২০০ কিশোর গ্যাংয়ের দেড় হাজার সদস্যের কাছে জিম্মি চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৬টি থানার অধিবাসী। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা শহরে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখলসহ নানা অপরাধে জড়িত। তারা প্রায় প্রতিটি এলাকায় লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দেয়, আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়ায়। এদের নেতৃত্বে রয়েছে ৬৪ জন বদ্দা অর্থাৎ ‘বড় ভাই’। পুলিশ জানিয়েছে, গত ছয় বছরে ৫৫৮টি অপরাধ করেছে এই কিশোররা। এদের কারণে চট্টগ্রাম মহানগর অস্থির-অশান্ত।
অপরাধে জড়িত এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেপ্তারও করছে পুলিশ। গত ২ মার্চ শুরু হওয়া নগর পুলিশের ‘এস ড্রাইভ’ অভিযানে ১৬ মার্চ পর্যন্ত ১৪৮ জন কিশোর গ্রেপ্তার হয়েছে; তারপরও অপরাধ কমছে না। প্রায়ই খুনের ঘটনা ঘটে এই কিশোরদের হাতে। তাদের একেকটি দলে রয়েছে ১০ থেকে ১৫ জন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বা প্রশ্রয়দানে আছে ৬৪ জন বড় ভাই (চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় বড় ভাইকে ‘বদ্দা’ বলা হয়)।
নগর পুলিশের সাম্প্রতিক এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের স্কুলগুলোতে অনুপস্থিত থাকা ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর বেশিরভাগই জড়িয়ে পড়েছে অপরাধে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সামাজিক অস্থিরতা ও কিশোর গ্যাংয়ের উত্থানের কারণ খুঁজতে গিয়ে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্য পায় পুলিশ। এসব ছাত্র পর্নোগ্রাফি, সাইবার অপরাধ, ছিনতাই, চুরি, মাদক নেওয়া ও কেনাবেচা এবং অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। সাধারণত স্কুল টাইমেই তারা অপরাধ সংঘটিত করে থাকে। কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতার বিষয়ে র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের ওপর আমাদের নজরদারি আছে। আমরা কাজ করছি। চাঞ্চল্যকর ঘটনায় বেশি নজর দিচ্ছি। যেসব কিশোর গ্যাং-সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা আছে, ওয়ারেন্ট আছে আমরা তাদের ধরছি। অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও র্যাবকে কাজ করতে হচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধে আমরা তৎপর আছি।’
চট্টগ্রাম নগরে সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, মারামারি, গোলাগুলির ঘটনার বিষয়ে নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বৃহস্পতিবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতের বিষয়ে সজাগ আছি। প্রতিদিন কিশোর গ্যাংয়ের কোনো না কোনো সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত হচ্ছে।’
সর্বশেষ গত ১৩ এপ্রিল বিকেলে নগরের চকবাজার ডিসি রোডের মৌসুমি আবাসিক এলাকায় নির্মাণাধীন ৮ তলা ভবনের লিফটের গর্তে ফেলে দিয়ে আশফাক কবীর সাজিদ (১৭) নামের বিএএফ শাহীন কলেজের এক ছাত্রকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার চকবাজার থানায় সাত কিশোর গ্যাং-সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন নিহত ছাত্রের বাবা আবুল হাশেম সিকদার। পুলিশ ওই ভবনের নিরাপত্তাকর্মী এনামুল হককে গ্রেপ্তার করেছে। এর আগে ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে নগরের বাকলিয়া থানার বলুয়ার দিঘিরপাড় এলাকায় আদালতে মামলার হাজিরা দিতে যাওয়ার পথে মিনহাজ উদ্দিন নামে এক যুবদল কর্মীর হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন করে দেয় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, যুবদলকর্মীর হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন করার ঘটনার নেতৃত্ব দেন কিশোর গ্যাং লিডার মো. সবুজ। গত ১০ এপ্রিল রাত সোয়া ১০টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থানার ইমামপাড়া থেকে সবুজকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৭। গত ৪ এপ্রিল বাকলিয়ার মিয়াখান নগরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে মারামারি ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় দুই কিশোর গ্যাং গ্রুপের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে মারামারি, হামলা-পাল্টাহামলা চলে আসছে। এসব ঘটনার নেপথ্যে আছে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোরশেদ খান ও আবদুস সোবহান। দুজনেরই আছে ১৮ থেকে ২০ সদস্যের দুটি কিশোর গ্যাং।
জানা গেছে, ৪ এপ্রিল রাত ৯টার দিকে বাকলিয়ার ময়দার মিল এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ, মারামারি ও গোলাগুলির ঘটনায় এক কিশোরসহ চার জন গুলিবিদ্ধ হয়। তারা হলেন মাদ্রাসাছাত্র মো. ফাহিম (১৩), মো. জসিম (২৪), মো. হাসান (২৬) ও মো. ইছমাইল (৫০)। ঘটনার রাতেই আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গুলিবিদ্ধ মাদ্রাসাছাত্র মো. ফাহিমের বাবা সোলাইমান বাদশাসহ আরও দুই ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কিশোর গ্যাংয়ের ১৪ সদস্যের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১২-১২ জনের বিরুদ্ধে বাকলিয়া থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত বছরের ১৬ মে নগরের হালিশহরে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের রেষারেষিতে খুন হন কলেজছাত্র ওয়াহিদুল হক ওরফে সাব্বির (১৮)। বাসা থেকে ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাত করা হয় তাকে। ক্ষতস্থান দিয়ে বেরিয়ে পড়া নাড়িভুঁড়ি হাতে চেপে দৌড়েও বাঁচতে পারেননি তিনি। ছয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
ওয়াহিদুলের বাবা মোহাম্মদ এসহাক বাদী হয়ে হালিশহর থানায় মামলা করেন। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মিনহাজুল ইসলাম নামের এক কলেজছাত্রকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর মিনহাজুল আদালতে জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে সে বলে, ‘১০-১২ দিন আগে এলাকার এক কিশোরকে মারধরের প্রতিশোধ নিতে ওয়াহিদুলকে ছুরিকাঘাত করে তারা।’
পুলিশ বলছে, হালিশহর এলাকায় দুটি কিশোর গ্যাং ‘বিংগু’ ও ‘পাইথন’-এর মধ্যকার দ্বন্দ্বের জেরে ওয়াহিদুল খুন হয়েছিল। ওয়াহিদুল বিংগু গ্রুপের সদস্য ছিল এবং তাকে মারধর করা গ্রুপটি পাইথন নামে পরিচিত।
স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, যুবদল নেতার পরিচয় দেওয়া মো. আসলাম কিশোর গ্যাংয়ের দুটি গ্রুপকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। দুটি গ্রুপে ৩৫ থেকে ৪০ জন করে সদস্য রয়েছে। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীর পাশাপাশি বিভিন্ন দোকান ও কারখানায় কাজ করা ১৬ বছরের কিশোর থেকে ২৩ বছরের তরুণও রয়েছে ওই সব গ্রুপে।
কিশোরদের অপরাধের বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সাধারণত ব্রোকেন পরিবার (বাবা-মায়ের আলাদা হয়ে যাওয়া) কিংবা বাবা-মা মারা যাওয়া সন্তানরা কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এসব ছেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও বিচ্ছিন্ন অর্থাৎ তারা ক্লাসে অনুপস্থিত থেকে অপরাধমূলক কাজগুলো করছে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, নগরের স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, গণি বেকারি, চট্টগ্রাম কলেজ এলাকা, চমেক হোস্টেল এলাকা, ওআর নিজাম রোড আবাসিক এলাকা, সিআরবি, খুলশি, ফয়’স লেক, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ, হালিশহর, বন্দর ও পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ে। তারা মোটরসাইকেল ও সাইকেলসহ পথচারীদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়া, মাদক বিক্রির মতো সমাজবিরোধী কর্মকা- চালাচ্ছে।