শেরপুরের নকলা সরকারি হাজী জালমামুদ কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা (কমার্স) শাখা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থী সংকটে বিভাগটি বিলুপ্তির পথে গেলেও সেখানে বহাল রয়েছেন ৯ জন শিক্ষক। মাত্র ৪ জন শিক্ষার্থী নিয়ে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করায় প্রতি মাসে সরকারের লাখ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও কলেজটির ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে তুলনামূলক শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী কমে বর্তমানে তা ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে এসেছে। অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী উপস্থিতি না থাকলেও শিক্ষক পদগুলো বহাল রয়েছে। ফলে বাস্তব শিক্ষা কার্যক্রম না থাকলেও সরকারের অর্থ ব্যয় অব্যাহত আছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন! যেখানে শিক্ষার্থী মাত্র ৪ জন, সেখানে এতসংখ্যক শিক্ষক বহাল রাখার যৌক্তিকতা কী? তাদের অভিযোগ, শিক্ষক পুনর্বিন্যাস বা বিভাগীয় বাস্তবতা মূল্যায়নে প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, "শিক্ষার্থী না থাকা সত্ত্বেও ৯ জন শিক্ষক একটি বিভাগে কর্মরত—এটি শুধু অদক্ষ ব্যবস্থাপনা নয়, বরং সরকারি অর্থের সরাসরি অপচয়। সংশ্লিষ্টরা জানার পরও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন।"
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অনেক সরকারি কলেজেই শিক্ষক সংকট রয়েছে। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম, আবার কোথাও শিক্ষার্থী না থাকলেও অতিরিক্ত শিক্ষক বহাল রাখা হয়েছে। নকলা সরকারি হাজী জালমামুদ কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা শাখার চিত্র সেই বৈষম্যেরই একটি উদাহরণ।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ভারসাম্য নিশ্চিত না হলে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। বরং এমন অব্যবস্থাপনার ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় বাড়বে। সংশ্লিষ্ট বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় এনে শিক্ষক পুনর্বিন্যাস করা হলে সরকারের ব্যয় কমানো সম্ভব।
এ বিষয়ে কলেজ প্রশাসনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে নকলা সরকারি হাজী জালমামুদ কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আব্দুল বার্সেদ বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন আর কমার্সে ভর্তি হতে চায় না, শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এতে আমাদের কি করার আছে! ২০১৮ সালে কলেজটি সরকারি হওয়ার আগেই এদের সবাই নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছে।
এদিকে চন্দকোনা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ খন্দকার আরিফুল আলম রবিন বলেন, ব্যবসায়ী শিক্ষা (কমার্স) খুব ভালো সাবজেক্ট কিন্তু, কেন যে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে চায় না তা জানা নেই। অথচ বাংলাদেশে কমার্স থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা ব্যাংক সেক্টর থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টরে চাকুরির বিশাল সুযোগ রয়েছে।
তবে শিক্ষা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শেরপুর, সাইফুল ইসলাম কমল বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তাদের মতে, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এমন অকার্যকর বিভাগগুলোতে দ্রুত সংস্কার আনা জরুরি।
সরকার যখন শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ব্যয় সাশ্রয়ের নানা উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন মাত্র ৪ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ৯ শিক্ষক বহাল থাকার ঘটনা সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে—এই দায় কার, আর কতদিন চলবে এমন অপচয়?