নিষিদ্ধ না হয়েও ওরা পতনমুখী

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের দেড় দশকের ক্ষমতার অবসান ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ফ্যাসিবাদী আচরণের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুতির পর রাজনীতি করার অধিকার হারাতে হয়েছে উপমহাদেশের অন্যতম এ রাজনৈতিক দলকে। ২০২৫ সালের ১০ মে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগের। সর্বশেষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এ নিষিদ্ধের অধ্যাদেশকে সংসদে আইনে পরিণত করে সেটাকে স্থায়ী করে নেয়। এর ফলে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করার আর কোনো সুযোগ নেই আওয়ামী লীগের।

এদিকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম আইন করে নিষিদ্ধ করা হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইন বা কোনো অধ্যাদেশ ছাড়াই আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে চিহ্নিত আরও ১০টি রাজনৈতিক দলেরও একই পরিণতি ঘটেছে। ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত সেসব দলের কেউই রাজনীতির মাঠে ফিরতে পারেননি। নিবন্ধন থাকলেও গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নিতে পারেনি এদের মধ্যে বেশিরভাগ দল।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজনীতি করার অপরাধে সেসব দলকেও অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেসব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা কারাভোগও করছেন দীর্ঘদিন ধরে। দলগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় পার্টি। আছে জাতীয় পার্টি (মঞ্জু), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, গণ আজাদী লীগ, সাম্যবাদী দল, গণফোরাম ও তরিকত ফেডারেশন। দলগুলোর বেশিরভাগই দেশের রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ধারার রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে অধিক পরিচিত।

বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে নানা মতও আছে। অনেকে মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার অংশ হিসেবেই এটা ঘটেছে। আবার অনেকে মনে করেন আওয়ামী লীগের অন্ধ সমর্থক হওয়ার কারণেই উল্লেখিত দলগুলোর এ পরিণতি হয়েছে। তবে দল নিষিদ্ধ না করে অভিযোগের বিচারের পক্ষেও অনেকের মত রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আরও অনেক দলকে ভুক্তভোগী হতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে একদলীয় শাসনব্যবস্থার ফলে রাজনীতির প্রতি এক ধরনের ভীতিরও সৃষ্টি হয়েছে। তার মতে, অপরাধের বিচার হতেই হবে। তবে দল হিসেবে সব দলেরই রাজনীতি করার অধিকার থাকতে হবে। গণতন্ত্র বিকশিত করতে চাইলে দলগুলোকে রাজনীতি করতে দিতে হবে। নানা কৌশলে বঞ্চিত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা অসম্ভব।

অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গী হয়েছে, অন্ধ সমর্থন দিয়েছে, লুটপাটের সহযোগী হয়েছে বলেই আরও অনেকগুলো দল পতনমুখী হয়েছে। তবে একেবারেই পতন ঘটেছে ব্যাপারটা তেমন নয়। সরকার যখন জনপ্রিয়তা হারায়, ব্যাপারটা তখন বিপর্যয় ঘটায়। তিনি বলেন, এ সরকারকে সুষ্ঠু ও দেশপ্রেমিক রাজনীতি করতে হবে। সঠিকভাবে রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। না হলে আবার বিপর্যয় ঘটতে পারে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথম দিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে লেজুড়ভিত্তি করার দায়ে বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। জনগণের রোষের ফলে সেসব দল যেখানেই নেমেছে, প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। তবে এখন একই রকম বাধার মুখে পড়বে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সেটা মনে হয় না। আগের মতো করে এখনো রাজনৈতিক দলগুলো বাধার মুখে পড়লে সেটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা হবে বলে তিনি মনে করেন।

জাতীয় পার্টি প্রায় এক দশকের কাছাকাছি সময় রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। তবে ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে দলটি। ক্ষমতার বাইরে গেলেও সাড়ে চার দশকের পুরনো দল জাতীয় পার্টি টানা তিনবার জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেছে। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের শক্তির বাধার মুখে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টিরও পতন ঘটে। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিস্ট তকমা দিয়ে নতুন উত্থান ঘটা জুলাই-আগস্ট শক্তি জাতীয় পার্টিকেও দফায় দফায় প্রতিরোধের মুখে ফেলে। কয়েক দফায় দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আওয়ামী লীগের মতো করেই এরশাদের হাতে গড়া দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা ও পুলিশি হামলা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বাসভবনে হামলা ও তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে জুলাই-আগস্ট শক্তি। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির হাল ধরেন তার ছোট ভাই জিএম কাদের। সর্বশেষ দেশি-বিদেশি নানা চাপে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও এবার কোনো আসন পায়নি পতনের কাছাকাছি চলে যাওয়া জাতীয় পার্টি।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, জোর করে কোনো রাজনৈতিক দলের পতন ঘটানো যায় না। ৫ আগস্টের পর জুলাই-আগস্ট শক্তি বহু রকমে চেষ্টা করেছে জাতীয় পার্টিকে ধ্বংস করে দিতে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বী না রাখার রাজনীতি করতে চেয়েছে জুলাই-আগস্টের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়া নতুন শক্তি। এরই ধারাবাহিকতায় অন্য দলকে রাজনীতির বাইরে রেখে যা খুশি তাই করতে চেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ‘নতুন সরকারও তাই করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা না রাখার রাজনীতি করছে। মানে শর্টকার্ট ওয়েতে রাজনীতি করা ও টিকে থাকা। এর পরিণতি ভালো হয় না।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৫ আগস্টের ছাত্র আন্দোলন দক্ষিণপন্থিরা ক্যু করে নিয়ে গেছে। এ দক্ষিণপন্থিরা হলো মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। ৫ আগস্টের পরে এ দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক-বাহকদের নির্মূল করতে পরিকল্পনা নেয়। তিনি বলেন, এরই অংশ হিসেবে ৫ আগস্ট কাজে লাগিয়ে ফ্যাসিস্ট তকমা দিয়ে রাজনীতির মাঠ থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্য সব শক্তিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবে এ কাজ করছে। এটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৫ আগস্ট কালার রেভ্যুলশনের মধ্য দিয়ে এ দেশে ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে। নির্বাসনে যাওয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তারই অংশ হিসেবে প্রতিক্রিয়াশীল, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি চালকের আসনে বসে গেছে।’

তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মনে করে, ক্ষমতা নির্বিঘ্ন করতে হলে আওয়ামী লীগকে বিদায় করলেই চলবে না। অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্য শক্তিগুলোকেও দুর্বল করতে হবে। তিনি বলেন, ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে দেশ, জাতি ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির। আরও বহুদিন বাংলাদেশকে ভুগতে হবে।

ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নূর আহমেদ বকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির উত্থান ঘটেছে। সে গোষ্ঠীর উত্থানের ফলে দেশে আদর্শিক ফাইট শুরু হয়েছে। সে ফাইটে মুক্তিযুদ্ধ পক্ষের শক্তি, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল শক্তি অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। কারণ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর যুদ্ধ একাত্তর ভারসেস একাত্তর। তাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক করে স্বৈরাচারের দোসর বলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বাকি যে শক্তি রয়েছে, তাদের ধ্বংস করতেই এ ষড়যন্ত্র।