আলো-ছায়ার ব্যবহার, নীরবতার ভাষা, সময়ের গতি ও সংগীতের অসাধারণ প্রবাহ- সবকিছুর এক মনোমগ্ধকর মিশ্র ছিল তার সিনেমায়। সত্যজিৎ রায় শিখিয়ে গেছেন, ক্যামেরা শুধু ছবি তোলে না, জীবনকেও নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। সেই ব্যাখ্যা যদি সত্য হয়, তবে তা সময়ের সীমা ছাড়িয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে। আজও তিনি শুধু একজন নির্মাতা নন; তিনি এক অনুভব, এক দর্শন, এক অবিনাশী আলো।
উপমহাদেশের কিংবদন্তি এই চলচ্চিত্রকারের প্রয়াণ দিবস। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল হৃদযন্ত্রের জটিলতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিশ্বখ্যাত এ নির্মাতা। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি ছিলেন চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সংগীত পরিচালক ও লেখক—এককথায় বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘মানিক’ নামে। ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতার খ্যাতনামা রায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা ছিলেন প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায় এবং মা সুপ্রভা দেবী। যদিও জন্ম কলকাতায়, তবে রায় পরিবারের আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া গ্রামে।
চলচ্চিত্র জগতে সত্যজিৎ রায়ের অভিষেক ঘটে ১৯৫৫ সালে নির্মিত ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমার মাধ্যমে। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায় এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’সহ মোট ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করে। এরপর ধারাবাহিকভাবে তিনি নির্মাণ করেন একের পর এক কালজয়ী সিনেমা।
তার নির্মিত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘অপরাজিত’, ‘অপুর সংসার’, ‘পরশপাথর’, ‘জলসাঘর’, ‘তিন কন্যা’, ‘দেবী’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘ঘরে-বাইরে’, ‘চারুলতা’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘নায়ক’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয় বাব ফেলুনাথ’, ‘গণশত্রু’, ‘শাখা-প্রশাখা’, ‘আগন্তুক’ ইত্যাদি। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি পূর্ণদৈর্ঘ্য, প্রামাণ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য মিলিয়ে মোট ৩৭টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
চলচ্চিত্রের ভাষাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এ নির্মাতা শুধু ভারতীয় নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও এক অনন্য নাম। মৃত্যুর এত বছর পরও তার কাজ, ভাবনা ও নির্মাণশৈলী আজও অনুপ্রেরণা হয়ে আছে নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে।