দেশে জ্বালানি নিয়ে সংকট ক্রমেই বাড়ছে। পেট্রোলপাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, কোথাও তেল না থাকার ঘোষণা, আবার কোথাও সীমিত সরবরাহ এ চিত্র নিত্যদিনের। সাধারণ মানুষ সময়, শ্রম ও অর্থ সব দিক থেকেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। অথচ সরকারি বক্তব্য ভিন্ন। দাবি করা হচ্ছে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই; বরং গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। এই দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানে প্রশ্ন উঠেছে এত তেল যাচ্ছে কোথায়? আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রভাব জ্বালানি বাজারে পড়েছে এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। তবে দেশের অভ্যন্তরে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সক্রিয়তাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। দীর্ঘদিন ধরে তেল বাণিজ্যে অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ থাকলেও, কার্যকর পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট। এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা জনসাধারণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। এলপিজির দাম এক মাসে দুই দফায় প্রায় ৬০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে শহর থেকে গ্রামের প্রতিটি পরিবারে। রান্নার খরচ বেড়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু আয়ের সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য নেই। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবন আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
একইভাবে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষি খাতকে চাপে ফেলছে। সেচের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের বাজারেও পড়ছে। কৃষকরা নিজেদের ক্ষতি মেনে নিয়েও উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাদের এই দায়বদ্ধতার ওপর নির্ভর করেই কি রাষ্ট্র নিশ্চিত থাকতে পারে? প্রশ্ন হলো এই সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কোনো পরিকল্পনা রয়েছে? মূল্যবৃদ্ধিই একমাত্র সমাধান? নাকি বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে দ্রুত এগোনো প্রয়োজন? বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কথা বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। সৌরশক্তির ব্যবহার কৃষিক্ষেত্রে বিস্তৃত করা গেলে, সেচব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। জ্বালানি নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম অস্থিরতার মধ্যে, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ সৌরশক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সংকট অনেকটাই মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশকেও সৌরশক্তির ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে।
এটি শুধু পরিকল্পনায় না রেখে, সঠিক বাস্তবায়ন করার খুবই জরুরি। একইভাবে সমুদ্রের তাপশক্তি, ঢেউ ও বায়ুশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এসব খাতে গবেষণা ও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। দেশের জ্বালানি খাত ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে উঠছে। এতে একদিকে যেমন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বিদেশ নির্ভরশীলতা। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে, যা দেশের টেকসই অগ্রগতির পথে অন্যতম অন্তরায়। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে, স্থানীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করার কথাও বহুবার বলা হয়েছে। সরকারের তরফ থেকেও নানান পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। পরিকল্পনা গ্রহণই যথেষ্ট নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে অগ্রাধিকার নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি। কৃষি, জনজীবন এবং উৎপাদনমুখী খাতগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিলম্বিত সিদ্ধান্তের মূল্য শেষ পর্যন্ত জাতিকেই বহন করতে হয়। জ্বালানি সংকট শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, কৃষি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী চিন্তা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং কার্যকর পদক্ষেপ। অন্যথায় এ সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।