আজ কী অজুহাত দেবে বাংলাদেশ

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে মাসখানেক কাটিয়ে দেশে ফিরে লিটন কুমার দাস বলেছিলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় মানিয়ে নেওয়াটা কঠিন। রবিবার সংবাদ সম্মেলনে শরিফুল ইসলামের কথা শুনে তার সতীর্থের কথাই মনে পড়ল। পাকিস্তানে টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলছিলেন, সেখান থেকে দেশে এসে টসের দুই সেকেন্ড আগে একাদশে সুযোগ পাওয়ার জন্য তার মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়েছে  ওয়ানডেতে। অকাট্য যুক্তি, কোনো সন্দেহ নেই। তাহলে অন্য গোলার্ধের ভিন্ন পরিবেশ থেকে এসে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা কী করে ভালো খেলে ম্যাচটা জিতে গেলেন, সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর অবশ্য তার কাছে নেই। বাংলাদেশ দলটাই হয়ে উঠেছে এমন, যেখানে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে মুখই চলছে বেশি।

প্রথম ওয়ানডের ইনিংস বিরতিতে কথা হচ্ছিল নিউজিল্যান্ড দলের সঙ্গে আসা মিডিয়া ম্যানেজার ক্যালাম কারনোর সঙ্গে। প্রথমবার এসে বাংলাদেশে ক্রিকেটকে ঘিরে সংবাদ মাধ্যমের তুমুল আগ্রহের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের পরিস্থিতির তুলনা করতে গিয়ে বলছিলেন, ‘ওখানে কেন উইলিয়ামসন রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে বেশিরভাগ লোকই তাকে চিনবে না, অল্প কেউ চিনলেও দেখে হয়তো ছোট্ট করে হেসে এগিয়ে যাবে। রাগবি খেলোয়াড়দের ছবি বিলবোর্ডে দেখা যায়, ক্রিকেটারদের একদমই নয়।’ সাকিব আল হাসানের পর বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ডগুলো সব হামজা চৌধুরীর চেহারায় ছেয়ে গেলেও ক্রিকেট মাঠে গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড় কমেনি। শরিফুল-সাইফদের গাড়ি স্টেডিয়ামে ঢুকলেও তার দিকে ধেয়ে যায় গোটা ত্রিশেক ক্যামেরা-মোবাইল। অথচ তাদেরই কি না হারিয়ে দিল নিজেদেরই দেশে অজানা-অচেনা একদল ক্রিকেটার!

১৬ মাস পর ওয়ানডে ক্রিকেট খেলতে নেমে ভালো করেও সতীর্থদের ভুলের ভারটা বইতে হলো শরিফুলকে। বোলাররা প্রতিপক্ষকে অল্পতে আটকে রাখলেও ব্যাটসম্যানরা যখন সেই রানটাও করতে পারে না, তখন আক্ষেপ হয় কি না এমন প্রশ্নে শরিফুল বললেন, ‘আক্ষেপের কোনো কিছু নেই। যদি আমরা হেরে যাই, তখন আমাদেরও খারাপ লাগে, ব্যাটসম্যানদেরও খারাপ লাগে। আমরা যদি আরেকটু ভালো বোলিং করতাম তাহলে তাদের জন্য কাজটা সহজ হতো। মনে করব যে পরের ম্যাচে ব্যাটসম্যানরা খুব ভালো করবে, আমাদের সাপোর্ট দেবে আমরাও তাদের সাপোর্ট দেব, দলগতভাবে আমরা ম্যাচটা জিতব। ক্রিকেট খেলায় এমনটা হয়ই, একটা ইউনিট ভালো করে একটা ইউনিট ফেল করে। এটা নিয়ে আমরা আশাবাদী যে পরের ম্যাচে ইনশাআল্লাহ ভালো করব।’

প্রচ- গরমে টসে হেরে আগে ফিল্ডিং করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। শরিফুল বললেন টসটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে কারণ দুপুর রোদে কোনো দলই বোলিং করতে চাইবে না, ‘যে ওয়েদার আমার মনে হয় ওয়ানডে খেলাটা হুট করে এসে... আমি টি-টোয়েন্টি খেলে আসছি তারপরও আল্লাহর রহমতে মানিয়ে নিয়েছি। আমার মনে হয় টসটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ, দেখা যাক পরের ম্যাচে টসে কী হয়!’ অবশ্য ম্যাচটা দিন-রাতের হলেও টস যে গুরুত্বপূর্ণ সেটা শরিফুলের কোনো সতীর্থ যে সংবাদ সম্মেলনে বুঝিয়ে বলতেন সে ব্যাপারেও কোনো সন্দেহ নেই। তখন গরমের পরিবর্তে প্রভাবক হিসেবে চলে আসত রাতে শিশির পড়া, বল ভিজে যাওয়া, স্পিনারদের বল ধরতে অসুবিধাসহ নানান অজুহাত।

শরিফুলের সংবাদ সম্মেলন কক্ষ ছেড়ে যাওয়ার মিনিট দশেক পর এলেন নিউজিল্যান্ড দলের পেসার নাথান স্মিথ। প্রথম ওয়ানডেতে পরপর দুই বলে তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্তর স্টাম্প ভেঙে যে ভয়টা ধরিয়েছিলেন এই পেসার, তাতেই খোলসবন্দি ব্যাটিংয়ে ম্যাচটা হেরে যায় বাংলাদেশ। শরিফুল বলেছিলেন টি-টোয়েন্টি থেকে এসে ওয়ানডে খেলার অনভ্যস্ততার কথা। স্মিথ এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলছেন মিরপুরে, ঢাকায় আসার মাসপাঁচেক আগে খেলেছিলেন জাতীয় দলে। বাংলাদেশের বিমানে ওঠার আগে মাসদুয়েক খেলেছেন ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে, অর্থাৎ লাল বলে। ডানেডিন আর ওয়েলিংটনে লাল  বলের ক্রিকেট খেলে ঢাকায় এসে ওয়ানডে খেলতে নেমে খারাপ করলে অনেক যৌক্তিক অজুহাত দিতে পারতেন স্মিথও। সেই সংস্কৃতিটাই যে নেই নিউজিল্যান্ড দলে, বরং শীর্ষ তারকাদের অনুপস্থিতিতে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ারা নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া। তাই তো স্মিথ ড্রেসিং রুম থেকে শরিফুলের বোলিং দেখেই সাজিয়ে নেন নিজের ছক, বুদ্ধিমত্তায় কাটিয়ে ওঠেন অভিজ্ঞতার অভাব, ‘(উইকেট সম্পর্কে ধারণা) এসেছিল প্রথম ইনিংসে খেলা ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে, পাশ থেকে আমরাও দেখছিলাম, শরিফুলের বলটা নিচু হয়ে নিক কেলিকে বোল্ড করল, শরিফুল যে লেন্থে বল করেছিল আমরা বোলিংয়ের সময় সেই লেন্থটাই করতে চেয়েছি। যতটা সম্ভব চেয়েছি স্টাম্প-টু-স্টাম্প বল করে যেতে, একটু অসমান বাউন্স ছিল আর পরের দিকে দেখেছেন টিকনার কয়েকটা স্লোয়ার বল করেছে যেটা কাজে দিয়েছে।’

টস ভাগ্য কতটা প্রভাব রাখবে ম্যাচে? আজ যদি নিউজিল্যান্ডকে আগে ফিল্ডিং করতে হয় তাহলে কি ব্যাটিংয়ে প্রভাব পড়বে যেটা দেখা গেছে বাংলাদেশের বেলা? এমন প্রশ্নে স্মিথের সহজ উত্তর, ‘বাইরে আগুনের মতো গরম। ওই রোদে প্রথমে বোলিং করাটা হবে সত্যিই খুব কঠিন। তবে কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে,  সিমারদের ছোট ছোট স্পেলে বল করতে হবে। দুই ওভারের স্পেল, সর্বোচ্চ তিন ওভার। একটু বাইরে গিয়ে পানি খেয়ে এসে আবার নেমে পড়া। আমরা ১৪ জন ক্রিকেটার, যারা একাদশের বাইরে আছে তারা পানি নিয়ে তৈরি থাকে সীমানার বাইরে, দলের অন্য সদস্যরাও সহায়তা করেছে। এই পরিবেশে বোলিং করা সত্যিই খুব কঠিন তবে আমরা প্রস্তুতিটা সেভাবেই নেব।’ কোনো অজুহাত নেই, আছে সমস্যাকে মেনে নিয়ে সমাধানের গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত কৌশল।

দক্ষতা কিংবা অভিজ্ঞতা নয়, শেষ পর্যন্ত মাঠে এলে ব্যবধান গড়ে দেয় হার না মানার অদম্য মানসিকতা। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা জানেন, এখানে অজুহাত দিয়ে পার পাওয়া যায়। পারফর্ম না করলেও দলে টিকে থাকা যায়। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের এই দলটার ক্রিকেটাররা জানেন, শীর্ষ তারকাদের অনুপস্থিতিতে যে সুযোগটা পাওয়া গেছে জাতীয় দলে খেলার সেটা হয়তো আর আসবে না। তাই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তারা জেতার জন্য মরিয়া।