কলকাতায় ৭ বাংলাদেশির মৃত্যু

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৪ এএম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় নিউমার্কেটসংলগ্ন এলাকায় একটি আবাসিক হোটেলে গত মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে আগুন লাগে। তখন ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে ৯ ব্যক্তি মারা যান। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশের নাগরিক। অন্য দুই ব্যক্তি ভারতীয়। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে চারজন একই পরিবারের সদস্য। তারা হলেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৪০), তার স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৫), তাদের শিশুপুত্র স্বর্ণশীষ দত্ত (৩) ও আফসানার পিতা মো. আকরাম আলী (৬৪)। দেবাশীষ ঢাকা থেকে প্রকাশিত আজকের পত্রিকা ও চ্যানেল নাইনের জেলা প্রতিনিধি এবং স্থানীয় দৈনিক আজকের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।

নিহত অন্য তিন ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন ঢাকার আমিনবাজারের বেগুনবাড়ি এলাকার প্রসাধনসামগ্রী ব্যবসায়ী আহমেদ বাবু (৩৭) ও গাজীপুরের রেবতি সরকার। নিহত অন্য বাংলাদেশি পুরুষের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার মোহাম্মদ খালেদ দেশ রূপান্তরকে হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ মিশন জানায়, এ ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি ছিলেন। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মিশনের কর্মকর্তারা স্থানীয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।

কলকাতা নিউমার্কেটসংলগ্ন এলাকায় মির্জা গালিব স্ট্রিটে ‘শিখা ইন’ হোটেলে এ অগ্নিকা- ঘটে। পুরনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে, এমনটি মনে করছে ফায়ার সার্ভিস। একই ভবনে আরও কয়েকটি হোটেল রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জরাজীর্ণ পুরনো আবাসিক ভবনে হোটেলগুলো পরিচালিত হচ্ছিল। সেখানে আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না।

দেবাশীষ তার শিশুপুত্র ও শ্বশুরের চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট ভারতে যান। বেঙ্গালুরুর একটি হাসপাতালে চিকিৎসার পর গত মঙ্গলবার তারা কলকাতায় ফেরেন। কলকাতা থেকেই গতকালই তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল।

দেবাশীষের আত্মীয়, মালদহের বাসিন্দা কৃষ্ণ নন্দী ঘটনাচক্রে বুধবার ব্যবসার কাজে কলকাতায় ছিলেন। তিনি মর্গে গিয়ে দেবাশীষের দেহ শনাক্ত করেন। দেবাশীষের ছয় বছরের একটি মেয়ে ও মা-বাবা দেশে আছেন।

অগ্নিকা-ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা কলকাতায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন হোটেল থেকে বেঁচে ফেরা কয়েক বাংলাদেশি। ঢাকার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান পিতার চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন। আগুন লাগার সময় তারা শিখা ইন হোটেলেই ছিলেন। মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আগুন লাগার সময় তারা ঘুমিয়ে ছিলেন। রাত ৩টার দিকে তারা বুঝতে পারেন আগুন লেগেছে। গেট খুলে দেখেন চারদিকে অনেক ধোঁয়া। ধোঁয়ায় ঠিকমতো শ্বাস নিতে না পারায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে তাকে ও তার বাবাকে নিচে নামিয়ে আনে।

বাংলাদেশি দম্পতি রেজাউল ইসলাম ও সুমাইয়া আখতার হোটেল কক্ষে দরজার বাইরে আগুনের নমুনা দেখে জানালা দিয়ে বেরিয়ে কার্নিশে আশ্রয় নেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের নামিয়ে আনে।

ফাতেমা বেগম ছোট ছেলের চিকিৎসার জন্য ও ঘুরতে ঢাকা থেকে কলকাতায় গিয়েছিলেন। আগুন লাগার পর তারা টর্চ জে¦লে হোটেলের ছাদে যান। ছাদে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রায় ১৪ জন মানুষ ছিলেন। সবাই নিজেদের বাঁচানোর জন্য চিৎকার করছিলেন। ফায়ার সার্ভিস এসে তাদের নিচে নামায়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গতকাল ঢাকায় সাংবাদিকদের জানান, নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ শনাক্ত করা ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে যথাসম্ভব দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

মরদেহ পরিবহনের খরচ কে বহন করবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিহতরা বিদেশে থাকা শ্রমিক বা প্রবাসী কল্যাণের আওতাভুক্ত না হওয়ায় তাদের ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো ব্যবস্থা প্রযোজ্য নয়। তবে নিহতদের পরিবার যদি মরদেহ আনার খরচ বহন করতে না পারে, তখন সরকার বিষয়টি দেখবে।

কলকাতা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হোটেলটিতে আগুন নেভানোর জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। আগুনের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। ঘটনার পরপরই হোটেলের মালিক ও কর্মচারীরা পালিয়ে গেছে। পুলিশ তাদের খুঁজছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।

আজকের পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান পরিবারের সদস্যসহ দেবাশীষ দত্তের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

দেশ রূপান্তরের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, শহরের আড়–য়াপাড়ায় দেবাশীষ দত্তের বাড়িতে গতকাল ছিল শোকে ভারী হয়ে ওঠা পরিবেশ। তার পিতা দিলীপ দত্ত অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। কথা বলতে পারছিলেন না। দেবাশীষ-শারমীন দম্পতির একমাত্র শিশুকন্যা মহিমা (৬) শুধু এটুকুই বলতে পারল, ‘বাবা নেই’।

আর একমাত্র পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতিকে হারানোর শোকে দেবাশীষের শোকাতুর মা স্বপ্না দত্ত পাগলপ্রায়। বারবার বলছিলেন, ‘ও দেবা, দেবা, ওরা কি বলছে, আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না। তুই কখন আসবি?’

দেবাশীষ প্রেম করে মুসলিম নারী শারমীনকে বিয়ে করেন। দম্পতিটি এক কন্যা ও এক পুত্রের বাবা-মা ছিলেন। পরিবারের চারজনের মৃত্যুর খবর গতকাল সকালে এলে কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।

দেবাশীষের বন্ধু কুষ্টিয়ায় প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিনিধি তৌহিদ হাসান শিপলু জানান, একজন দায়িত্বশীল গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে তরুণ সাংবাদিকদের সমৃদ্ধ করে তুলতে দেবাশীষ সম্প্রতি ‘রাইজিং জার্নালিস্ট কমিউনিটি’ নামে একটি গ্রুপ খুলেছিলেন। তিনি হারিয়ে যাওয়ায় যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা আর পূরণ হওয়া সম্ভব নয়।

দেশ রূপান্তরের সাভার প্রতিনিধি জানান, কলকাতার অগ্নিকা-ে নিহত আহমেদ বাবু আমিনবাজারের বেগুনবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তার স্ত্রী, আট বছরের একটি মেয়ে, পাঁচ বছরের একটি ছেলে এবং চার ভাই রয়েছে। তার মেয়ে এলিনা হাসান রোজা পিতার মৃত্যুর কথা জেনে বারবার ডাকছিল, ‘বাবা, বাবা।’

প্রসাধনসামগ্রীর ব্যবসায়ী বাবু পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাকে হারিয়ে স্বজনরা দিশাহারা হয়ে পড়েন। বিশেষ করে ছোট দুই সন্তানকে রেখে তার অকাল চলে যাওয়া সবাইকে নাড়া দিয়েছে।

বাবুর স্বজনরা কলকাতার আগুনে নিহতদের দেহ দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত