শুরুতে মনে হচ্ছিল একই দৃশ্যেরই পুনরাবৃত্তি হবে। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নিউজিল্যান্ড, মাথার ওপর গনগনে সূর্য আর উইকেটে ‘ধীরে চলো’ নীতির দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। রান তোলার চেয়ে বাংলাদেশের ফিল্ডারদের রোদের ভেতর খাটিয়ে ক্লান্ত করাটাই যেন তাদের লক্ষ্য। তাদের এই সহজ-সরল দর্শনে বাঁধ সাধলেন বছর চব্বিশের এক তরুণ। আগুনে রোদের সবটুকু উত্তাপ মিশিয়ে দিলেন হাতে ধরা বলটার মধ্যে। সেই উত্তাপেই ছাই হয়ে গেল কিউইদের সিরিজ জয়ের স্বপ্ন। মিরপুরে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচটি ৬ উইকেটে জিতে সিরিজে ১-১ সমতায় ফিরেছে মেহেদি হাসান মিরাজের দল। ৩২ রানে ৫ উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডকে মাত্র ১৯৮ রানেই গুটিয়ে দিয়েছেন নাহিদ রানা, এরপর তানজিদ হাসান তামিমের ৫৮ বলে ৭৬ রানের ইনিংসটি বাংলাদেশকে দিয়েছে জয়ের প্রয়োজনীয় জ্বালানি। সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্তর সাবধানী হাফসেঞ্চুরি কোনো বিপদ হতে দেয়নি, ৮৭ বল হাতে রেখেই বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে জয়ের লক্ষ্যে।
আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে শরিফুল ইসলাম বলেছিলেন, মোস্তাফিজুর রহমানের কোনো চোট নেই। তিনি খেলার জন্য শতভাগ সুস্থ। সকালে একাদশে তার অনুপস্থিতি খানিকটা অবাক করার মতোই। একটা পরিবর্তন অবশ্য অনুমিত, প্রথম ওয়ানডেতে আফিফ হোসেন যে ব্যাটিংটা করেছেন, তারপর তাকে দলে রাখাটাই হতো অস্বস্তির। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের একাদশে কোনো বদল নেই। হেনরি নিকোলস ও নিক কেলি, দুজনে ব্যাটিংয়ে নেমে খেলছিলেন টেস্টের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানদের মতো। তাসকিন আহমেদের করা প্রথম ওভারে নো-বল থেকে ফ্রি হিটে ফুলটস বল পেয়েও পারেননি বাউন্ডারি মারতে। প্রথম ওভারে রান ২, পরের দুই ওভার মেডেন, তার পরের ওভারে ১ রান; ৫ ওভার শেষে দলের রান ছিল ১২।
অষ্টম ওভারে নাহিদ রানাকে বল দিলেন অধিনায়ক মেহেদি হাসান মিরাজ, অধিনায়কের আস্থায় পূর্ণ সমর্থন দিয়ে প্রথম বলেই উইকেট নিয়ে ব্রেক থ্রু দিলেন এ পেসার। আউট হয়ে গেলেন হেনরি নিকোলস। নিজের পরের ওভারে বোলিংয়ে এসে ফের প্রথম বলেই উইকেট রানার। এবারে উইল ইয়ং। জোড়া ধাক্কায় কিউইদের স্বস্তি মুছে দিলেন নাহিদ রানা। অধিনায়ক টম ল্যাথামের বাংলাদেশের বিপক্ষে সাফল্যের হার ভালো, এ রকম পরিস্থিতি অতীতে সামালও দিয়েছেন একাধিকবার। সৌম্য সরকারের মিডিয়াম পেসে ব্যাটের কানায় লাগালেন বল, লিটন ক্যাচ নিলেন স্টাম্পের পেছনে। বারকয়েক রিপ্লে দেখে আম্পায়ার জানালেন আউটের সিদ্ধান্ত। নিক কেলি একটা প্রান্ত আগলে রাখলেও অন্য প্রান্তে নিয়মিতই বদলেছে তার সঙ্গী। ল্যাথামের ১৪, আব্বাসের ১৯, ডিন ফক্স ক্রফটের ১৫, নাথান স্মিথের ১৮ কেউ-ই ইনিংসই লম্বা করতে পারেননি।৪৮.৪ ওভারে ১৯৮ রানে অলআউট নিউজিল্যান্ড। সর্বোচ্চ ৮৩ রান নিক কেলির। নাহিদ রানা নিয়েছেন ৩২ রানে ৫ উইকেট, শরিফুল ইসলামের জোড়া শিকার আর তাসকিন, রিশাদ হোসেন ও সৌম্যর ১টি করে উইকেট।
জিততে হলে ৫০ ওভারে করতে হবে ১৯৯ রান, ওভারপ্রতি গড়ে ৪ রান করে আস্কিং রেট। লক্ষ্যটা ছোট হলে চওড়া হয় তানজিদ তামিমের ব্যাট। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতেও লক্ষ্য যখন ১১৫ রান, সেদিন তামিমের ব্যাটে ৬৭*। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। নাহিদ রানা ব্ল্যাকক্যাপদের অল্পেই আটকে দেওয়ার পর তানজিদ তাদের বোলারদের পিটিয়ে ছাতু বানিয়েছেন। ১০ চার আর ৪টি ছক্কা মারার পর পঞ্চম ছক্কাটি মারতে গিয়ে লং অফে ক্যাচ দিয়েছেন নিকোলসের হাতে। সেঞ্চুরিটা যে মাঠেই ফেলে এলেন তানজিদ তামিম, যখন আউট হলেন, তখন দলের জিততে বাকি ৫৮ রান আর তার সেঞ্চুরির জন্য চাই ২৪, ইনিংসের অর্ধেকেরও বেশি বল বাকি। লেনক্সের আগের বলটায় ছক্কা মেরে পরের বলে একটু ভারসাম্য হারালেন মারতে গিয়ে, তাতেই ফল পালটে গেল। তামিমের পর লিটন দাসও এসে অল্পতেই বিদায় নিলে খানিকটা বিপদের গন্ধ বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে, কারণ ধস নামতে তো সময় লাগে না! তবে নাজমুল হোসেন শান্ত ৭১ বলে ৫০ রানের ধৈর্যশীল ইনিংস খেলে বিপদ বাড়তে দেননি। ৫০ করার পর মাংসপেশিতে টানের কারণে শান্ত মাঠ ছাড়লে ক্রিজে আসেন মেহেদি হাসান মিরাজ। হৃদয়কে সঙ্গী করে দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন অধিনায়ক। ৩২ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা নাহিদ রানা।
৬ উইকেটের জয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে ১-১ সমতা ফেরাল বাংলাদেশ। সিরিজের শেষ ম্যাচ চট্টগ্রামে বৃহস্পতিবার। ম্যাচটি জিতলে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতবে জয়ী দল।