নির্মলেন্দু গুণ
সে আর আসে না
আদরকাতর দেহ কাঁপিতেছে
যেন ফলবতী বেতসের লতা।
কখন আসবে তার পরমপুরুষ
কখন সে আলিঙ্গনে
হবে সমর্পিতা।
দিন যায় রাত আসে, রাত যায়—
শ্লথ হয়ে আসে কটিবন্ধ—
বকুলের মালা সুগন্ধ ছড়ায়
ভোরের বাতাসে—
সে আর আসে না।
মাসুদ খান
মধুফাঁদ
ভ্রমরকে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে নির্ঘাৎ ফাঁসিয়ে দেবে মধুফাঁদে
তবে নিজে প্রচারিত হবে যেন নিষ্পলক, নিষ্পক্ষ, নির্দল।
এই এক অভিনব মধুফাঁদ, যাকে বলে, মধুফাঁদ দুই দশমিক শূন্য, যার
আসঞ্জনে, ব্যামোহে, আটকে পড়ামাত্র
শিকার চূড়ান্তভাবে হয়ে পড়ে বিমর্ষ ও হীনম্মন্য।
তুমি তো নিমিত্ত মাত্র, নিজধর্মে বশীভূত।
এ জগতে, জানো তো, দংশনই ধর্ম, হিংসাই সর্বসার।
তোমার এ উদ্যত ছোবলভঙ্গি তাই যথারীতি
সুন্দর ও স্বাভাবিক লাগে।
দ্রব্যে দ্রব্যে এত আঠা, এত আসঞ্জন
বিষয়ে বিষয়ে এত বিষ, এত মোহঘোর
সবকিছু মায়াত্মক, নেশা-নেশা, মনোহর!
ফরহাদ মজহার
সূর্য
সূর্যের সঙ্গে আমার কোনো দুষমনি নাই
কারণ আমি সূর্যের আলোয় জগৎ প্রত্যক্ষ করি
আমার ঘর থেকেই আমি সেই সদর রাস্তা দেখতে পারি
যে সড়ক আমাকে আমার গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে।
কিন্তু সূর্য পেন্টাগনের ওপরও আলো ফেলে
এমনকি ট্রম্পের রাজপ্রাসাদে, হোয়াইট হাউসে
জানালা গলিয়ে একই আলো পড়ছে ট্রম্পের টেবিলে
যেখানে ট্রাম্প একটি সভ্যতার বিলয় ঘোষণা করেছেন।
বুঝতে পারি কেন ইরানের জনগণ তাদের মিসাইলগুলো
পাহাড়ের অত্যন্ত গভীরে নিবিড় অন্ধকারে লুকিয়ে রাখে
কিন্তু শত্রুকে নিখুঁত তাক করতে তাদের ভুল হয় না
কারণ গোপনীয় অন্ধকার সভ্যতার দুষমনদের রুখে দিতে পারে।
কসম গ্রহ নক্ষত্রের, সূর্যের বিরুদ্ধে আমার কোনো দুষমনি নাই
বাংলায় বৈশাখে যখন মেঘ সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়ায়
আমি আতঙ্কিত হই কারণ ভয় হয় রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি।
তারপরও ঝাপসা স্মৃতির নির্দেশ মেনে আমি ঘরে ফিরতে পারি।
কিন্তু আজকাল ভালো লাগে; ভাবি কোথাও পাহাড়ের তলায়
গভীর অন্ধকার গুহায় তৈরি হচ্ছে ইন্টার বালিস্টিক মিসাইল
যা হুংকারে ভূমি ও আকাশ ফুঁড়ে উড়ে যাবে নির্দিষ্ট নিশানায়
যেখানে বসে আছেন জগৎ ও সভ্যতা বিনাশকারী প্রেসিডেন্ট।
আলোর সঙ্গে আমার বিরোধ নাই কিন্তু সৃষ্টির রহস্য অন্ধকারে
যেখানে একটি ভ্রুণের মধ্যে আমি একদা জন্ম নিয়েছিলাম।
শেলী নাজ
শরীরযাত্রা
পুরুষের পক্ষে অসম্ভব হলো এই অভিযান
শরীরে আমার, অশ্রু দেখি তার অচল কামানে
গোলাঘর ভরা যত জাদু সে তো অশ্লেষে ভরেছে
বোবা অস্ত্রে, তবু কেন দিশেহারা শিকারির গান?
বাসনার চিৎকার তুলে রাখি অনঙ্গ সিন্দুকে
নির্দয়, আমি তো পেতে রাখি নম্র নিরস্ত্র শিবির
অশান্তির অগ্নিকু-ে তুমি হও একান্ত নির্ঝর
জ¦র নিয়ে অশ্বমেধ শেষ করো, বলি, জাগো সাকি!
পুরুষ উগড়ে দেয় তার ক্লেদ শরাবন তহুরায়
যতই দেখতে চাই লৌহবনে মধু, ক্ষার; তুমি
শূন্যগর্ভ কলসের দম্ভ, আমি অনন্ত পিপাসা,
দেহাগ্নি কোথায় রাখি, হৃদভস্ম কোথায় ভাসাই?
পুরুষের পক্ষে অসম্ভব হলো এই অভিযান
হাবসী রাত্রির বুকে জ¦লি আমি একা মরূদ্যান!
নাসরীন জাহান
ঈর্ষার ইঁদুর তুই?
কদম গাছের রোদ খেয়ে তোর পেট ভরেনি,
চাঁদের গায়ে চাঁদ খেয়েছিস,
বলে যাচ্ছিস ভালোবাসিস?
আমি যেন জা হই তার
যেন তাহার ভায়রা ভাই,
যতই ভদ্র, যতই যতই খাতির,
ঈর্ষা একটা লাগাই চাই!
আমি কি তোর বাড়তি জরুল? বুড়িগঙ্গার নষ্ট জল?
মোহ মেরে মন ভরেনি,
ভেঙে যাচ্ছিস মন অতল?
যতই ভদ্র থাকিস,
যতই ভালোবাসিস
খোঁচা একটা না দিলে রাত
চক্ষু নেভায় না!
শিহাব শাহরিয়ার
বুক
‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘন ঘোর বরিষায়’—
বৃষ্টি এলেই জানলা খুলে
তাকাও তুমি বাইরে
বাইরে তো নয়
চার দেয়ালের কান্না দেখে
বুক ফাটে যে—হায়রে!
ওই যে দেখো
নদীর বুকে রোদ ফুটেছে
রোদের চোখে ঘোমটা
প্রথম শাড়ির দুঃখ নিয়ে
পুড়েই গেছ
মরেই গেছ
হারিয়ে গেছে মনটা
মঈনুস সুলতান
সোনার অশ্ব
মাঝেমধ্যে স্বপ্নের ঘোরেও ভুলচুক হয়ে যায়
মেলে না মানসাঙ্কের হিসাব, মনে হয় খোয়া গেছে
সহায়-সম্পদ বিপুল,
দেখি—কাচের আলমিরায় থরে বিথরে সাজানো বইপত্তর,
ছাদ থেকে ঝুলছে ফানুস, তাতে লেখা বিসর্গ অনুস্বর—
পোড়ামাটির মহিষ এক চশমাচোখে পড়ছে
গদ্য-পদ্য বিলকুল;
আমার বাংলাঘরের বারান্দায় রাতের আন্ধারে
রেখে গেছে কেউ লোহিত রঙের ডাকবাক্স এক
জড়ানো তা শিশিরসিক্ত বেলফুলে,
আয়নায় দেখি—কার দেহহীন অজানা মস্তক
ঝাঁকে ঝাঁকে ঘাসফড়িং বসে আছে খোলা চুলে;
কোথাকার কুলত্যাগী কোকিল এক ছোঁ মেরে
তুলে নেয় আমার খেলনা জুড়িগাড়ি,
উটের পিঠে চেপে মরুপথে চলে বৃক্ষ এক—
তিতকুটে পত্রালি শোভিত ঘোড়ানিম,
স্বপ্নের পালতোলা জাহাজে কখনো মালাক্কা প্রণালি দিই পাড়ি,
বাস্তবে ঘটে না কিছু—পাড়ে না সোনার অশ্ব কোনো ঘোড়ার ডিম।
লুবনা চর্যা
গোপন স্টুডিও
ঝড়ের কারখানায় আমার জন্ম। উত্তাল বাতাস, ক্রুদ্ধ গাছ, আচমকা বৃষ্টি—এরাই ছিল আমার জন্মকালীন নার্স। আর ডাক্তার ছিল স্বয়ং এক বিশালকায় ঝড়ো সমুদ্র। তাই ঝড়কে আমি করি না ভয়। কারণ এরাই আমার নিকটাত্মীয়, আমার জেনেটিক পরিচয়।
ঝড় শব্দটা শুনলে আমার চোখে শুধু একটা হলুদ পাতার ইমেজ ভাসে। মাটিতে পড়ে থাকা যে পাতাটা বিদ্যুৎ গতি পেয়েছিল ঝড়ের ছোঁয়ায়। যেভাবে বাবা আমাকে ছোটবেলায় সাইকেল চালানো শেখাত, মনে হয় ঝড়ও সে রকম পাতাটাকে হাতে ধরে উড়তে শেখায় এমন আবহাওয়ায়।
ঝড়কে ভালো লাগে কারণ সে প্রচ-। প্রচ- রাগ, প্রচ- প্রেম, প্রচ- অভিমান, প্রচ- কান্না, প্রচ- সাহস, প্রচ- পরিশ্রম, প্রচ- শান্তি, প্রচ- কনফিউশন—এ সবই আমার জীবনের কালারপ্যালেটে শাশ্বত রঙ হয়ে টিকে আছে। আমি এদের যতœ নিই। এদের দিয়ে রঙিন করি ছবির জগৎ।
ঝড় হলো আদতে আমার শিক্ষক। বুড়ো বয়সেও প্রতিদিন আমি তার পাঠশালায় যাই। আমি যতই বৃদ্ধ হই না কেন, ঝড় কিন্তু আগের মতোই তরতাজা যুবক। আর আমিও কিন্তু কম যাই না। মাঝে মাঝে এই মহান শিক্ষকদের ধরে ধরে খেয়ে ফেলি—ছোট, বড়, মাঝারি সাইজের ঝড়। খাওয়ার পর তাদের হাড্ডিগুড্ডি জমা করে রাখি ব্ল্যাকহোলে আমার গোপন স্টুডিওর ভেতর।