রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে গত ২৫ মার্চ বিকালে পন্টুন থেকে ফেরিতে ওঠার সময় কমপক্ষে ৪০ যাত্রী নিয়ে নদীতে পড়ে ডুবে যায় সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস। এ ঘটনায় ফেরি পরিচালনা কর্তৃপক্ষের নানা ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র আবারও সামনে আসে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব ক্রটি সংস্কার ও মেরামতে নতুন করে কার্যক্রম শুরু করেছে। কিন্তু পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভোগান্তি কমে না, আগের মতোই রয়ে যায়।
ডুবে যাওয়া ওই বাসের ৪০ যাত্রীর মধ্যে নারী- শিশুসহ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাঁতরে উদ্ধার হওয়া ১১ যাত্রী বাদে অন্যদের খোঁজ এখনো মেলেনি।
বাংলাদেশে ফেরি পরিষেবার মূল দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডাব্লিউটিসি)। ঘাট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অপর সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ)। বিআইডাব্লিউটিসির এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে বিশেষ করে আরিচা-কাজীরহাট ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে প্রায়শই ছোট-বড় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের গাফিলতিতে ঘাটে ফেরিতে লোড-আনলোড ও চলন্ত অবস্থায় অনেক দুর্ঘটনার তথ্য রয়েছে।
জানা গেছে, দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আরিচা, পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাট অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। পাটুরিয়ায় চারটি ও আরিচায় দুটি ঘাটে যানবাহন ও যাত্রী ওঠানামা করে আসছে। পদ্মা ও যমুনা সেতু চালুর পর এ দুটি ঘাটে চাপ কিছু কমলেও ফেরি সার্ভিসের দাবি উপেক্ষা করা যায় না। এ কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে ছোট-বড় ১৫টি ফেরি চলছে। আরিচা-কাজিরহাট রুটে পাঁচটি রো রো ফেরি রয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশপথ দৌলতদিয়া প্রান্তে মোট ৭টি ফেরিঘাট থাকলেও সচল মাত্র ২/৩টি। বাকি ঘাটগুলো সংস্কারের অভাবে পরিণত হয়েছে জঞ্জালে।
ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিআইডাব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ সোচ্চার থাকলেও ঘাটে এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়। ঘাটে গাড়ির চাপ বাড়লে এক শ্রেণির কর্মচারী নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে থাকেন। এর মধ্যে বাস-ট্রাকের বুকিং টিকিট যাচাই করার সময় কর্মচারীরা গাড়িপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা হারে নিয়ে থাকেন। ফেরিতে সারিবদ্ধভাবে যানবাহন রাখার দায়িত্বপ্রাপ্তরা চালকদের কাছ থেকে ২০ থেকে ৩০ টাকা হারে আদায় করে। এ নিয়ে ওজর-আপত্তি হলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই।
এদিকে, দিনের তুলনায় রাতে গাড়ি বুকিং কাউন্টারের সামনে এক শ্রেণির দালাল সিরিয়াল অমান্য করে টিকিট সংগ্রহের অপচেষ্টা চালায়। এ ক্ষেত্রে পেছনের গাড়ি সামনে নেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ট্রাফিক পুলিশদের অদৃশ্য কারসাজি রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
পাটুরিয়া থেকে ফেরিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৭ হাজার ২০১টি বাস, ১৩ হাজার ৯৭৯টি ট্রাক, ছোট গাড়ি ১৭ হাজার ২৫১ ও ৮ হাজার ১৫০টি মোটরসাইকেল পার হয়েছে। আরিচা দিয়ে একই মাসে ১৮টি বাস, ১৬০০ ট্রাক ও ৫৮৫টি ছোট গাড়ি পাড় হয়। ঈদ, পূজা, জাতীয় দিবস, নববর্ষসহ বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে যাত্রী ও যানবাহন চাপ বৃদ্ধি পেলে ঘাটে এক শ্রেণির দালাল ও সংস্থার কর্মচারীদের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া, প্রতিটি ফেরিতে সংস্থার ইজারা দেওয়া ক্যান্টিন রয়েছে। এসব ক্যান্টিনে যাত্রী ও যানবাহন মালিক-চালকদের সুবিধার্থে নির্ধারিত মূল্যে খাবার বিক্রির নিয়ম রয়েছে। কিন্তু যাত্রীর চাপ বৃদ্ধি পেলে ক্যান্টিনে থাকা বিভিন্ন বস্তু অধিক মূল্যে ও বাসি-পচা খাবার বিক্রির অভিযোগ আছে। বিভিন্ন প্রলোভনে জুয়ারি চক্র নিরীহ যাত্রী সাধারণ ও চালক-হেলপারদের কাছ থেকে সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়।
যাত্রীদের অভিযোগ, রাতে চলন্ত ফেরিতেই বসে জুয়ার আসর। প্রশাসন অভিযান চালিয়ে এ চক্রের কয়েকজনকে আটক করে জেল-জরিমানা করলেও এরা থেমে নেই।
ফেরিতে জুয়া ও ছিনতাই সাধারণ যাত্রীদের জন্য ঘাটের পরিবেশ বিষিয়ে তুলেছে। এদিকে, ছোটখাটো সংস্কার বা ফেরি মেরামতের জন্য পাটুরিয়া ঘাটে ‘মধুমতি’ নামে সংস্থার নিজস্ব ভাসমান কারখানা রয়েছে। কারণে-অকারণে এ কারখানায় মেরামতের নামে ফেরি ভিড়িয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়। ঘাটে পারাপারের অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে টিকিট বুকিংয়ের সময় ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
পাটুরিয়া ঘাটে ট্রাকচালক মিজান দেশ রূপান্তরকে জানান, ফেরিতে ওঠানামার জন্য বেশি ঢালু রাস্তার কারণে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। টিকিট বুকিংয়ের সময় অতিরিক্ত ৫০ ও পন্টুনে চেকিংয়ের সময় ১০ টাকা দিতে হয়। আরেক চালক আমিরুল জানান, ফেরিঘাটের রাস্তা অধিক ঢালু হওয়ায় দুর্ঘটনায় পড়তে হয়। সামান্য বৃষ্টিতে ঘাট পিচ্ছিল হলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেশি। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি টেনে তুলতে সরকারি রেকার ব্যবহার করলেও যানবাহন মালিকদের ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়।
অভিযোগের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির আরিচা সেক্টরের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো. আবু আব্দুল্লাহ জানান, বুকিং কাউন্টারে নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। ট্রাকে নির্ধারিত ওজনের চেয়ে বেশি মাল বহনের ক্ষেত্রে টনপ্রতি ১৬০ টাকা আদায়ের নিয়ম রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসির আরিচা সেক্টর উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মোহাম্মদ ছালাম হোসেন জানান, ২০২১-২২ সালে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে গাড়ির চাপ অনুযায়ী ২০ থেকে ২২টি ফেরি ছিল। পদ্মা সেতু চালুর পর ১৪ থেকে ১৫টি ফেরি চলাচল করছে। এখন এর চাহিদা বর্তমানে নেমে আসায় রাজস্ব আয় প্রায় অর্ধেকে পৌঁছেছে। বর্তমানে ঘাটের যানবাহন চাপ অনুযায়ী ৯ থেকে ১০টি ফেরি প্রয়োজন। ফেরিতে ছোটখাটো ক্রটি, মেরামত ও সংস্কারের প্রয়োজন হলে ভাসমান কারখানা মধুমতিতে দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত রাখা হয়।
এদিকে এক তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যথাসময়ে ফেরি সংস্কার বা ক্রটি মেরামত না করার কারণে দৌলতদিয়া থেকে পাটুরিয়া ঘাটে যাওয়ার সময় ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি সকালে রজনীগন্ধা নামের যানবোঝাই ফেরি ডুবে যায়। এ ছাড়া, ১১ তারিখে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটে শাহ মখদুম ফেরি থেকে খাড়া ঢালুতে উঠতে গিয়ে তেলবাহী ট্রাক ব্রেক ফেল করে নদীতে পড়ে তলিয়ে যায়। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান চালক ও হেলপার।
এসব দুর্ঘটনার অধিকাংশের স্থল হচ্ছে ফেরিতে ওঠানামার জন্য নির্মিত এপ্রোচ রাস্তা। ঘাট নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা হচ্ছে বিআইডব্লিউটিএ। নদীতে পানি কম-বেশি হওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘাট ওঠানো-নামানোর প্রয়োজন হয়। সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে তড়িঘড়ি ও যেনতেনভাবে ঘাট নির্মাণ করায় ফেরিতে যানবাহন ওঠানামা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এতে প্রায়শই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। পন্টুনে ফেরি বাঁধা ও ছেড়ে দেওয়ার জন্য নিয়োজিত কর্মচারীর অনুপস্থিতি এমন দুর্ঘটনার কারণ বলে সচেতন মহল মনে করে।
বিআইডব্লিউটিএর আরিচা নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল আলম জানান, দৌলতদিয়ায় বাস দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন ফেরিঘাটে রাস্তা নির্মাণের জন্য বাড়তি কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নদীতে পানিবৃদ্ধি ও কমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘাটের রাস্তা নির্মাণ করতে হয়। আরসিসি বা পিচ ঢালাই রাস্তা নির্মাণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে বালু ও ইটের খোয়া দিয়ে ফেরিঘাটের এপ্রোচ রাস্তা নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৩ সাল থেকে ফেরি সার্ভিস চালুর পর থেকে এভাবেই এপ্রোচ রাস্তা নির্মাণ হয়ে আসছে।
দৌলতদিয়া ঘাট সম্পর্কে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সুজন সরওয়ার বলেন, ‘পদ্মা সেতু হয়েছে বলে দৌলতদিয়াকে গুরুত্বহীন ভাবা ভুল।’ অল্টারনেটিভ রুট হিসেবে ঘাটটি সবসময় গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে ‘রিভার টার্মিনাল’ কনসেপ্টে উন্নয়ন করতে হবে। আধুনিক রো-রো ফেরি বাড়াতে হবে। এ ছাড়া সিন্ডিকেট ভাঙতে ডিজিটাল টিকিট সিস্টেম চালুর বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ফেরিঘাটের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘দৌলতদিয়া ঘাটের আধুনিকায়নে কেবল মেরামত নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।’