আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে বর্ষাকাল এখনো বিদায় না নিলেও বাংলা ঋতুতে এখন শরৎকাল (ভাদ্র মাসের ৩ তারিখ)। কিন্তু এই ভাদ্রে যেখানে টানা বর্ষণের প্রভাব কমে আসার কথা, সেখানে আচমকা আকাশ ফুটো হয়ে বৃষ্টি ঝরছে। মাত্র তিন ঘণ্টায় (পতেঙ্গা কেন্দ্রে সকাল ৬টা থেকে ৯টা) ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টির রেকর্ড বলে দিচ্ছে বৃষ্টির তীব্রতা কত বেশি ছিল। আর এই বৃষ্টিতেই ডুবে গেছে ১৪ হাজার ২৭৫ কোটি টাকায় নগরীর ৩৬ খাল সংস্কার ও সম্প্রসারণ, একটি নতুন খাল খনন, জোয়ারের পানি প্রবেশ ঠেকাতে ৩৯টি খালের মুখে রেগুলেটর (সøুইসগেট) স্থাপনসহ নতুন নতুন ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পের সুফল। নগরবাসী বন্দি হয় পানিতে। সঙ্গে ভেসে যায় জলাবদ্ধতা প্রকল্পগুলোর সুফল।
সাগরে সৃষ্ট একটি লঘুচাপের কারণে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল। এর প্রভাবে গত রবিবার টেকনাফ ও কক্সবাজার এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। টেকনাফের পর গতকাল সোমবার ভোর থেকে ভারী বৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রামে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত রবিবার রাত ১২টার পর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হলেও মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয় গতকাল ভোর ৬টা থেকে। এদিন ভোর রাত ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত পতেঙ্গা বিমানবন্দর কেন্দ্রে ১১ দশমিক ৬ মিলিমিটার ও আমবাগান কেন্দ্রে ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। কিন্তু ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত পতেঙ্গা বিমানবন্দর কেন্দ্রে ১০৯ মিলিমিটার ও আমবাগান কেন্দ্রে ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সকাল ৯টার পর বৃষ্টির তীব্রতা কমে আসে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পতেঙ্গা কেন্দ্রে ২৮ দশমিক ২ মিলিমিটার ও আমবাগান কেন্দ্রে ২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হওয়ার পর দিনভর আর বৃষ্টির দেখা যায়নি।
ভোরের বৃষ্টিতে পানিবন্দি হয়ে পড়ে নগর : কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর রোডের বাসিন্দা রুমা বড়–য়া বলেন, মধ্যরাতের পর থেকে বৃষ্টি শুরু হলেও সকালে মুষলধারে বৃষ্টি শুরুর পর থেকেই রাস্তায় পানি জমতে শুরু করে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তা কোমরসমান হয়ে যায় এবং ভবনগুলোর নিচতলা ডুবে যায়।
তিনি বলেন, শুধু কি নিচতলা? অনেক ভবনের পার্কিং পুরো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গাড়িগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, ৪ নম্বর রোডের ২৮ নম্বর বাড়ির গাড়ির পার্কিং স্পেসে তিনটি গাড়ি ডুবে আছে। বাড়ির কেয়ারটেকার জানান, এর আগে আরও একটি গাড়ি নষ্ট হয়েছে। সেই গাড়িটি গ্যারেজে দেওয়া হয়েছে। গতকাল ভোরে হঠাৎ বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় রাস্তায় পানি জমে জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করে এবং বুকসমান পানি জমে।
একই কথা বলেন রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী আল আকসা শাড়িজের ম্যানেজার গিয়াস উদ্দিন। তিনি বলেন, সকালের ভারী বৃষ্টিতে দোকানে পানি ওঠে। তবে সকাল ১০টার পর পানি নেমে গেলেও এই সময়ের মধ্যে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। অন্যদিকে আগ্রাবাদ মোগলটুলী বাজারের ব্যবসায়ী আকরাম হোসেন বলেন, ভোরে ভারী বৃষ্টি শুরুর পর সকাল ৭টার পর থেকেই পানি জমতে জমতে একপর্যায়ে তা হাঁটুসমান হয়।
এদিকে বৃষ্টিতে নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, পশ্চিম মাদারবাড়ি, হালিশহর কে ব্লক, এল ব্লক, ছোটপুল শান্তিবাগ, ইস্পাহানি রেলগেট, ওয়ারলেস মোড়, কাতালগঞ্জ, শুলকবহর, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, চকবাজার, জামালখান, রিয়াজউদ্দিন বাজারের তিনপুল ও তামামকুমু-ি লেন, অলংকার মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
কম সময়ে অধিক বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা : চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার প্রকল্পের পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বহদ্দারহাট থেকে বারইপাড়া পর্যন্ত এক হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় একটি নতুন খাল খননের প্রকল্প শেষ হয়েছে। অন্যদিকে সিডিএর দুই হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় চাক্তাই থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও সøুইসগেট নির্মাণের আওতায় ১২টি সøুইসগেট রয়েছে। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের আরেক প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৫০৮ কোটি টাকায় কর্ণফুলীর মোহনা থেকে উজানে মদুনাঘাট পর্যন্ত ২৩টি সøুইসগেট রয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৯টি সøুইসগেটে নগরীর খালগুলো থেকে কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ হওয়ার কথা। সব মিলিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলেও নগরবাসী মাত্র তিন ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে কেন জলমগ্ন হলো? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘গতকাল কম সময়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হয়েছে। সকালে যে সময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে, সেই সময়ে সাগরে জোয়ারও ছিল। তাই পানি নামতে পারেনি।’
কিন্তু সøুইসগেট থাকায় জোয়ারের পানিতে তো সমস্যা হওয়ার কথা নয়, এমন প্রশ্নের জবাবে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, জোয়ারের কারণে পানি নামতে একটু বিলম্ব হয়েছে। এ ছাড়া নগরীর অনেক রাস্তার পাশে সিটি করপোরেশন নালার কাজ করছে। এ কাজের জন্যও পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়, যাতে জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ বাড়ে।
কাল থেকে বৃষ্টি কমে আসবে : এদিকে সাগরের লঘুচাপটি স্থল নিম্নচাপ আকারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোকাস্টিং কর্মকর্তা শাহীনুল ইসলাম। তিনি বলেন, স্থল নিম্নচাপটি ভারতের উত্তর প্রদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৃষ্টির তীব্রতা আজ মঙ্গলবার থেকে কমে আসবে। তবে রংপুর ও দিনাজপুরে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়বে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১ মে, ২৯ ও ৩০ মে এবং ৭ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত সময়ে নগরীতে জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগ দেখা দিয়েছিল।