চট্টগ্রামে ‘ভুয়া ওয়ারিশ’ সনদ দিয়ে দেলোয়ার হোসেনের পৈতৃক সম্পত্তির ক্ষতিপুরণের ২ কোটি ১১ লাখ টাকা আত্মসাৎচেষ্টা চালায় একটি জালিয়াত চক্র। ওই চক্রের সঙ্গে আইনি লড়াই করতে করতে ছয়মাস আগে মামলার বাদী দেলোয়ার হোসেন পরপারে চলে গেছেন।
এদিকে, তদন্তে ওয়ারিশ সনদ জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের তদন্ত সংস্থা সিআইডি ও পিবিআই। জালিয়াত চক্রের মূলহোতা নগরের ২নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. সাহেদ ইকবাল বাবুসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির অপরাধ সংঘঠনের অভিযোগ আনা হয় গত ২ এপ্রিল আত্মসমর্পণ করলে আটজন আসামির জামিন মঞ্জুর করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তৃতীয় আদালত। এর আগে একই মামলার দুজন আসামি আদালত থেকে জামিন পান।
মামলার প্রধান আসামি সাবেক কাউন্সিলর মো. সাহেদ ইকবাল বাবু পলাতক আছেন।
জামিনপ্রাপ্ত ৮ আসামি হলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. সাহেদ ইকবাল বাবু (৪৫), মোহাম্মদ জানে আলম (৫৬), মো. নুরুল ইসলাম (৫৩), মো. নুরুল আমিন (৪৬), নুর নাহার বেগম (৫৮), মিনা বেগম (৪৮), শাহনাজ বেগম (৪০), বখতেয়ার মিয়া (৫০)। এর আগে মো. নাজিম উদ্দিন(৪৭) ও মো. সরওয়ার উদ্দিন(৪৩) আদালত থেকে জামিন পান।
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী সৌরভ চৌধুরী বলেন, এটা ওয়ারিশ সনদ জাল-জালিয়াতির মামলা। পুলিশের তদন্ত সংস্থা আসামিদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারার অপরাধ সংঘঠনের প্রমাণ পেয়ে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে। জামিন শুনানির সময় জালিয়াতির বিষয়টি আদালত স্বীকারও করেছেন। এক মাসের মধ্যে আপোসের শর্তে আসামিদের জামিন দিয়েছেন বিজ্ঞ আদালত।’
এই আইনজীবীর প্রশ্ন, ওয়ারিশ সনদ জালিয়াতি করে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে জমি বিক্রিও করে ফেলেছেন। যেহেতু সাবজেক্ট মেটার বিলুপ্ত হয়ে গেছে সেখানে বাদীর সঙ্গে বিবাদীর আপোস কীভাবে হয়। ‘আমরা তো অপরাধের বিচার চেয়েছি’ বলেন আইনজীবী সৌরভ চৌধুরী।
আসামিদের জামিন হওয়ায় প্রশ্ন রেখে মো. ইছহাক বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশের দুটি তদন্ত সংস্থা জামিন অযোগ্য ধারার অপরাধ সংঘঠনের প্রমাণ পেল। অথচ আদালতে সবাই জামিন পেয়ে গেল। কার কাছে বিচার চাইব। আমরা ক্ষুব্ধ, আমরা হতাশ।’
জানা গেছে, মামলার বর্তমান বাদী মৃত দেলোয়ার হোসেনের ছেলে মো. ইছহাক। গত বছরের ২৬ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (তৃতীয়) তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিদর্শক দিবাকর রায়। এর আগে আদালতে পিবিআইর উপপরিদর্শক হুমায়ন কবীরের দেওয়া অনুসন্ধান প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে মামলার বাদী দেলোয়ার হোসেন নারাজি দাখিল করলে ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর অধিকতর অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। সিআইডির চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিদর্শক দিবাকর রায় তদন্ত শুরু করেন ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা ২৭/২০২০-২০২১ এলএ কেইস মূলে নগরের কুলগাঁও মৌজার বিএস ১৩৯৪ নম্বর খতিয়ানের বিএস ১১৯৮ নম্বর দাগের ০০.৭০০ শতাংশ নাল জমি নগরের বালুচড়ায় ‘ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। তার প্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ১৭ অক্টোবর নোটিশ পেয়ে বাদী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন ২০২৩ সালের ২০ মার্চ সম্পত্তির ক্ষতিপূরণের টাকা নেওয়ার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় আবেদন করেন।
এদিকে, মোহাম্মদ হানিফ নামে ব্যক্তিও একই বিএস দাগের ০.০৭০০ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণের জন্য এলএ শাখায় আবেদন করেন। হানিফের দাখিলকৃত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে বাদী জানতে পারেন, বিএস ১১৯৮ দাগের ০০.৭০০ শতাংশ সম্পত্তি মোহাম্মদ হানিফের নামে নামজারি খতিয়ান (৫৯৫১ ও ৬৭০১) সৃজিত হয়েছে।
সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা সাহেদ ইকবাল বাবু ভুয়া ওয়ারিশ সনদ সরবরাহ করেন। জালিয়াত চক্রের সদস্যের মধ্যে ওই জমির বেচাকেনাও করে ফেলেন। ভুয়া ওয়ারিশ সনদকে পুঁজি করে নামজারির খতিয়ান তৈরি করা হয়। এরপর চক্রটি ক্ষতিপূরণের ২ কোটি ১১ লাখ টাকা দাবি করে।
অপরদিকে তিন বছর ধরে জালিয়াত চক্রের সঙ্গে আইনি লড়াই করেন মো. দেলোয়ার হোসেন। কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি। দেলোয়ার হোসেন ছিলেন ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের মৃত মো. হোসেনের একমাত্র ছেলে।
সূত্র জানায়, বাস-ট্রাক টার্মিনাল প্রকল্পের জন্য কুলগাঁও মৌজায় বিএস রেকর্ডীয় মালিক মোহাম্মদ হোসেনের ৭ শতক জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। ক্ষতিপূরণের টাকা হাতিয়ে নিতে সাবেক কাউন্সিলর সাহেদ ইকবাল বাবু জমির প্রকৃত মালিক মৃত মো. হোসেনের কথিত আটজন ওয়ারিশের নামে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ ইস্যু করেন। ওই সনদ ব্যবহার করে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দপ্তর থেকে ভুয়া ওয়ারিশদের নামে নামজারির খতিয়ান তৈরি করেন। সৃজিত খতিয়ানকে পুঁজি করে সাহেদ ইকবাল বাবুর এক সহযোগী মো. হানিফ নামের একজনের কাছে ওই জমির বিক্রয়ের দলিল তৈরি করেন।
এর আগে ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সাবেক কাউন্সিলর মো. সাহেদ ইকবাল বাবুসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে সিআর মামলা (৬৮৬/২০২৩-বায়েজিদ থানা) দায়ের করেন মো. দেলোয়ার হোসেন। তদন্তেও জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ তৈরি করে জমির ক্ষতিপূরণের ২ কোটি ১১ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পান তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই মেট্রো ইউনিটের উপপরিদর্শক হুমায়ুন কবীর। তার তদন্ত প্রতিবেদনে কাউন্সিলর মো. সাহেদ ইকবাল বাবুসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
বাদী মো. ইছহাকের অভিযোগ, মামলার ১ নম্বর আসামি সাবেক কাউন্সিলর মো. সাহেদ ইকবাল বাবু জেনে বুঝেই ভুয়া ওয়ালিশ সনদ ইস্যু করেন। তিনি একজন ভূমি দস্যূ এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে। ওয়ারিশ সনদ জালিয়াত চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ, করে আমাদের জমির ক্ষতিপূরণের ২ কোটি ১১ লাখ টাকা আত্মসাৎ করতে চেয়েছিল তারা।