পাবনা শহরের প্রাণ হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী ইছামতি নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সংশোধিত নকশা (আরডিপিপি) নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দলের সমীক্ষা উপেক্ষা করে রহস্যজনকভাবে খনন প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী ১৩টি সেতু পুনর্নির্মাণ ও নৌপথ তৈরির কাজ। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে জনগুরুত্বপূর্ণ এই পরিবর্তনকে জনস্বার্থবিরোধী ও নজিরবিহীন বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, গত ৫০ বছরে দখল ও দূষণে মৃতপ্রায় হয়ে পড়া ইছামতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ২০২৩ সালে ১ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়। বুয়েটের সমীক্ষায় স্পষ্ট জানানো হয়েছিল, স্থানীয় সরকার ও সড়ক বিভাগ কর্তৃক নির্মিত নিচু ও অপ্রশস্ত সেতুগুলো পানিপ্রবাহের প্রধান অন্তরায়। নদীকে বাঁচাতে হলে এসব প্রতিবন্ধক ভেঙে সুউচ্চ ও আধুনিক সেতু নির্মাণ অপরিহার্য।
শহরাংশের ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে থাকা অবৈধ বসতি উচ্ছেদ এবং নদীর সৌন্দর্যবর্ধনের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। কিন্তু গত জাতীয় নির্বাচনের মাত্র সাত দিন আগে তড়িঘড়ি করে পাস করা সংশোধিত ডিপিপিতে রহস্যজনকভাবে ১৩টি সেতু পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে পুরনো ব্রিজ, রূপকথা সড়ক, পৈলানপুর ও নতুন ব্রিজ এলাকাও অন্তর্ভুক্ত।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবন্ধক সেতুগুলো রেখে নদী খনন করা মানে হলো একটি ড্রেন তৈরি করা, নদী উদ্ধার নয়। এই গলার কাঁটাগুলো না সরালে হাজার কোটি টাকা কেবল অপচয় হবে।’
পাউবোর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আব্দুল হামিদ রোডের যানজট কমাতে বিকল্প নৌপথের পরিকল্পনাটিও বাদ দেওয়া হয়েছে। একনেকে পাস হওয়া প্রকল্প এভাবে কোনো আলোচনা ছাড়াই কাটছাঁট করা নজিরবিহীন।
ইতিমধ্যে পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘বিগত সরকার জনমত উপেক্ষা করে নির্বাচনের সাত দিন আগে দ্রুত প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে নকশা পরিবর্তন করেছে। পাবনাবাসীর চাহিদা অনুযায়ী, যানজটমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।’
পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার অভিযোগ করেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে প্রভাবশালী জামায়াত নেতার চাপে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ মতামত উপেক্ষা করে প্রকল্পটি কাটছাঁট করা হয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই।’
অন্যদিকে, প্রকল্পের নতুন আপদ হিসেবে দাঁড়িয়েছে দখলদারদের দায়ের করা মামলা। আইনি মারপ্যাঁচে শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে খনন কাজ থমকে যাওয়ায় নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
পাবনা পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক সুধাংশু কুমার সরকার বলেন, ‘নকশা পরিবর্তনে প্রকল্পের খুব বেশি ক্ষতি হবে না। আমরা ৩৩ কিলোমিটারের মধ্যে ২৬ কিলোমিটার খনন শেষ করেছি। শহর অংশের সাড়ে ৩ কিলোমিটারে আংশিক কাজ হয়েছে।’ মামলা জটিলতা নিরসনে দুজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
উল্লেখ্য, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত। তবে নকশা জটিলতা ও মামলার গেরোয় পাবনাবাসীর স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।