বুধবার পটুয়াখালীর দুমকি-বাউফল সড়কে মালবাহী পিকআপেরচাপায় নিহত হয়েছেন একজন পথচারী।

কুমিল্লার ঘটনায় স্থানীয়রা জানান, দুর্ঘটনার পরপরই তারা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে উদ্ধারকারী দল এসে হতাহতদের উদ্ধার করে। নিহতদের মরদেহ রাখা হয়েছে দাউদকান্দি হাইওয়ে থানায়। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পাঠানো হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

নিহতরা হলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার খালিবপুর এলাকার আফজাল হোসেন (৩৫), সোহরাব হোসেন (৪০), সালেক (৪৫), জেলার বিরামপুর উপজেলার সুমন (২১), বিষু (৩৫), আবু হোসেন (৩০) ও আব্দুর রশিদ (৫৫)।

দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাছরিন আক্তার জানান, ‘প্রাথমিকভাবে নিহতদের পরিবারকে দাফন ও শেষকৃত্যের জন্য ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।’

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামান্য এই আর্থিক সহায়তা কি পূরণ করবে তাদের শূন্যতা? তারা বলছেন, এই দুর্ঘটনা আবারও প্রশ্ন তোলে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেন এখনো মানুষ পণ্যবাহী যানবাহনে যাতায়াত করতে বাধ্য হয়? এর পেছনে হয়তো লুকিয়ে আছে দারিদ্র্য, সীমাবদ্ধতা আর জীবিকার নির্মম বাস্তবতা।

দুর্ঘটনায় আহত আমির আলী বলেন, ‘আমরা বিরামপুর থেকে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে ট্রাকে উঠি। মেঘনা ব্রিজ পার হওয়ার পর ড্রাইভার হেলপারকে চালাতে দেয়। এরপরই গাড়িটি হেলে-দুলে চলতে থাকে।’

ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা জানান, ‘ট্রাকের যাত্রীরা চাউলের বস্তা বাঁধা রশির (দড়ি) সঙ্গে নিজেদের বেঁধে রেখেছিলেন, যেন ঘুমিয়ে থাকলে ব্রেক করলে তারা পড়ে না যান। আর এই রশি বাঁধার কারণেই দুর্ঘটনার পর তারা বের হতে পারেননি।’

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) দাউদকান্দি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকত, তাহলে এত বড় প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো।’

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কুমিল্লা হাইওয়ে রিজিয়নের পুলিশ সুপার শাহিনুর আলম খান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, সড়কের অবস্থা ভালো ছিল। সেক্ষেত্রে চালকের দক্ষতা, ক্লান্তি বা লাইসেন্স সংক্রান্ত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

নীলফামারী : এদিকে নীলফামারীতে ড্রাম ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে দুই সহোদরের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও একজন। গত মঙ্গলবার নীলফামারী-সৈয়দপুর মহাসড়কের পূর্ব সূটিপাড়া জামতলী টেক্সটাইল বাজার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন সদর উপজেলার পশ্চিম কুচিয়ারমোড় এলাকার তরিকুল ইসলাম বাবুর বড় ছেলে মো. সিহাব হোসেন (১৯) ও ছোট ছেলে মো. সোয়াদ (৬)। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন একই এলাকার স্টালিনের ছেলে মোহাম্মদ হোসেন (১০)।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার সময় জেলা সদরের টেক্সটাইল বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন ওই তিন কিশোর। এ সময় নীলফামারীগামী একটি দ্রুতগতির ড্রাম ট্রাক পেছন থেকে তাদের ধাক্কা দেয়। এতে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই দুই সহোদরের মৃত্যু হয়। পরে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে গুরুতর আহত অবস্থায় মোহাম্মদ হোসেনকে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

বড়াইগ্রাম (নাটোর) : নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও ডিম বোঝাই পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে রাহুল ইসলাম বাদশা (৩৫) নামে একজন নিহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার সকাল ৬টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে উপজেলার গড়মাটি কলোনী এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত পিকআপচালক রাহুল ইসলাম বাদশা শেরপুর জেলার সদর উপজেলার গৌরীপুর গ্রামের নূর ইসলামের ছেলে।

দুমকি (পটুয়াখালী) : পটুয়াখালীর দুমকি-বাউফল সড়কে মালবাহী পিকআপেরচাপায় মো. হারুন অর রশীদ খান (৭০) নামে এক পথচারী নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় মজিবুর রহমান (৪০) নামে আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে দুমকি উপজেলা কমপ্লেক্সসংলগ্ন সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে সড়কের পাশে হাঁটার সময় পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি পিকআপ হারুন অর রশীদ খানকে চাপা দেয়। এ সময় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই হারুন অর রশীদের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় আহত পিকআপের সামনের আসনে থাকা মজিবুর রহমানকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর চালক পালিয়ে যায়।