পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার ভোট কাল

তৃণমূল-বিজেপিতেই মূল লড়াই

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। রাজ্যের ২৯৪ আসনের মধ্যে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ১৫২ আসনে প্রথম দফার ভোট নেওয়া হবে। দ্বিতীয় দফায় ১৪২ আসনের ভোট ২৯ এপ্রিল। এবারের ভোটে মূল লড়াই হবে রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মধ্যে।

ভোটে এবারের পরিস্থিতি বেশ জটিল। তৃণমূল ও বিজেপির ঘোর সমর্থক ছাড়া কেউ জোর দিয়ে বলতে পারছেন না শেষ হাসি কে হাসবেন। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ নাকি মমতা-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

মমতাকে চতুর্থবারের মতো রাজ্যের ক্ষমতায় যেতে দিতে নারাজ বিজেপি। ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে বিজেপি এবার মমতাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করার পুরনো কৌশল বাদ দিয়ে নিয়েছে অন্য কৌশল। মমতার প্রশাসনকে অচল করতে তারা কেন্দ্রীয় বাহিনীকে এবার অনেক আগে রাজ্যে নিয়ে এসেছে। প্রশাসনিক স্তরে বহু অফিসারকে বদলি করেছে, যা তারা আগে করেনি।

জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ‘অনুপ্রবশের ন্যারেটিভ’ ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের বরাবরের হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণের কৌশলটি কাজে লাগাতেও কৌশলী দলটি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কয়েক দিন আগেই বলেছিলেন বাঙালিরা আর মুসলমানরা আলাদা। অর্থাৎ হিন্দু বাঙালির সঙ্গে মুসলমান বাঙালির একটা ফারাক তৈরি করতে চান তিনি।

বৃহস্পতিবার উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ১৬ জেলার ১৫২ আসনে ভোট। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, দুই চব্বিশপরগনা, নদিয়া ও পূর্ব বর্ধমান জেলার ১৪২ আসনে ভোট ২৯ এপ্রিল। ৪ মে যাবতীয় আগ্রহ, অপেক্ষা, উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার অবসান। ফল ওই দিনই।

গতকাল মঙ্গলবার ছিল প্রথম দফার ভোটের প্রচারের শেষ দিন। প্রচারপর্বের শেষ দিনে পশ্চিমবঙ্গে ঠাসা কর্মসূচি পালন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এদিন কার্শিয়াং, কুলটি, শালবনি ও চন্ডীপুর এই চার জায়গায় তিনি জনসভা করেছেন। এদিন তার বক্তব্যে প্রধান তোপ ছিল রাজ্যে অনুপ্রবেশকারী নিয়ে। গতকাল দুপুরে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি বিধানসভার চন্দ্রকোনা রোডের জনসভায় অমিত শাহ অনুপ্রবেশকারীদের তাড়িয়ে নতুন বাংলা গড়ার ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলার মমতা দিদি অনুপ্রবেশকারীদের আগলে রাখেন। অনুপ্রবেশ অসুরক্ষিত রাখে দেশকে। তাই অনুপ্রবেশকারীদের তাড়িয়ে নতুন বাংলা গড়তে হবে। ২৩ তারিখ কমল (পদ্ম) বাটন টিপে সেই কাজ শুরু করবে বাংলার মানুষ।”

জনতার উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘বাংলাকে অনুপ্রবেশমুক্ত করতে হবে কি হবে না? দিদি পারবেন? ভাইপো পারবেন? অনুপ্রবেশকারীদের যারা ঢুকিয়েছেন, তারা পারবেন না। বাংলার সীমানা ওরা খুলে রেখেছে। আমাদের জেতান। ৪৫ দিনের মধ্যে আমরা সীমানা বন্ধ করে দেব। অনুপ্রবেশকারীদের বলছি বাংলাদেশে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দিন।’

কার্শিয়াংয়ের জনসভায় অমিত শাহ বলেন, ‘পুরো পশ্চিমবঙ্গ ঘুরতে ঘুরতে আজ শেষ দিনে পাহাড়ে এসেছি। আমি আপনাদের বলছি এবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠিত হচ্ছে। আমাদের ওপর অত্যাচার করা মমতা দিদিকে টা টা বাই বাই করার সময় হয়ে গেছে।’

 গোর্খাদের উদ্দেশে অমিত শাহ বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠিত হওয়ার পরই ৬ মে প্রত্যেক গোর্খার মুখে সন্তুষ্টির হাসি থাকবে। আমরা এমন সমাধান বের করব। কংগ্রেস, তৃণমূল এরা সবাই দার্জিলিংয়ের সঙ্গে, আমার দেশভক্ত গোর্খা ভাইয়ের সঙ্গে অন্যায় করেছে। আমি ৯ বছর ধরে এখানে আসছি। আমি আপনাদের কথা দিয়ে যাচ্ছি, বিজেপির সরকার গঠিত হলেই এতদিন ধরে ঝুলে থাকা গোর্খা সমস্যার সমাধান করে যাব। গোর্খাদের মতো করেই সমাধান করব।’ তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের বুঝি। আপনাদের সমস্যাও বুঝি। তাই বিজেপি ছাড়া আর কেউ গোর্খা সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।’

উত্তরবঙ্গবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা একবার বিজেপির সরকার গঠন করে দিন। তিনটি নির্বাচন ধরে দার্জিলিং তো পদ্মফুলে ভোট দিচ্ছেই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাকি অংশ থেকে তেমন সমর্থন আসত না। এবার পুরো পশ্চিমবঙ্গ স্থির করে নিয়েছে, দিদিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় এসে গেছে।’

জরিপ বলছে হাড়ে হাড়ে লড়াই হবে : প্রচারের শেষ পর্যায়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যে আলোচনাটা প্রাধান্য পায়, তা হচ্ছে কে যাচ্ছে ক্ষমতায়। ভোটগ্রহণের দুই দিন আগেও এই অনিশ্চিত আবহের চিত্র ধরা পড়েছে ভারতের বিভিন্ন সংস্থার জরিপের ফলে। গতকাল মঙ্গলবার টাইমস অব ইন্ডিয়া বিভিন্ন জরিপ দলের এমন একটি কোলাজ প্রকাশ করেছে, যা সেই হেঁয়ালি ও রহস্য আরও প্রকট করেছে। কারও সমীক্ষায় তৃণমূল এগিয়ে, কারও মতে বিজেপি, কেউবা গায়ে গায়ে রেখেছে দুই শিবিরকেই।

যেমন ভারতের শীর্ষস্থানীয় জনমত জরিপ সংস্থা সি ভোটারকে সঙ্গে নিয়ে টাইমস নাউ ও এবিপি দুই গণমাধ্যম গোষ্ঠীই সমীক্ষা চালিয়েছে। দুজনেরই ফল এক রকম। ২৯৪ আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস পাচ্ছে ১৫৮, বিজেপি ১১৫, সিপিএম-কংগ্রেস ১৯। পি-মার্কের সমীক্ষাও প্রায় সি ভোটারের মতোই। তাদের সমীক্ষা দেখাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস ১৫৮, বিজেপি একটু বেড়ে ১২০, সিপিএম-কংগ্রেস সামান্য কমে ১৪। সরকার গড়তে প্রয়োজন ১৪৮ জনের সমর্থন।

ভারতের অন্যতম নির্ভুল বুথ ফেরত সমীক্ষা সংস্থা ইন্ডিয়া টুডে-অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার সমীক্ষা অনুযায়ী লড়াই হবে এবার ক্ষুরধার। তাদের হিসেবে বিজেপি ১৪৭, তৃণমূল কংগ্রেস ১৪৩, সিপিএম-কংগ্রেস মাত্র ২। রিপাবলিক-সিএনএক্সের ছবিও মোটামুটি একই রকম। বিজেপি ১৪৩, তৃণমূল কংগ্রেস ১৩৩, সিপিএম +১৬। ইটিজি রিসার্চ নামে এক সংস্থা তৃণমূলের হাসি চওড়া করার পক্ষে যথেষ্ট। তাদের মতে, মমতার দল পাচ্ছে ১৬৯, মোদির দল ১১০। ইপসোস সংস্থা তৃণমূলকে ১৫০ দিয়েছে, বিজেপিকে ১১৫, সিপিএম +১৯। পোলস্টার্ট সংস্থার হিসেবে তৃণমূলের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে বিজেপি। প্রথম জন ১৪৭, দ্বিতীয় জন ১৩০, সিপিএম +১৫ ।

তবে দুঃসাহসী ফল দেখিয়েছে ইন্ডিয়া টিভি গোষ্ঠী। তাদের সমীক্ষা অনুযায়ী বিজেপি পাচ্ছে ১৯২, তৃণমূল কংগ্রেস ৮৮, সিপিএম +১২টি। মনে রাখতে হবে, কিছু দিন আগেই রাজ্য নেতৃত্বকে অমিত শাহ বলেছিলেন তার হিসেবে জয় হবে ১৭৬ আসনে। সে জায়গায় ১৯২ অতিরিক্ত বোনাস পাওয়ার শামিল। ফল এমন হলে বিহারের এসআইআরকেও হার মানাবে পশ্চিমবঙ্গ। সে ক্ষেত্রে মোদি-শাহ নন, কলার তুলে হাঁটবেন একজনই জ্ঞানেশ কুমার।

এসব সমীক্ষার গড় করে পোল অব পোলস ত্রিশঙ্কু বা ঝুলন্ত বিধানসভার ছবি এঁকেছে। তৃণমূল ১৪১, বিজেপি ১৩৮, সিপিএম+ ১৩। ফল এমন হলে ইদানীং চালু হওয়া এক রসিকতা, যা কিনা প্রায় বিশ্বাসের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, তা প্রাধান্য পাবে। ‘ভোটে যারাই জিতুক সরকার গড়বে বিজেপি।’

 যেখানে তুমি গন্ডগোল করবে, আমি গিয়ে হাজির হবর : মমতা : মঙ্গলবার মমতাও বেশ কয়েকটি জনসভা করেছেন। জগদ্দলে সোমনাথ শ্যামের সমর্থনে নির্বাচনী সভা করেন তিনি। সেখান থেকেই বিস্ফোরক অভিযোগ করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘আমার কেন্দ্রের তিনটে ওয়ার্ড বেছে নিয়েছে, সেন্ট্রাল ফোর্সকে দিয়ে ছাপ্পা করাবে! তার মধ্যে ৭৭, ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড আছে। সেন্ট্রাল ফোর্সকে দিয়ে ছাপ্পা করাবে। এমন ধাপ্পা দেব না, বুঝবে ঠ্যালা। ধোঁকার ডালনা খাওয়াব। বিচুটি পাতার ঝোল খাওয়াব। তুমি আমাকে চেনো না। যেখানে তুমি গ-গোল করবে, আমি গিয়ে হাজির হব। তুমি আটকাও আমাকে! আমাকে তুমি ব্যান করবে? আমাকে ব্যান করলে সারা ভারত, সারা পৃথিবী দেখাবে!’