ছোট মশার বড় দাপট

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৫ এএম

একসময় কিউলিক্স মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যেত। এই রোগ নিয়ন্ত্রণের পর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। হাজার কোটি টাকা খরচ করেও ডেঙ্গুর বাহক মশার কামড় থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারছে না সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এডিস মশা বংশ বিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে। একসময় বর্ষাকালীন রোগ থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সারা বছরই ভোগাচ্ছে ডেঙ্গু।

২৬ বছর ধরে এডিস মশার কামড় যেমন নাগরিকদের নাস্তানাবুদ করছে, তেমনিভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদেরও। শুধু মশক নিধনে ব্যর্থতার কারণে অনেক জনপ্রিয় মেয়রও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। এমন বাস্তবতায় আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মশা দিবস’। ১৯৩০ সাল থেকে ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। মশক নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোটি টাকার কর্মযজ্ঞ এবং জনসচেতনা কর্মসূচি থাকলেও এ দিবস নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (রাত ৯টা) ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের দিবসটি নিয়ে কোনো কর্মসূচির কথা জানা যায়নি।

উষ্ণ-আদ্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু মশা প্রজননের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। মশার ঘনত্ব ও প্রজাতির বৈচিত্র্য বেশি থাকায় মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২৬ প্রজাতির মশা শনাক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে বর্তমানে ঢাকায় ১৪ থেকে ১৬ প্রজাতির মশা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া ও জাপানিজ এনকেফালাইটিস অন্যতম।

ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গু দেখা দেয় ১৯৬৩ সালে। তখন এটিকে ঢাকা ফিভার হিসেবে নাম দেওয়া হয়েছিল। ডেঙ্গুর প্রথম বড় আউটব্রেক হয় ২০০০ সালে আর তখন বিজ্ঞানীরা একে ডেঙ্গু হিসেবে চিহ্নিত করেন। ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং ৯৩ জন মারা যায়। এরপর প্রায় প্রতি বছরই কমবেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, তবে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সরকারি হিসাবে ওই বছর ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং ১৭৯ জন মারা যায়।

করোনাকালীন কয়েক বছর ডেঙ্গু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৩ সালে দেশের সব ইতিহাস ভেঙে ডেঙ্গুর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৫৭৫ জন মারা যান। ২০২৫ সালে মারা যান ৪১৩ জন, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যমতে, ২০২২ সালের আগে ডেঙ্গু সংক্রমণের মৌসুম ছিল জুলাই-আগস্ট মাসে। কিন্তু ওই বছর থেকে সংক্রমণ পরিবর্তিত হয়ে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নভেম্বর-ডিসেম্বরের সংক্রমণ। বেশ কয়েক বছর ধরে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর অর্থাৎ সারা বছরই ডেঙ্গু থাকছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রতি মাসেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে ৬ হাজার ১০৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১ ও সর্বশেষ জুলাই মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ২০৬ জন। আর চলতি মাসের ১৯ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ১০ হাজার ৯৬২ জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৭৬ জন, যার মধ্যে গতকাল বুধবার দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

জলবায়ুর পরিবর্তন, বৃষ্টির আধিক্য, অপেক্ষাকৃত উষ্ণ তাপমাত্রা, শীতকাল কমে যাওয়ার কারণে মশার বংশ বিস্তার এবং মশাবাহিত রোগ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির সাবেক সভাপতি কীটতত্ত্ববিদ ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু ভয়াবহ আকারে ছড়ানোর একমাত্র কারণ হলো এডিস মশা বংশ বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হঠাৎ করে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে এবং দীর্ঘক্ষণ পানি জমে থাকছে। আবার তাপমাত্রা বাড়ছে। শীত কমে এলে মশা বাড়ে। এর সঙ্গে মানুষের জীবন আচরণের পরিবর্তন ঘটল। এখন প্রচুর প্লাস্টিকের কৌটা, ড্রাম, কনটেইনার ব্যবহার হচ্ছে। এগুলো মশার বংশ বিস্তারের উপাদান হিসেবে কাজ করে। তিনি বলেন, একসময় শাঁখারী বাজার, এলিফ্যান্ট রোড ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে এডিস মশার অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু এখন ঢাকা ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৫ বছরে এডিস মশার প্রজননস্থল বেড়েছে এবং বংশ বিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

এই গবেষক আরও বলেন, মশার কামড়ে দেশের অনেক মানুষ মারা গেছে। এখন ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াতে মারা যায়। ১৯৭০ সালের দিকে ছিল ম্যালেরিয়া। এ রোগে অনেক মানুষ মারা গেছে। এটা কিছুটা নিয়ন্ত্রণের পর কিউলিক্স মশার কামড়ে গোদ রোগ হতো। ১৯৯০ সালের আগে এডিস মশা ছিল, কিন্তু বংশ বিস্তার করতে পারেনি। ১৯৯৯ সালের পর শুরু হলো ডেঙ্গু। ওই বছর এলিফ্যান্ট রোড়ে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গিয়েছিল। পরের বছরই অর্থাৎ ২০০০ সালে ডেঙ্গুতে শতাধিক মানুষ মারা গিয়েছিল। তার পরের বছরগুলোর খবর তো সবারই জানা।

বায়ুম-লীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ডেঙ্গু একটি নির্দিষ্ট মৌসুমি সমস্যা ছিল। কিন্তু এখন শীতের তীব্রতা হ্রাস এবং অকাল ও দীর্ঘায়িত বৃষ্টির কারণে বছরের প্রায় ৮-৯ মাসব্যাপী একটি স্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে। বিগত ১০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঢাকার গড় তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতা বৃদ্ধি মশার প্রজনন চক্রে রূপান্তর ঘটেছে। আবহাওয়ার এই উষ্ণায়ন এডিস মশার ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশায় রূপান্তরের সময়কালকে প্রায় অর্ধেক (১৪ দিন থেকে মাত্র ৭-৯ দিন) করে দিয়েছে। ফলে তাদের বংশবৃদ্ধি দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে বাতাসে দীর্ঘ সময় ধরে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতা বজায় থাকায় মশার গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে।

মশা নিধনের উপায় নিয়ে ড. কামরুজ্জামান আরও বলেন, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘায়িত মশার প্রজনন মৌসুম মোকাবিলায় ঢাকাকে প্রচলিত মশক নিধন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি বছরব্যাপী বৈজ্ঞানিক ও টেকসই কৌশল নিতে হবে। এজন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ডেটা বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় লার্ভার প্রকোপ বাড়তে পারে তা আগে থেকেই চিহ্নিত করা এবং জলজ মশার লার্ভা দমনে বিটিআইয়ের মতো পরিবেশবান্ধব জৈব কীটনাশক ও ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াযুক্ত বন্ধ্যা মশা অবমুক্ত করার মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ড্রোনের মাধ্যমে বহুতল ভবনের ছাদবাগান নজরদারি এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে কীটতত্ত্ববিদদের নেতৃত্বে স্থায়ী তদারকি টিম গঠন করে মশা জন্মানোর উৎসগুলো শুরুতেই ধ্বংস করতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে শুধু মৌসুমি ফগিং বা ধোঁয়া দিয়ে মশার এই দীর্ঘায়িত জীবনচক্র নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।

চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়া : ২০০৮ সালে দেশে প্রথম চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ে, যেটি ডেঙ্গুর মতো একটি রোগ। এই রোগটি চিকুনগুনিয়া ভাইরাস বহনকারী এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছর বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়া রোগ শনাক্ত হয়। ডেঙ্গুর চাপে এখন এই রোগটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা খুব বেশি করা হচ্ছে না। বেশির ভাগ হাসপাতালে চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা করার মতো কিট নেই। ডেঙ্গুর পাশাপাশি এই রোগটি চিহ্নিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশসহ পৃথিবীব্যাপী মশাবাহিত রোগের মধ্যে অন্যতম হলো ম্যালেরিয়া। অ্যানোফিলিস মশার সাতটি প্রজাতি বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়। এর মধ্যে চারটি প্রজাতিকে প্রধান বাহক বলা হয়। দেশের পার্বত্য জেলা ও সীমান্ত এলাকায় মোট ১৩ জেলার ৭২টি উপজেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

মশক নিধনে ঢাকায় যত উদ্যোগ : মশা নির্মূলে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ড্রেন-নর্দমায় গাপ্পি মাছ, ব্যাঙ, ফিঙে পাখি ছাড়া থেকে শুরু করে ড্রোন উড়িয়ে মশার প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, কদমগাছ রোপণের মতো বিতর্কিত উদ্যোগগুলো শেষ পর্যন্ত মশার উপদ্রব কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। মাছ-হাঁস-ব্যাঙ চাষ কিংবা কদমগাছে ফিঙে পাখি বসানোর মতো উদ্যোগ বিশ্বের কোথাও বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি বলে কীটতত্ত্ববিদেরা সতর্ক করলেও এসব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গেছে সিটি করপোরেশন।

চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মশা নির্মূলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) বরাদ্দ রেখেছে ১৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে মশার ওষুধ কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ কোটি টাকা। যন্ত্রপাতি, ফগার, হুইল স্প্রে মেশিন, পরিবহন খাতে এই ব্যয় ধরা হয়েছে। আগের অর্থবছরে মশক নির্মূলে ডিএনসিসির ব্যয় করেছে ১৩১ কোটি টাকা। অন্যদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মশা মারতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বরাদ্দ রেখেছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যয় করেছে ৩৩ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসি প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জে. ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, শহরের পরিচ্ছন্নতা ও আবহাওয়া মশা বৃদ্ধির বড় কারণ। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নির্মূল করা যাবে না। নতুন করে ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীর ঠিকানা সংগ্রহ করে সন্ধ্যার আগে রোগীর ঠিকানায় কুইক রেসপন্স টিম গিয়ে মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ডিএসসিসি প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, নিয়মিত পদক্ষেপগুলোর পাশাপাশি কোথাও মশা থাকার অভিযোগ পেলে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে পুরো ওয়ার্ডে অভিযান চালানো হয়। সকালে লার্ভিসাইডিং (মশার লার্ভা নিধন) এবং বিকেলে এডাল্টিসাইডিং (উড়ন্ত মশা) করা হয় এক সপ্তাহ ধরে। বর্তমানে এই কার্যক্রমে জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত