কিশোর গ্যাং, আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার, জেনেভা ক্যাম্পসহ নানা অপরাধে আলোচিত এলাকার নাম মোহাম্মদপুর। এই এলাকায় দিনে-রাতে রাস্তা বা বাসাবাড়ির সামনে রামদা, আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে সর্বস্ব লুট করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। দেশীয় অস্ত্রের মহড়া, গ্রুপ ভিত্তিক দ্বন্দ্বে সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও বোমার ঘটনাও ঘটে প্রায়ই। এই এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ১৫ থেকে ২০টি কিশোর গ্যাং রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে উঠে এসেছে।
তবে গত চার দিনে দুই কিশোর গ্যাং গ্রুপের দুই লিডারকে নৃশংসভাবে খুনের ঘটনায় এলাকার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। কিশোর গ্যাং লিডার এ্যালেক্স গ্রুপের এ্যালেক্স ইমন ও চার্লি গ্রুপের নেতা লম্বু আসাদুলকে খুনের পর এবার কে হবে নতুন টার্গেট?
স্থানীয়দের মতে, নতুন করে কিশোর গ্যাং গ্রুপের তৎপরতা বাড়ছে। এটা কিছুটা বাজারের দরদামের মতো ওঠানামা করে। কিছু সময় প্রশাসনের তৎপরতা বাড়লে গ্যাংকেন্দ্রিক অপরাধ কমে যায়, প্রশাসন কিছুটা ঢিলেঢালা হলেই এই গ্যাংকেন্দ্রিক অপরাধ বেড়ে যায়। যাতের ওপর হামলা চালাচ্ছে তারাও কিশোর গ্যাং লিডার। তারপরও এমন নৃশংস হত্যাকা- দেখতে যাচ্ছেন না কেউ। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে উল্লেখ করে ডিএমপি তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১২ এপ্রিল এ্যালেক্স ইমন নামে যাকে খুন করা হয়েছিল সেই ঘটনায় পুলিশ, ডিবি ও র্যাব সদস্যরা মিলে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) রাতে লম্বু আসাদুল নামে যাকে খুন করা হয়েছে, সেও কিশোর গ্যাং সদস্য ছিল বলে জানতে পেরেছি। এ ঘটনায়ও বেশ কয়েকজনের নাম তদন্তে এসেছে। তাদেরও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে যে কোনো অপরাধমূলক ঘটনা ঘটলে পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে। এখানে প্রশাসনের কোনো গাফিলতি নেই বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মোহাম্মদপুর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। ২০২৬ সালের নির্বাচন ঘিরে কিছু দিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও সম্প্রতি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এখানের অপরাধ চক্র। একের পর এক হত্যাকা- ও সন্ত্রাসী হামলায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। আহত ও নিহতদের তালিকায় রয়েছেন এলেক্স ইমন, লম্বু আসাদুল, রাকিব হোসেন বিশাল ও ছাত্র সমন্বয়ক ইব্রাহিম। এ ছাড়া ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন জুলাই যাদুঘরের ফটোগ্রাফার সাঈদ হাসান তানিম।
চার্লি গ্রুপের নেতা লম্বু আসাদুলকে খুন : মোহাম্মদপুরে দীর্ঘদিন ধরে কিশোর গ্যাং পরিচালনা, ছিনতাই, মাদক কারবার ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল আলোচিত চার্লি গ্রুপের নেতা আসাদুল হক (২৮) ওরফে ‘লম্বু আসাদুল’। একসময় অপরাধের রামরাজত্ব চালানো এই কিশোর গ্যাং লিডারকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকার সাদেক খানের ইটখোলা সংলগ্ন সড়কে এ হত্যাকা- ঘটে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে রেখে যায় প্রতিপক্ষ। পরে ভোরে রাস্তা থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। রায়েরবাজার এলাকায় কিশোর গ্যাং লিডার এ্যালেক্স ইমনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার মাত্র চার দিনের মাথায় একই এলাকায় আবারও ঘটে হত্যাকা- ।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত বুধবার দিবাগত রাত প্রায় ১টার দিকে একটি গলিতে আসাদুলের সঙ্গে এক যুবক কথা বলছিল। কিছুক্ষণ পর পাশ দিয়ে হেঁটে আসে আরেক যুবক। এরপর মোটরসাইকেলে এসে নামে আরও একজন। হঠাৎ করেই তারা ধারালো অস্ত্র নিয়ে আসাদুলের ওপর হামলা চালায়। এ সময় মোটরসাইকেলে আসা যুবককে স্থানীয়রা শহিদুল নামে শনাক্ত করেছেন বলে জানা গেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে নিহতের বাবা জলিল সর্দার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি চার মাস আগে ব্রেন স্ট্রোক করেছি। স্যানিটারি কাজ করি, ছেলেও আমার সঙ্গে কাজ করত। রাতে বাসার সামনে ছিল। এরপর কীভাবে কী হলো কিছুই বলতে পারছি না। তিনি বলেন, আসাদুল বিয়ে করেছিল। ৫ বছর বয়সী একটি ছেলে আছে। ছেলের বয়স যখন ৯ মাস তখন তার স্ত্রী অন্য একজনের সঙ্গে চলে যায়। এরপর নাতিকে আমরা লালনপালন করছি। ছেলের বিরুদ্ধে মামলা ছিল কি না জানতে চাইলে জলিল বলেন, মামলা আছে। খারাপ ছেলেদের সঙ্গে চলার কারণে অনেক শাসন করেছি। আমি নিজেও পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। এখন আমার সঙ্গে কাজ করত। ছেলেটা এখন এমন জায়গায় গেল, আর ফিরবে না।
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মাদকসংক্রান্ত পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকা- ঘটানো হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
পাঁচ দিন আগেই খুন হন এলেক্স ইমন : গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বেড়িবাঁধ এলাকায় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের সামনের এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এলেক্স ইমন নামে এক যুবককে। ওই ঘটনায় বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে মোহাম্মদপুর থানায়। ঘটনার পরপর র্যাব, পুলিশ, ডিবি মিলে সাতজনকে গ্রেপ্তার করে। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই লম্বু আসাদুল হত্যার ঘটনা ঘটে।
ছাত্র সমন্বয়ক ইব্রাহিমের ওপর হামলা : গত ২২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার ময়ূর ভিলাসংলগ্ন নূর মসজিদের পাশের চায়ের দোকানে বসে ছিলেন ইব্রাহিম। এ সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে কয়েকজন দুর্বৃত্ত এসে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে দ্রুত পালিয়ে যায়। স্থানীয়দের দাবি, ইব্রাহিম জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত ছাত্রহত্যা মামলার সাক্ষী ছিলেন। তবে ওই ঘটনায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
যুবদল নেতাকে কুপিয়ে জখম, পরে মৃত্যু : গত ২৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় জহুরী মহল্লার গাউছিয়া ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সামনে রাকিব হোসেন বিশাল নামে যুবদল নেতাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। পরে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
ছিনতাইয়ের শিকার জুলাই যাদুঘরের ফটোগ্রাফার : গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৪টায় মোহাম্মাদপুরের নূরজাহান রোডে অস্ত্রের মুখে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন জুলাই জাদুঘরের ফটোগ্রাফার সাঈদ হাসান তানিম। ভুক্তভোগী তানিম থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে জানান, মঙ্গলবার রাতে পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকায় জুলাই জাদুঘরের একটি ফটোশুটের কাজ শেষে মাইক্রোবাসে করে বাসার সামনে নামেন তিনি। বাসার গেট খোলার অপেক্ষায় থাকাকালে মোটরসাইকেলে আসা তিন দুর্বৃত্ত তার পথরোধ করে। তারা চাপাতি দেখিয়ে হত্যার হুমকি দেয় এবং চাপাতির উল্টো পাশ দিয়ে তার দুই হাত, মাথা ও শরীরে আঘাত করে ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। ব্যাগের ভেতরে ছিল ল্যাপটপ, ক্যামেরা ও লেন্স।
আতঙ্কে স্থানীয় বাসিন্দারা : মোহাম্মদপুরে একের পর এক প্রকাশ্যে খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত হচ্ছে দেশীয় অস্ত্র। এতে আতঙ্কে রয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। স্থানীয়দের ভাষ্য, হঠাৎ করেই মোহাম্মদপুর এলাকায় খুনখারাবি ও সন্ত্রাসী কর্মকা- বেড়ে গেছে। দ্রুত কঠোর অভিযান চালানো না হলে এলাকাটি আবারও সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে। তাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান টহল, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।