নিরাপত্তা জোরদারে নেওয়া প্রকল্পেই নিরাপত্তা ঝুঁকি

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১০ এএম

দেশের তিন বিমানবন্দরের বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের নিরাপত্তা জোরদারে নেওয়া প্রকল্পেই তৈরি হয়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। বিমানবন্দরগুলোর ‘রানওয়ে সারফেসে অ্যাসফল্ট কংক্রিট ওভারলেকরণ’ প্রকল্পটির রানওয়ে অ্যান্ড সেফটি এরিয়া আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়নি। দুর্ঘটনার সময় আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের জন্য অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি কেনার পরিকল্পনা থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। পাশাপাশি স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাও অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সম্প্রতি প্রকাশিত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জানা গেছে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ৫৬৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকায় ‘যশোর, সৈয়দপুর ও রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরের রানওয়ে সারফেসে অ্যাসফল্ট কংক্রিট ওভারলেকরণ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এতে সরকারি অর্থায়ন ৪৫৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১১৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে নির্ধারিত সময়েও শেষ হয়নি। তাই ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপরও চলতি বছরের মে পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭৬ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ভৌত অগ্রগতি ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শাহ মখদুম বিমানবন্দরে ৮২ দশমিক ১২ শতাংশ হলেও ভূমি ও অন্যান্য জটিলতার কারণে যশোর বিমানবন্দরে অগ্রগতি মাত্র ৫১ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

প্রকল্পের আওতায় যশোর, সৈয়দপুর ও শাহ মখদুম বিমানবন্দরের রানওয়েতে যথাক্রমে ২৮০ মিলিমিটার, ২১০ মিলিমিটার ও ২৭০ মিলিমিটার পুরুত্বের অ্যাসফল্ট কংক্রিট ওভারলে নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিমানবন্দরগুলোর এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং ব্যবস্থা উন্নয়ন, রানওয়ে সাইড স্ট্রিপ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রতিটি বিমানবন্দরের জন্য পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি কেনাও প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত আছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী রানওয়ে স্ট্রিপের প্রস্থ ১৫০ মিটার হওয়া উচিত। কিন্তু তিন বিমানবন্দরের কোনোটিতেই এ মানদন্ড অনুসরণ করা হয়নি। যশোর বিমানবন্দরের নকশায় স্ট্রিপের প্রস্থ ৭০ থেকে ১৫০ মিটার ধরা হলেও বাস্তবে তা ৭০ থেকে ১২০ মিটার পাওয়া গেছে। রাজশাহীর শাহ মখদুম ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরেও স্ট্রিপের প্রস্থ মাত্র ৭০ থেকে ১০৫ মিটার। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে বিমান রানওয়ে থেকে সামান্য বিচ্যুত হলেও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আইসিএওর মানদন্ড অনুযায়ী রানওয়ের শেষ প্রান্তে রানওয়ে অ্যান্ড সেফটি এরিয়া (রেসা) ২৪০ মিটার হওয়া বাধ্যতামূলক। অথচ তিন বিমানবন্দরের নকশায় রেসা সম্পর্কে কোনো তথ্য উল্লেখ নেই; বিল অব কোয়ান্টিটিজ অংশও ফাঁকা রাখা হয়েছে। তবে সরেজমিন দেখা গেছে, বিমানবন্দরগুলোর উভয় প্রান্তেই রেসার দৈর্ঘ্য মাত্র ৯০ মিটার। অর্থাৎ প্রতিটি বিমানবন্দরেই ১৫০ মিটার করে এই নিরাপত্তা এলাকার ঘাটতি রয়েছে।

আইএমইডির মতে, রেসা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী না থাকায় কোনো বিমান অবতরণের সময় রানওয়ে অতিক্রম করলে বা রানওয়েতে পৌঁছানোর আগেই ছিটকে পড়লে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ কারণে তিন বিমানবন্দরেই উভয় দিক থেকে রেসা দ্রুত সম্প্রসারণ জরুরি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানবন্দরে সসার লাইটের জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে, যার ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ সোলার সিস্টেম থেকে সরবরাহের কথা। তবে সরেজমিন সোলার সিস্টেমটি অকার্যকর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সোলার ইনভার্টার ও ব্যাটারিও নষ্ট অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় যশোর, সৈয়দপুর ও শাহ মখদুম বিমানবন্দরের জন্য আইসিএও ফায়ার ক্যাটাগরি-৭ মানের তিনটি আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি কেনার পরিকল্পনা থাকলেও ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো চুক্তি হয়নি।

প্রকল্প শুরুর পর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত পাঁচ বছরে একবার বাহ্যিক অডিট সম্পন্ন হয়েছে। ওই নিরীক্ষায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ লাখ টাকার একটি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়। আইএমইডি জানিয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারদের হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা জমা না দেওয়ার পরও বিল থেকে ৯ লাখ টাকা স্থগিত না রেখে পরিশোধ করা হয়েছে। সময়মতো কর্মপরিকল্পনা দাখিল ও কার্যকর তদারকির অভাবে কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। ফলে পরামর্শক সেবা, যানবাহন ভাড়া ও প্রশাসনিক ব্যয়সহ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেছে আইএমইডি।

প্রকল্পে রানওয়ে স্ট্রিপের প্রস্থ ও সেফটি এরিয়ার ঘাটতির পাশাপাশি আরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইএমইডির তথ্যমতে, রানওয়ে ওভারলের কাজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রকৌশল মান অনুসরণ করে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে বিমানবন্দরের পেভমেন্টের গুণগত মান, পরিচালন সক্ষমতা ও নিরাপত্তার উন্নতি হলেও এখনো রানওয়ের আংশিক অসমতা বা বাম্পিং ইফেক্ট, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা অবকাঠামোর ঘাটতিসহ কিছু অপারেশনাল সহায়ক অবকাঠামো অসম্পূর্ণ রয়েছে।

আইএমইডির সমস্যাগুলোর সমাধানের সুপারিশ করে বলেছে, এগুলো বাস্তবায়ন হলে প্রকল্পটি দেশের আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ, নিরাপদ বিমান পরিচালনা, অর্থনৈতিক কর্মকা- বৃদ্ধি এবং পর্যটন খাতের উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত