দুর্নীতি ও প্রভাব বিস্তার

চার দপ্তরের দায়িত্বে থাকা সেই পরিচালক বরখাস্ত

মিজানুর রহমান শ্রম অধিদপ্তরে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। দিনে দিনে তিনি এতটাই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন যে, এক পর্যায়ে ১০ জন কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে বাগিয়ে নেন খুলনা বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পরিচালকের পদ। আর তখন একইসঙ্গে ছিলেন চারটি দপ্তরের দায়িত্বে।

দীর্ঘ ১৬ বছরে তদানীন্তন শ্রম প্রতিমন্ত্রী এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, ঘুষ, দুর্নীতি এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন, এমন অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পৃথক অনুসন্ধান ও তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মামলা দায়ের ও চার্জশিট দাখিল হয়েছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। চার্জশিট দাখিল হওয়ার পর সম্প্রতি তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে পদোন্নতি গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের পর অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রমাণ পাওয়ায় কমিশনের অনুমোদন প্রাপ্ত হয়ে দুদক ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মামলা করেছে।

মামলার তদন্তে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এবং এতে সম্পৃক্ত থাকায় সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুূফিয়ান ও শ্রম দপ্তরের পরিচালক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। দুদকের পরিচালক মো. আব্দুল মাজেদ মামলাটি তদন্ত করেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট জব্দকৃত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে তিনি যে প্রতিবেদন দেন, তাতে বলা হয়েছে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালকের (গ্রেড ৫ম) ৬টি শূন্য পদে পদোন্নতি প্রদানের জন্য ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. এহছানে এলাহীর সভাপতিত্বে ৫ সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটি উপপরিচালক পদের অনুমোদিত জ্যেষ্ঠতা তালিকাভুক্ত ১৮ জন কর্মকর্তার মধ্য থেকে কাগজপত্র পরীক্ষা করে ৬ জন কর্মকর্তাকে পরিচালক পদে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করে। পদোন্নতির বিষয়টি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয় তদানীন্তন প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুূফিয়ানের কাছে। প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ডিপিসির সুপারিশ করা ৬ জনের তালিকা থেকে ২ জনের নাম বাদ দিয়ে এবং গ্রেডেশন তালিকার ১৬ নম্বরে থাকা মিজানুর রহমানের নাম যুক্ত করে মোট ৫ জনের পদোন্নতির অনুমোদন দেন। সে অনুযায়ী ৫ জনের পরিচালক পদে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

দুদক পরিচালকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উক্ত পদোন্নতির মাধ্যমে মন্নুজান সুূফিয়ান নিজে লাভবান হয়েছেন এবং পদোন্নতির সুবিধাভোগী মিজানুর রহমানকে লাভবান করেছেন।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, মিজানুর রহমান ২০০৬ সালে রাজশাহীর শিল্প সম্পর্ক মিলনায়তনে (আরআইআর) প্রভাষক পদে নিয়োগ পান। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (যা ওয়ান ইলেভেন সরকার হিসেবে পরিচিত) সময় তদবির চালিয়ে তিনি রাজশাহী থেকে খুলনায় বদলি হন এবং সহকারী পরিচালকের পদের কর্মকর্তা হয়েও উপপরিচালক প্রধান থাকেন এমন দুটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন। এরপর তিনি উপপরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর একসঙ্গে চারটি পদের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে খুলনা বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পরিচালক এবং উপপরিচালকের দুটি পদ, খুলনা শিল্প সম্পর্ক মিলনায়তনের (আরআইআর) উপপরিচালক এবং মংলার ড্রইং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার (ডিডিও)। তিনি একইসঙ্গে চারটি দপ্তরের সব সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করেন। এসব পদে থেকে তিনি বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, কর্তব্য ফাঁকি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়ে যান। তিনি একটি দপ্তরের গাড়ি নিজে ব্যবহার করতেন। আর অন্যান্য দপ্তরের গাড়ি তার স্ত্রী ও সন্তানরা ব্যবহার করতেন।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, মিজানুর রহমানের গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলায়। তার পিতা ঝালকাঠির একটি তহশিল অফিসের পিয়ন ছিলেন। অথচ মিজানুর রহমান ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কয়েক কোটি টাকার জমি কিনেছেন। রাজধানীর ধানম-িতে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোডে এবং উত্তরায় ৭ নম্বর সেক্টরে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ইস্কাটন এবং মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। যশোরে বোর্ড অফিসের পাশে জমি কিনে ছয়তলা বাড়ি করেছেন। খুলনার খালিশপুর জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের আবাসিক প্রকল্পের সি-ব্লকে একটি প্লট (প্লট নম্বর-৬৭) ৮৫ লাখ টাকায় কিনেছেন। যার রেজিস্ট্রেশনে মূল্য দেখানো হয় ৬৫ লাখ টাকা। প্লটটিতে তিনি ৯তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন।

মিজানুর রহমান ও তার স্ত্রী কী উপায়ে এসব সম্পদ অর্জন করলেন দুদক সে বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে।

দুদক আরও যেসব অভিযোগ তদন্ত করছে তার মধ্যে রয়েছে, মিজানুর রহমান শ্রম অধিদপ্তরের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুষের বিনিময়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি প্রভাবিত করতেন। এছাড়া, বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন ও শ্রমিক-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের নিবন্ধনসহ বিভিন্ন কাজে আর্থিক লেনদেন করে লাভবান হতেন। এসব বিভিন্ন উপায়ে অর্জিত টাকা তিনি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করতেন। প্রভাবশালী কর্মকর্তা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ ভয়ে মুখ খোলার সাহস পায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মিজানুর রহমানের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।