হাওরের পাকা ধান নিয়ে শঙ্কা

বৈশাখের দাবদাহ ও মেঘের আনাগোনা এই দুইয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে এখন নেত্রকোনার হাওর জনপদ। একদিকে সোনালি ধানের ম ম গন্ধ, অন্যদিকে অনাগত পাহাড়ি ঢলের আতঙ্ক। শ্রমিক সংকট আর আগাম বন্যার শঙ্কাকে সঙ্গী করেই নেত্রকোনার হাওরগুলোতে শুরু হয়েছে চলতি মৌসুমের বোরো ধান কাটার মহোৎসব। জেলার মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরির বিস্তৃত দিগন্তে এখন কৃষকের ঘাম ঝরানো স্বপ্নের ফসল ঘরে তোলার ব্যস্ততা তুঙ্গে।

বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘরে তোলা নিয়ে এবার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন হাওরের চাষিরা। চৈত্রের শুরুতেই অতিবৃষ্টির ফলে হাওরের নিচু জমিগুলোতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, যা ধান পাকার আগেই কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে উজানের ভারী বর্ষণের ফলে পাহাড়ি নদ-নদীগুলোতে পানি বাড়তে শুরু করেছে।

তীব্র রোদ ও তাপদাহ উপেক্ষা করে কৃষকরা মাঠে নামলেও তাদের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। বিগত ২০১৭, ২০২০ এবং সর্বশেষ ২০২২ সালের আগাম পাহাড়ি ঢলের স্মৃতি এখনো হাওরবাসীর মনে। সে বছরগুলোতে আগাম পাহাড়ি ঢলে কৃষকের গোলায় ওঠার আগেই তলিয়ে গিয়েছিল হেক্টরের পর হেক্টর জমি। এবারও যেন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য আগেভাগেই ধান কাটতে শুরু করেছেন অনেক কৃষক। শ্রমিক সংকট ও যান্ত্রিকীকরণের বাধা হাওরে ধান কাটার মৌসুমে এক সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার শ্রমিক আসতেন। দিনাজপুর, যশোর, বগুড়া ও উত্তরবঙ্গ থেকে দলে দলে শ্রমিক আসা ছিল দীর্ঘদিনের রীতি। কিন্তু যাতায়াত খরচ বৃদ্ধি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায় এখন আর আগের মতো শ্রমিক মিলছে না। ফলে হাওরজুড়ে তীব্র শ্রমিক সংকট রয়েছে।

এই সংকট মেটাতে সরকার ও কৃষি বিভাগ কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের ওপর গুরুত্ব দিলেও সেখানে দেখা দিয়েছে নতুন বিপত্তি। যান্ত্রিক উপায়ে ধান কাটা সহজ হলেও প্রত্যন্ত হাওরে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের অভিযোগ, তেলের অভাবে মাঠের মাঝখানে মেশিন অচল হয়ে পড়ে থাকছে। ফলে শ্রমিক সংকটের বিকল্প হিসেবে হারভেস্টার মেশিনগুলোও পুরোপুরি কাজে আসছে না।

পাহাড়ি ঢল থেকে ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড এবারও প্রায় সাড়ে ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে ১৪৬ কিলোমিটার ডুবন্ত বাঁধ মেরামত ও নির্মাণ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের আশা, এই বাঁধগুলো অন্তত এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে।

তবে পরিবেশবিদদের মতে, প্রতিবছর অপরিকল্পিতভাবে নদী বা খালের পাড় থেকে মাটি তুলে বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে নদীর নাব্য কমছে এবং স্বল্প বৃষ্টিতেই এলাকায় বন্যার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। বাঁধ নির্মাণের স্থায়ী সমাধান হিসেবে তারা নদী খনন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছেন।

কৃষি বিভাগের পরামর্শে এবার ব্রি-ধান ২৮ বা ২৯ এর মতো স্বল্পমেয়াদি ও রোগপ্রবণ জাতের পরিবর্তে হাইব্রিড জাতের আবাদ বেশি হয়েছে। কৃষকরা জানান, প্রতি ১০ শতাংশ বা এক কাঠা জমিতে এবার ৬ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত ধান উৎপাদিত হচ্ছে। তবে ধানের দাম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। শুরুতে দাম কিছুটা বেশি থাকলেও বর্তমানে হাইব্রিড মোটা ধান প্রতিমণ ৮০০ থেকে ৮২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রান্তিক কৃষকদের দাবি, সার ও ডিজেলের যে দাম বেড়েছে, তাতে মণপ্রতি অন্তত হাজার টাকা দাম না পেলে তাদের লোকসান গুনতে হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলার ৬টি উপজেলায় প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এখান থেকে প্রায় ৩ লাখ টন ধান উৎপাদিত হতে পারে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ২৭ কোটি টাকা। এছাড়া পুরো জেলাজুড়ে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যা থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘ইতিমধ্যে হাওরের প্রায় ১৩ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। কৃষকরা যেন দ্রুত ধান ঘরে তুলতে পারেন সে জন্য আমরা সাড়ে ৪০০ হারভেস্টার মেশিন নামিয়েছি। জ্বালানি তেলের সমস্যা সমাধানে বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এছাড়াও কৃষকরা যেন দ্রুত তাদের ফসল ঘরে তুলতে পারে সে জন্য আমাদের মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তারা নিয়মিত কাজ করছেন। আশা করছি, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের মধ্যেই হাওরের বেশিরভাগ জমির ধান কৃষকদের ঘরে উঠবে।’

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান কৃষকদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিক হাওরের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি। আগাম বন্যার শঙ্কা মাথায় রেখে দ্রুত ধান কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং হারভেস্টার মেশিনের তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে।’