চট্টগ্রামের ব্যস্ত নগরজীবনে সেলুন, বাস কাউন্টার, জেলা পরিষদ কিংবা কাউন্সিলর অফিস প্রায় সর্বত্রই মানুষের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। সেই অপেক্ষাকে একঘেয়ে না করে জ্ঞানচর্চার রূপ দিতে কাজ করছে স্বপ্নযাত্রী ফাউন্ডেশন। তাদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘অবসর পাঠাগার’ এখন ধীরে ধীরে মানুষের কাছে হয়ে উঠছে সময় কাটানোর নতুন অনুপ্রেরণা।
এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের একে খান এলাকায় গ্রিন লাইন বাস কাউন্টারে উদ্বোধন করা হয়েছে ১৮তম অবসর পাঠাগার। ফলে এখন যাত্রীরা বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতেই হাতে তুলে নিতে পারবেন বই- যা একদিকে সময়কে করবে উপভোগ্য, অন্যদিকে বাড়াবে জ্ঞানের পরিধি।
বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মোবাইল ফোনই হয়ে উঠেছে অবসর কাটানোর প্রধান মাধ্যম। তবে এই পাঠাগার উদ্যোগ মানুষকে আবার বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। বিভিন্ন বয়সী মানুষ এখানে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও আত্মউন্নয়নমূলক বই পড়ে সময় কাটাতে পারছেন।
উদ্যোক্তাদের মতে, প্রতিদিনের অপেক্ষার সময়গুলো যদি বই পড়ার মাধ্যমে কাজে লাগানো যায়, তবে তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। ইতোমধ্যে অনেক যাত্রী এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং এটিকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
গ্রীনলাইন কাউন্টারে বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রী সুরভি বলেন,আমি আগে কোথাও এই চমৎকার উদ্যোগ দেখিনি। আজ এখানে দেখে খুব ভালো লাগলো। কিছু ভালো বই ও তারা এখানে রেখেছেন। এই বইগুলো পড়তে পড়তে মোটামুটি বাসের সময় টের পাওয়া যাবে না। বিরক্তিকর সময়টা বই পড়ে ভালো কাটবে।
নতুন ব্রিজের মারছা কাউন্টারের ম্যানেজার জানান, এই সংগঠন অনেক জায়গায় এই পাঠাগার করেছে জানতে পারে আমাদের এখানেও করার উদ্যোগ নিয়েছি তাদের সঙ্গে। কারণ অনেক সময় বাস আসতে দেরি হয়। সে সময় যাত্রীরা বই পড়ে সময় কাটাতে পারে।
সেখানে উপস্থিত কক্সবাজারের যাত্রী সুমন বলেন, এখানে কিছু বই আছে দেখে হাতে নিলাম। পড়ে ভালোই লাগছে।
স্বপ্নযাত্রী ফাউন্ডেশনের প্রধান সমন্বয়ক সাফায়েত রায়হান শিহাব বলেন,২০২০ সালে রাঙামাটির বনরূপা এলাকায় প্রথম অবসর পাঠাগার চালুর মাধ্যমে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এই কার্যক্রম।
তিনি বলেন, আমাদের সব পাঠাগারেই ইতিহাস, ঐতহ্য, সংস্কৃতি, ধর্মীয়, গল্প, উপন্যাস, কাব্য, আত্মউন্নয়ন, সায়েন্স ফিকশন, থ্রিলার, ভ্রমণকাহিনী, ইতিহাস, শিশুতোষসহ বৈচিত্র্যময় বইয়ে সমৃদ্ধ করা আছে।
তিনি বলেন, আমাদের এই উদ্যোগ সহজ করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, বান্দরবান জেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, বসুন্ধরা শুভসংঘ, রোটারি ক্লাব, সংগঠনের শুভাকাঙ্ক্ষী, লেখক, প্রকাশক ও সাংবাদিকরা।
ওমর গনি এম ই এস কলেজের অধ্যাপক ববি বড়ুয়ার বলেন, স্বপ্নযাত্রী ফাউন্ডেশনের এই মহৎ প্রয়াস সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রুবেল মাহমুদ বলেন, এ পর্যন্ত আমরা অবসর পাঠাগার স্থাপন করেছি চট্টগ্রামের দামপাড়াস্থ সোহাগ বাস কাউন্টার, সৌদিয়া এসি বাস, গ্রীনলাইন বাস, এ কে খান গ্রীনলাইন, শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন মারছা বাস কাউন্টার, চান্দগাঁও থানায় পূরবী বাস, সিনেমা প্যালেস এলাকায় সৌদিয়া বাস, ঢাকার রাজারবাগের গ্রীনলাইন বাস ও কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী এলাকায় এনা বাস কাউন্টার, বান্দরবান কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক শেড, রাঙামাটির বনরুপায় পাহাড়িকা বাস কাউন্টার ও রিজার্ভ বাজারের পাহাড়িকা কাউন্টার। এছাড়া রাঙ্গুনিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও কর্ণফুলীতে একটি করে সেলুন, কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ ইউনিয়ন পরিষদ, লালমনিরহাট পৌর কমপ্লেক্স; আনোয়ারা কার্যালয় ও মোট ১৮টি স্থানে এই পাঠাগার চালু রয়েছে।
এই কাজের সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যরা বলেন,ছোট ছোট এই পাঠাগারগুলোই একদিন বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে। মানুষের মাঝে পাঠাভ্যাস বাড়বে, চিন্তার জগৎ প্রসারিত হবে এবং একটি সচেতন, আলোকিত সমাজ গড়ে উঠবে।