উড়োজাহাজ কেনার ক্রেতা নেই বাজারে!

 ১১ বছর ধরে পড়ে আছে শাহজালালে। কোম্পানিগুলোর কাছে পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকা

 দুশ্চিন্তায় বেবিচক : সিদ্ধান্ত নিতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৬ এএম

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উত্তর পাশে অ্যাপ্রোন এলাকায় বিশাল জায়গাজুড়ে পড়ে আছে পরিত্যক্ত ১২টি উড়োজাহাজ। প্রায় ১১ বছর ধরে বেসরকারি চারটি এয়ারলাইন্স কোম্পানির এই উড়োজাহাগুলোর গ্লানি টানছে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সংশ্লিষ্টদের বারবার চিঠি দিয়েও মিলছে না সমাধান। এদিকে অ্যাপ্রোন এলাকায় জায়গা দখল হওয়ায় ব্যস্ততম এই বিমানবন্দরটির অপারেশনাল কাজে ঘটছে ব্যাঘাত। চারটি কোম্পানির কাছে বেবিচক ৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা থাকলেও পরিশোধ দূরে থাক মালিকদের ধারে-কাছেও যেতে পারছে না সংস্থাটি। অন্যদিকে উড়োজাহাজগুলো বিক্রি করতে দেশি-বিদেশি ক্রেতা খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না।

অনেকটা হতাশ হয়ে গত ১৬ জুলাই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বেবিচক। চিঠিতে বলা হয়েছে ‘ক্রেতা না পেলে উড়োজাহাজগুলো ওজন দিয়ে বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই’। মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে সংস্থাটি। পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের খোঁজও চলছে।

জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, উড়োজাহাজগুলো বিক্রির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছি। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। তাছাড়া উড়োজাহাজ কোম্পানিগুলোর কাছে বিশাল অর্থ পাবে বেবিচক। এসব উড়োজাহাজের জন্য বিমানবন্দরে কাজের ব্যাঘাত ঘটছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, গলার কাঁটা হিসেবে শাহজালাল বিমানবন্দরের মূল্যবান অ্যাপ্রোন এলাকায় ১১ বছর ধরে পড়ে আছে ১২টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করেছে বেবিচক। এগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিমান হিসেবে বিক্রি করতে উপযুক্ত ক্রেতা না পাওয়ায় ওজনে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেবিচক। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ভিত্তিমূল্য নির্ধারণে যা ব্যয় হবে উড়োজাহাজ বিক্রি করে তা পাওয়ার সম্ভাবনাও কম। তারপরও চেষ্টা চলছে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেতে।

বেবিচক সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডর আবু সাঈদ মেহবুব খান দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। এগুলো ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলামে তোলার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। মূল্য নির্ধারণে যে ব্যয় হবে, বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। বাস্তবে এগুলো এখন স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে।’

যে কারণে মিলছে না ক্রেতা : বকেয়া আদায়ের নিমিত্তে পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত ও নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করে বেবিচক। ২০২১ সালের শেষের দিকে ও ২০২২ সালজুড়ে বেবিচক উড়োজাহাজগুলো নিলামের জন্য আন্তর্জাতিক ও দেশীয় দরপত্র আহ্বান করে। তবে একাধিকবার নিলামের চেষ্টা হলেও কোনো উপযুক্ত ক্রেতা মেলেনি। ক্রেতা না পাওয়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।  উড়োজাহাজগুলো ১০ থেকে ১১ বছর ধরে রোদ-বৃষ্টিতে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এগুলোর ইঞ্জিন, এভিয়নিক্স সিস্টেম, ককপিটের যন্ত্রপাতি এবং ল্যান্ডিং গিয়ার নষ্ট ও মরিচা ধরে অকেজো হয়ে গেছে। এগুলোকে পুনরায় উড্ডয়নের উপযোগী করা অর্থনৈতিকভাবে কোনোভাবেই লাভজনক নয়। তাছাড়া উড়োজাহাজগুলোর বেশিরভাগই পুরনো মডেলের (ড্যাশ-৮, এমডি-৮৩, বোয়িং ৭৩৭-৩০০)। বিশ্বব্যাপী এই মডেলগুলোর ব্যবহার এখন সীমিত। ফলে এগুলোর ভেতরে থাকা সচল যন্ত্রাংশ খুলে অন্য কোনো উড়োজাহাজে ব্যবহার বা যন্ত্রাংশ হিসেবে বিক্রি করার বাজারও প্রায় নেই বললেই চলে। মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাংকঋণ ও অন্যান্য পাওনাদারের মামলা রয়েছে। ফলে কোনো ক্রেতা আইনি ঝামেলা এড়াতে এগুলো কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না কেউ।

যেসব কোম্পানির উড়োজাহাজ আছে পড়ে : বকেয়া আদায়ের লক্ষ্যে উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রির চেষ্টা করা হলেও কোনো ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যবান জায়গা দখল করে থাকা এই উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে এবং কার্গো ভিলেজের সম্প্রসারণ কাজে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। কার্গো ভিলেজের উত্তর পাশে বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বন্ধ হয়ে যাওয়া চারটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ১২টি উড়োজাহাজ। তার মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ৮টি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ২টি, জিএমজি এয়ারলাইন্সের ১টি ও অ্যাভিয়েন চ্যার্টারে ১টি উড়োজাহাজ। কোম্পনির কর্ণধাররা প্রভাব খাটিয়ে অ্যাপ্রোন এলাকার জায়গা দখলে নিয়ে উড়োজাহাজগুলো রেখেছেন।

আদায় করা যাচ্ছে না ৪ হাজার কোটি টাকা : উড়োজাহাজগুলো বন্ধ হওয়ার পর থেকেই শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে মূল্যবান জায়গা দখল করে পড়ে রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এগুলো পার্ক করে রাখায় বেবিচকের নিয়ম অনুযায়ী পার্কিং ফি এবং তার ওপর অতিরিক্ত সারচার্জ যুক্ত হতে থাকে। বেবিচকের হিসাব শাখা সূত্রে জানা যায়, বকেয়া এবং চক্রবৃদ্ধি হারের সারচার্জ মিলিয়ে এই চার কোম্পানির কাছে বেবিচকের মোট পাওনার পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছেই পাওনা রয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে বকেয়া প্রায় ৪০০ কোটি টাকা এবং বাকি টাকা রিজেন্ট ও অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের বকেয়া।

প্রায় ২ লাখ বর্গফুট এলাকা দখল : নিলামের মাধ্যমে উড়োজাহাজগুলো বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়ে বেবিচক কর্তৃপক্ষ উদ্বেগের মধ্যে পড়েছে। একদিকে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আদায় আটকে রয়েছে, অন্যদিকে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল  চালুর পর কার্গো হ্যান্ডলিং ও অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য এই জায়গাটি দ্রুত খালি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। উড়োজাহাজগুলো এক লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট এলাকা দখল করে রেখেছে। বিমানবন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল এলাকা। এখান থেকেই কার্গো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। উড়োজাহাজ পার্কিংও করতে হচ্ছে। ফলে নিয়মিত ও অনিয়মিত উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। রপ্তানি পণ্য ওঠানামাও ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি কার্গো পরিচালনায় চাপ বাড়ছে। বিমানবন্দরের সক্ষমতাও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অ্যাপ্রোনের মতো মূল্যবান জায়গা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে রপ্তানি কার্যক্রম বাড়লে এই সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে।  প্রচলিত আইন অনুযায়ী উড়োজাহাজগুলোর নিবন্ধনও বাতিল হয়ে গেছে।

মন্ত্রণালয়ে বিশেষ চিঠি : গত ১৬ জুলাই সংস্থাটির চেয়ারম্যান বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে বেবিচক এই কাজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সহযোগিতা চেয়েছে। কিন্তু দেশে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উড়োজাহাজ মূল্যায়নে সক্ষম কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নেই। বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে মূল্যায়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়। কিন্তু তাতে যে ব্যয় হবে, তা সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্যের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বেবিচকের ধারণা, উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র হলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতামূলকভাবে অংশ নেবে। এতে বাজারভিত্তিক মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে, একই সঙ্গে সরকারের জন্য সর্বোচ্চ দর নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

একসময় ছিল কোম্পানিগুলোর দাপট : একসময় দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করা এই এয়ারলাইন্সগুলো আর্থিক লোকসান, অব্যবস্থাপনা ও ঋণে জর্জরিত হয়ে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। জিএমজি এয়ারলাইন্স ২০১২ সালে তাদের ফ্লাইট অপারেশন স্থগিত করে। এরপর ২০১৬ সালে বন্ধ হয়ে যায় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ এবং ২০২০ সালের মার্চে করোনাকালীন সংকটের শুরুতে বন্ধ হয় রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। কোম্পানির মালিকরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বেবিচকের টাকা ও ঋণ পরিশোধ করেনি। দফায় দফায় তাদের চিঠি দিয়েও কাজে আসেনি।

বেবিচকের উদ্বেগ-দফায় দফায় চিঠি : সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য কোম্পানিগুলোকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৩০ দিনের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হলেও কাজ হয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উড়োজাহাজ অপসারণ না করলে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রির কথা বলা হয়। পরে বিষয়টি সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয় এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত নেওয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, বন্ধক গ্রহণকারী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত