চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি চক্র বিদেশি মুদ্রা ও সোনা পাচারে জড়িতÑ এ কথা গোপন হলেও গোপন নয়, প্রায় সবাই তা জানে। এই পাচারক্রিয়ার ৩৭ হাজার সৌদি রিয়াল আত্মসাৎ করা বিষয়ক দ্বন্দ্বের জেরে সিভিল অ্যাভিয়েশনের অফিস সহকারী মো. ওসমান সিকদারকে (৪০) অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
বিমানবন্দরেরই দুই কর্মচারীসহ আটজন হত্যাকা-ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর রাতে শাহ আমানত বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকায় ওই হত্যাকা- ঘটে। পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে তদন্তে পুলিশের গাফিলতি থাকায় সম্প্রতি আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ না করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দেওয়ার আদেশ দিয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পাচারের ৩৭ হাজার সৌদি রিয়াল পুরোপুরি ফেরত না দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে বিমানবন্দরের দুই কর্মচারীসহ আটজন মিলে ওসমান সিকদারকে বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকার বাসাতেই খুন করে এবং স্টেশন ওয়াগন গাড়িতে করে বিমানবন্দর সংলগ্ন চরপাড়া সড়কের পাশে ফেলে দেয়। মামলার দুই আসামি ইব্রাহিম খলিল ও ফারুক উদ্দিন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আরও অনেকের সংশ্লিষ্টতার কথাও তারা বলেছেন। আদালত বলেছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা ওই দুজনের বিষয়ে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান করেননি; গাফিলতি থাকায় সম্পূরক তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ১২ জানুয়ারি পতেঙ্গা থানা-পুলিশ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। অভিযুক্তরা হলেন, সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের ইলেকট্রিশিয়ান ইব্রাহিম খলিল, নিরাপত্তাকর্মী বাদল মজুমদার এবং তাদের সহযোগী মো. আরিফ, মো. রাসেল, ফারুক উদ্দিন, নজরুল ইসলাম, মো. সুমন ও বাবর চৌধুরী। মামলার বাদী নিহত ওসমানের বড়ভাই এমরান সিকদার বলেন, ‘দুই আসামির জবানবন্দিতে আরও ১০ জনের নাম এলেও অভিযোগপত্রে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেননি তদন্ত কর্মকর্তা। আসামিরা আমার ভাইকে চাপ দিয়ে ৩৭ হাজার রিয়ালের বিপরীতে ৯ লাখ টাকা নিয়েছেন। তবুও তারা আমার ভাইকে বাঁচতে দেয়নি।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পতেঙ্গা থানার এসআই ফরিদুল আলম বলেন, ‘জবানবন্দিতে আসা সেই দশজনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই তাদের অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।’
পতেঙ্গা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ওসমান হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামি সিভিল অ্যাভিয়েশনের কর্মচারী ইব্রাহিম খলিল এবং গ্রেপ্তারকৃত অন্য আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক চোরাচালানে জড়িত সিভিল অ্যাভিয়েশনের দশ কর্মচারীর নাম প্রকাশ করে। চোরাচালানের গডফাদার দুবাই প্রবাসী রাসেলের দেওয়া ৩৭ হাজার সৌদি রিয়াল ওসমান (নিহত) ও অন্যরা মিলে আত্মসাৎ করেছে বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছে আসামিরা। কিন্তু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওই দশ আসামিকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করেননি।
আসামি ইব্রাহিম খলিলের দেওয়া জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঘটনার প্রায় এক মাস আগে ফটিকছড়ির মো. রাসেল ৩৭ হাজার সৌদি রিয়াল পাচারের জন্য ওসমান সিকদারের সঙ্গে চুক্তি করেন। ওই টাকার একটি অংশ বিমানবন্দরের বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়ে যায়। পরে রিয়াল ফেরত চান রাসেল। একপর্যায়ে ওসমান সংশ্লিষ্টদের নাম ফাঁস করার হুমকি দেন। পরে সালিশের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকার মধ্যে ৯ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়, বাকি টাকা দেওয়া হয়নি। ক্ষুব্ধ হয়ে ওসমানকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
পতেঙ্গা থানার একটি সূত্র জানায়, ৩৭ হাজার নয়, হুন্ডি ব্যবসায়ী দুবাই প্রবাসী মো. রাসেলের ৮৬ হাজার দিনার, রিয়াল ও দিরহাম আত্মসাৎ করে ফেলার দ্বন্দ্বে খুন হন মো. ওসমান সিকদার। হত্যাকা-ের আড়াইমাস আগে ওসমান সিকদারের সঙ্গে শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে মুদ্রাগুলো পাচার করানোর চুক্তি করেন ফটিকছড়ির রাসেল। পরে ওসমান রাসেলকে জানান, রিয়ালগুলো বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে নিয়ে গেছেন। ফলে কথামতো বিমানবন্দরের অভিবাসন পার হওয়া যাত্রীর হাতে সেগুলো তুলে দিতে পারেননি তিনি। এ নিয়ে ভিকটিমের বড়ভাই (মামলার বাদী) রাসেলের সঙ্গে সালিশ-দরবারও করেন। কিছু টাকা রাসেলকে ফেরতও দিয়েছিলেন ওসমান।
উল্লেখ্য, ওসমানকে খুনের ঘটনায় তার বড়ভাই এমরান সিকদার ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর মো. রাসেল, সিভিল অ্যাভিয়েশনের কর্মচারী ইব্রাহিম খলিল ও বাদল মজুমদারকে আসামি করে পতেঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন। ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর রাত আড়াইটার দিকে শাহ আমানত বিমানবন্দরের সিভিল অ্যাভিয়েশনের ‘চৈতালি’ নামের সরকারি কোয়ার্টারের প্রধান ফটক দিয়ে গাড়ি নিয়ে ঢুকে রাসেলসহ চারজন। ওসমানের কক্ষে ঢুকে তাকে মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন করা হয়। এরপর ওসমানের লাশ চরপাড়া আউটার রিং রোডের পাশে ফেলে দেওয়া হয়।