তারেক রহমানের কাঁধে দ্রুতগতির একটি ট্রেন জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায় অনেকটা ভাঙা ব্রিজে উঠেছে। নিচে বহমান জলতরঙ্গের স্রোতরাশি। তাতে কেবল গর্জমান ঢেউ নয়, সংক্ষুব্ধ জন-তরঙ্গও। এটাই বর্তমান বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতির চিত্র। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাঁধিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার চিন্তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সামরিক শক্তি আর সম্পদ লুটে নেওয়ার লোভ, দেশ বা আধিপত্য ইত্যাদি। তেল ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল করার যুদ্ধ। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান রাজি হয়েছে ৪৬০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে। ট্রাম্প স্বভাবগতভাবে মিথ্যুক। আমেরিকার সব মিডিয়া তা প্রমাণ করেছে। সবশেষের যুদ্ধ পরিস্থিতি এটাই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নেতানিয়াহু, শিখ-ি ইসরায়েলের প্রেতাত্মা। কট্টর ইহুদিবাদী তিনি। এমন নোংরা ও হিংস্র নেংটোপুটো সহযোগী নেতানিয়াহু। ইসরায়েল নির্মাতা ব্রিটেনের উত্তরাধিকারী আমেরিকার পো ধরে, নিষ্ঠুরতার উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছেন তিনি। ফিলিস্তিনের গাজাকে ধ্বংস আর প্রায় ৯০ হাজার মানুষকে হত্যা করেও ক্ষান্ত হননি নেতানিয়াহু। এখন লেবাননের সঙ্গে হিজবুল্লাহ প্রশ্নে আলোচনার টেবিলে বসছে। ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে উভয়পক্ষ রাজি হয়েছে, কিন্তু সেই বিরতির প্রথম ঘণ্টায় ইসরায়েল আবারও লেবাননে হামলা করেছে। সে নাকি শান্তি চায়! কথায় কথায় শান্তির বাণী ছাড়ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক দিন আগে, ইরানের সঙ্গে সামরিক বিরোধ শেষ করবেন বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি। জোর দিয়ে বলেছেন, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিতে স্বীকার করেছে। তার মানে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখলের পরিকল্পনাই তাকে যুদ্ধে নামিয়েছে। মানে কি এই যে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আবারও ইসলামাবাদে বসতে যাচ্ছে শান্তি আলোচনা। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইসলামাবাদে হাজির হতে পারেন। হরমুজ প্রণালি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দাবি করলেও, আসলে ওটা মিথ্যা ও হাস্যকর। ওই প্রণালি দিয়ে ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করছে না। আমরা তার রাজসাক্ষী। কী পরিমাণ ক্ষতি আমাদের হচ্ছে, তার তালিকা না দিলেও এর ভুক্তভোগী আমরা সবাই। সেই পরিস্থিতির বিষয়টি মনে রাখতে হবে।
এই ভূমিকার পরই আসল বিষয়ের প্রতি যাচ্ছি। আমাদের দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কেমন, তা সবাই জানছেন। চারদিকে হাহাকার গাড়ির তেলের জন্য। বাইক ও মোটরকারের দীর্ঘ সারি দেখলে মনে হয়, সরকার করছে কী? তার চোখে কি পড়েনি পদ্মা-মেঘনা আর যমুনা দিয়ে যে পরিমাণ পানি ভাটিতে যাচ্ছে, তার চেয়ে কি কম তেল যাচ্ছে চোরাচালানের পেটে? ওই পদ্মা, মেঘনা আর যমুনার ট্যাঙ্কারগুলো থেকে তেল প্রকাশ্যে চুরি হচ্ছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করলেই বলবে, ওই তেল ড্রামে করে যাচ্ছে গণমানুষের উৎপাদন ফিল্ডে, সেচ প্রকল্পে। কিন্তু আসলে তা চুরি হচ্ছে, পাচার হচ্ছে। সীমান্তের একটি তেল ডিপোতেও নিয়মিত চুরি হচ্ছে। আমরা নিয়মিতই সেসব সংবাদ পড়ছি। কিন্তু সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ সেই চুরি বন্ধ করছে না। সব দায় যেন তারেক রহমানের। যেহেতু তিনি ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছেন নির্বাচনে, অতএব সব দায় তার। সব সরকারের, এটা ঠিক আছে। কিন্তু আমরা কি করছি? সেটাও মনে রাখা দরকার। আমরা উচ্ছ্বাসপ্রবণ জাতি। একটুতেই লম্ফ-ঝম্ফ করতে ভালোবাসি। এটা কি আমাদের অনেক সময়ই লক্ষ্যচ্যুত করে, হতাশ করে, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতে উৎসাহ জোগায়? ধৈর্য বলে যে মানসিক শক্তিটা আছে, তা জাতিগতভাবে আমাদের নেই। আমরা অস্থির ও চঞ্চলপ্রবণ। একটুতেই সমালোচনার ঝড় তুলি, একটুতেই হতাশ হয়ে পড়ি। আবার কেউ কেউ বলেন, নির্বাচনে জিতে উন্নয়নের/জনসেবার/মানুষের কল্যাণের সব ফ্রন্ট খুলে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে কেন? নির্বাচনী ওয়াদা দিলেই যেসব কাজ একসঙ্গে করার উদ্যোগ নিতে হবে, এটা কে বলেছে? অতীতে কি এমন হয়েছে কখনো? পরিকল্পিত বিষয়, পরিকল্পনা অনুযায়ী হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। এ রকম পরামর্শ আমলাতান্ত্রিক বুদ্ধিদাতাদের। তারা ঢিলে-তেতালা রোগের রোগী। এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে জানেন না, নেন না। ক্ষমতা দেখানো ও তা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগের জন্য।
কেউ কাউকে শিখিয়ে দেয় না। নিজে থেকেই শিখতে হয়। নির্বাচনী ওয়াদা দিয়ে তারেক রহমান বুঝিয়েছেন যে, তিনি দেশের মানুষ নিয়ে ভাবছেন উন্নয়নের লক্ষ্যে। সেই উন্নয়নটা হবে নগরকেন্দ্রিক? না তিনি ভেবেছেন, উন্নয়নটা হবে গ্রামকেন্দ্রিক? পিরামিড আকারে হবে তার যাত্রা। তৃণমূলের প্রান্তিক চাষি, মেহনতি খেটে খাওয়া কামলা, ছোট ব্যবসায়ী আর সেসব মানুষ যারা দিন-রাত পরিশ্রম করে নগরজীবনকে রসদ জোগায়। কৃষকের উন্নতি, গ্রামের উন্নয়ন, চাষাবাদের উন্নয়নই হবে যার মূল লক্ষ্য। তারেক রহমান তার ওয়াদাগুলোর সব ফ্রন্ট খুলে দেননি। তিনি বাছাই করেছেন কোনগুলো গণমুখী, উন্নয়নমুখী আর কোনগুলো জাতির জন্য কল্যাণ ডেকে আনবে। কৃষি হচ্ছে সেই ফ্রন্ট। কৃষি বাঁচলে কৃষক বাঁচবে। আর কৃষক বাঁচা মানে, গ্রামীণ জনপদ বাঁচবে। এই কাজটাই সবার আগে বাংলাদেশ স্লোগানের মূলে রয়েছে। সেই শক্তিই তিনি অর্জনের চেষ্টা করছেন। তারেক রহমানের প্রধান ফ্রন্ট একটি কৃষির উন্নয়ন। কৃষি-নদের শাখা হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড। এই মৌলিক অর্থনৈতিক কর্মসূচি সব ফ্রন্টে খোলা হয়েছে বলে যদি দাবি করা হয়, তাহলে তার চেয়ে মিথ্যা আর কী হতে পারে? কী কী পাবেন কৃষকরা ওই কার্ডের মাধ্যমে? ন্যায্যমূলে কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা, সরকারি ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ, প্রণোদনা, কৃষি প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি, সেলুলার/মোবাইলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজার তথ্যসহ আরও কিছু সহযোগিতা, যা এতকাল কৃষক পেতেন না। এবারই প্রথম এভাবে তারা সরাসরি পেলেন বা বাকিরা পেতে যাচ্ছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত দুই কোটি ৭৫ লাখ প্রান্তিক, মধ্য ও নিম্ন-মধ্য শ্রেণির কৃষক আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কার্ড পাবেন। ঘরে বসেই যদি উল্লিখিত সেবা পান কৃষক, তাহলে তারা যথেষ্ট লাভবান হবেন। উন্নয়নের আরেকটি ফ্রন্ট হচ্ছে বৃক্ষরোপণ। তারেক রহমান বলেছেন, তার সরকার ২০ কোটি গাছ রোপণের আয়োজন করবেন। বেশ কয়েকজন দাবি করেছেন, সেটা করলে দেশ নাকি জঙ্গলে পরিণত হবে। তারেক রহমান ৫ বছরে ওই পরিমাণ গাছ রোপণ করতে পারবেন না। এই অবিশ্বাসীদের উদ্দেশে বলা যায় দেশের প্রতিটি সড়কে, মহাসড়কে যদি গাছ লাগানো যায়, তাহলেই ২০ কোটি গাছ রোপণ সম্ভব হবে। গাছ হচ্ছে অক্সিজেন ফ্যাক্টরি। সেই সম্পদের ওপর জোর দেওয়াই ঠিক। প্রধানমন্ত্রী সেটাই করেছেন। এ ছাড়া রয়েছে নদ-নদীর দুই পাড়ে বৃক্ষরোপেণের সুযোগ। নদী-ভাঙনরোধে গাছ অনন্য ভূমিকা পালন করে। রয়েছে প্রতিটি বাড়িকে গাছের ছায়ায় মুড়িয়ে দেওয়া। সেসব বৃক্ষ হবে ফলদ গাছ। তার পাশে থাকতে হবে ঔষধি গাছ। আর কাঠের উপযোগী গাছ বুনতে হবে। খাল খননের সঙ্গে উৎপাদনের সুসম্পর্ক। শুকনো মৌসুমে পানি ধরে রেখে যদি জমিতে সেচ দেওয়া যায়, তাহলে উৎপাদন বাড়বে নাকি বাড়বে না? বাড়বে। তাহলে কি এই ওয়াদার ফ্রন্ট ওপেন করা ভুল হয়েছে?
রাজনৈতিক ময়দানে আওয়ামী লীগ নেই। তাই কি খালি ময়দানে বিএনপি একা বল নিয়ে ছুটছে? এবং গোল দিয়ে ফিরছে নিজের পজিশনে। গোলবারে কোনো গোলকিপার নেই, যিনি বল ঠেকাবেন। খালি মাঠে গোল দেওয়া সহজ। সহজ! অত সহজ হলে তো কথা ছিল না। বল খেলার রীতি-নীতি তো জানতে হবে। সেন্টারপয়েন্টে উভয়পক্ষ দাঁড়িয়ে আছে যার যার পজিশনে, বল কোন দিকে যাবে বলা যায় না। তারেক রহমান ঠিক করেছেন, তিনি গোল বরাবর বলটা মারবেন। বাতাসের বেগ ও প্রগতির গতি বুঝে তিনি জনগণের ময়দানে কিক করলেন গোল! না, এমন সহজ ও সরল নয় রাজনীতির ময়দান। কাঁটা আর সমালোচনায় ভরা সেই ময়দান। প্রতিদিনই টিভির বিভিন্ন টকশোতে এটি শুনছি। এটা গেল তো, সেটা রইল পড়ে ইত্যাদি। একতরফা কাজে মজা কম, লক্ষ্য অর্জনে সেখানে পৌঁছাও কঠিন। যেন হাওয়ায় হাওয়ায় এআই প্রযুক্তির অদৃশ্য প্রতিযোগী দাঁড়িয়েছে গোলবারে। এখন সমালোচনা করা যাক সরকারের প্রশাসনের স্ট্রাকচার নিয়ে। এটা একটি অতি পুরনো জীর্ণ, জনসেবার এক ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান। ‘আমলা’ নামের চরিত্র, মনে হয় কোন দূরদেশের মানুষ। আসলে তারা আমাদেরই ছাওয়াল-পাওয়াল। শিক্ষা নিয়ে সরকারের প্রশাসনে চাকরি পেয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে আমলাচরিত্র চর্চা করে, মূল্যবান মানুষ হয়েছে। এদের কর্ম-দক্ষতা অনন্যসাধারণ। প্রশাসন কি করে চলবে, চালাতে হয়, তার সব কিছুই তাদের নখদর্পণে। এরা প্যাঁচ লাগাতে ওস্তাদ। কেন না, তারা জানে কী রেখে কী করলে, কী হয়। সেই আইনি প্যাঁচের ফেরে পড়ে রাজনৈতিক চরিত্র উল্টে যান। কান পড়া দিতে তারা যথেষ্ট দক্ষ। এই দক্ষতার জোরে তারা রাজনীতিকদের আদরের মানুষ হিসেবে পরিগণিত হয়।
আমরা ভেবেছিলাম, তারেক রহমান নতুন প্রজন্মের মানুষ, নতুন চেতনার অধিকারী। তাই তিনি যখন বললেন ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’, তখনই বুঝেছিলাম তিনি কতটা দক্ষ হয়েছেন। না, প্রশাসনের কথা বলছি না। তিনি রাজনীতি আয়ত্ত করেছেন রগে-রেশায় জেনে বুঝে। তিনি যখন বললেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ তখন বোঝা গেল, তিনি নতুন ফর্মুলা দিয়ে আমাদের বাঁধছেন। সবার আগে বিএনপি বলেননি। সব কিছুর ওপর বাংলাদেশ। এই নীতি আর এই আদর্শ তাকে জনসম্পৃক্তি দিয়েছে। ভোটার জনগণ ভেবেছেন, তার আগে তো কেউ এমনভাবে বলেননি? এই বলাটাও একটি কাজ। কীভাবে উপস্থাপন করবেন, তার ওপর নির্ভর করবে আপনার গ্রহণযোগ্যতা। তারেক রহমানকে জনগণ নিয়েছে। তারেক রহমানকে তারা নিজেদের সন্তান ভাবতে শুরু করেছেন। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রণোদনার অর্থ পেয়ে তারা সংকটে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন। জনগণের জন্য এই যে রাজনৈতিক পুষ্টি তারেক রহমান দান করলেন, তা তারই আকাক্সক্ষা, প্রত্যাশার বিষয়। তার এই প্ল্যানের প্রশাসনিক অংশীজন হচ্ছেন আমলারা। তাদের আলস্য জড়তা, কূটচাল দলীয় চিন্তার খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। তাহলেই কেবল সব বাধা বিপত্তি দূর করা সম্ভব। আমলাদের জন্য আপাতত প্রণোদনা নেই। পলিটিক্সকে পুরনো ‘পলিটিক্যাল অ্যারেনা’ থেকে কিছুটা মুক্ত করে এনেছেন তারেক রহমান এবং তার দল বিএনপি। এই যে রাজনীতিকে ‘সভ্য’ করে তোলা, তা বিএনপি করেছে। আমরা ধারণা করি, সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষ হচ্ছে মূলত সহযোগী। কিন্তু তেরোতম সংসদের প্রতিপক্ষ ১১ দলীয় জামায়াত জোট, সহযোগী হতে পারেনি। তারা প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। প্রতিপক্ষ সবসময় ক্ষমতাসীনদের দোষ-ত্রুটি ধরে রাজনীতি করে। ইতিবাচকতা তারা বাদ দেন। জামায়াত মাত্র দুই মাসের সংসদীয় গণতন্ত্রের সরকারকে স্বস্তির সঙ্গে কাজ করতে দিচ্ছে না। এর মধ্যেই তারা চারবার ওয়াকআউট করেছে সংসদ থেকে। কোন কোন যুক্তিতে তারা ওয়াকআউট করেছেন, তা জাতি জানে। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না যে, জামায়াত আসলে কী চায়? আগে সেটা বুঝতে হবে। তারপর আমরা বলব, সবকিছুর স্বার্থে তারা সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে জনগণের জন্য কোন ধরনের কাজ করবেন।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
mahboob.hasan08@ gmail.com