গণতান্ত্রিক রাজনীতির জয় অনিবার্য!

যেভাবে ইচ্ছে বলতে পারেন। ‘মর্নিং শো’স দ্যা ডে’ অথবা হাঁড়ির একটা চাল টিপলেই বুঝবেন ভাত সেদ্ধ হয়েছে কিনা...। মোদ্দাকথা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফা ভোটের ট্রেন্ড দেখলে পরিষ্কার যে, বিজেপির পক্ষে এবারও বঙ্গজয় অধরা থেকে গেল। বঙ্গের ইতিহাসে দেখবেন, কোনো দিনই আর্যাবর্তের পক্ষে বঙ্গজয় মোটেও সহজ ছিল না। ফলে গো-বলয়ের দল, বিজেপি যত লম্ফঝম্প করুক, ভোটের হাওয়া দেখে মনে হচ্ছে যে, তাদের পক্ষে সুবিধা হবে না জেতা। হতে পারে এত তাড়াতাড়ি এ রকম ভবিষ্যৎবাণী করা বেশ ঝুঁকির। তবু মুর্শিদাবাদ, বীরভূম থেকে যেটুকু যা খবর পাচ্ছি, তাতে সাধারণ মানুষের বড় অংশ বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করছে। তৃণমূল কংগ্রেস ফের ক্ষমতা দখল করলেও বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে তাদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। যতটা বিজেপি থেকে, তারচেয়ে বেশি বাম, কংগ্রেসের কাছ থেকে। মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা, ভগবানগোলা, ডোমকল, জলঙ্গী, রানীনগর, শামসেরগঞ্জ, বহরমপুর সব জায়গাতেই হয় তৃণমূল, না হয় বাম কিংবা কংগ্রেস জিততে পারে। বিজেপি তৃতীয় স্থান পাবে। বহরমপুর কেন্দ্রে খুব কিছু অঘটন না ঘটলে নিঃসন্দেহে কংগ্রেসের হেভিওয়েট প্রার্থী অধীর চৌধুরী জিততে চলেছেন।

ট্রেন্ড দেখে মনে হচ্ছে যে, দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের যে তৃণমূল বনাম বিজেপি বাইনারি, কিছুটা হলেও তা বদলাতে পারে। যদিও পরিষ্কারভাবে একটা কথা বলা দরকার অনেক বছর ভোট দেখছি, এ রকম লজ্জাজনক পরিস্থিতি কখনো দেখিনি। পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাকে লাটে তুলে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে ভারতের গণতন্ত্রের যাবতীয় স্তম্ভ, মিডিয়া ও অন্যান্য সবাই যেভাবে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপরেই আঘাত হানছে, তা উদ্বেগজনক। এবারের মতো কখনো দেখিনি রাজনৈতিক দল তো বটেই, খোদ দায়িত্বশীল হেভিওয়েট নেতাদের এবারের মতো খোলাখুলিভাবে সাম্প্রদায়িক তাস খেলতে। বিজেপির মূল রাজনৈতিক ইস্যুই হচ্ছে যত না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে, তারচেয়ে অনেক বেশি বাংলাদেশের অনুপ্রবেশ নিয়ে। এ রাজ্যে নাকি কয়েক কোটি রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে। ফলে চাপ পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। সুতরাং গণতন্ত্র বাঁচাতে লাখ লাখ অনুপ্রবেশকারীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে তো হবেই। এরপর অবৈধভাবে এ দেশে ঢোকা লোকজনকে পুশ-ব্যাক করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশন এসআইআর করে ইতিমধ্যে অন্তত ২৭ লাখ লোকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। বলা বাহুল্য, তার অধিকাংশই সীমান্ত জেলাগুলো থেকে যেভাবে বেছে বেছে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তার প্যাটার্ন দেখলে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। বোঝা যায়, পরিকল্পনার পেছনে রহস্যজনক কারণ রয়েছে। তা বিস্তারিত বলে আর বিপদে পড়তে চাই না। শুধু তালিকাগুলো দেখুন মুর্শিদাবাদ জেলায় শামসেরগঞ্জ, লালগোলা, ভগবানগোলা, রঘুনাথগঞ্জ, ফারাক্কা, সুতি ও জঙ্গিপুর থেকে বাদ গেছে যথাক্রমে ৯১,৭১২, ৬৮ ও ৪৭৫। বাকি তিনটি বিধানসভা কেন্দ্র রঘুনাথগঞ্জ ফারাক্কা, সুতিতে বাদ গেছে ৬১, ৯৯৫ ও ৫৪, ৭১৫ ও ৫৪, ৪১৫ এবং একই জেলার জঙ্গিপুর থেকে প্রায় ৫০ হাজার। মালদাহ জেলার রতুয়া থেকে ৫৬, ৫৬৩ ও মোথাবাড়িতে বাদ পড়েছেন ৪৭, ৪৮৪ জন।

অনুপ্রবেশ করে ভারতে এসেছেন সন্দেহে বাদ গেছে মুর্শিদাবাদ জেলার সাবেক নবাব পরিবারের নামও! কমিশন প্রথমে বলেছিল যে, ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় নাম থাকলে তাকে আর কোনো কাগজপত্র না দেখেই ভোটের অধিকার দেওয়া হবে। পরে রহস্যজনকভাবে ছক বদলে লাখ লাখ লোকের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হলো। সেই তালিকায় এমনও হয়েছে ছেলের নাম আছে, অথচ বাবার নেই। এক পরিবারের তিনজন সদস্য। বাদ গেছে একজন। জমির দলিল ১৯০১ সালের। সেও বাদ। আবার মাত্র কিছুদিন আগে আসা ওপারের লোক, তালিকায় নাম উঠেছে নির্বিঘেœ। সংবিধানের প্রচ্ছদ শিল্পী বিখ্যাত নন্দলাল বসুর পরিবারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এই বাদ দেওয়া নিয়ে বিস্তারিত পরে লিখব। ভোটার তালিকায় নাম নেই জেনে কত কত লোক এর মধ্যেই আত্মহত্যা করেছেন, ভাবলেই বুক কাঁপে। কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে, দিনের পর দিন ধরনায় আছেন নাম বাদ যাওয়া মানুষ ও তাদের সহমর্মীরা। তাদের ফেলে রেখেই ভোট হচ্ছে। কেউ জিতবে, কেউ হারবে। কিন্তু লাখ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাবেন। তারা তাদের পরিবার জানবেন চরম বিপদের দিনে সহনাগরিকদের বড় অংশ ‘গণতন্ত্রের উৎসবে’ তাদের বাদ দিয়েই অংশ নিলেন। এ নিয়ে অবশ্য ভিন্নমত আছে। রাজনীতিক ও অন্যান্য নাগরিকের একটি অংশ মনে করে যে, লাখ লাখ লোকের নাম বাদ দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র চলছে, এর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়াই হচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ খুলে দেওয়ার একমাত্র অস্ত্র। হতে পারে, সেই অস্ত্র প্রয়োগ করতেই প্রথম দফা ভোটে বিপুল ভোট পড়েছে বুথে বুথে। সাধারণভাবে বিপুল ভোট পড়ে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার কারণে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারে থাকা দল বা সরকারের বিপক্ষে মানুষের ক্ষোভের বহির্প্রকাশ ঘটে ভোটবাক্সে। কিন্তু এবারের ভোটে জেলায় জেলায় যে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের ঢল নেমেছে ভোট দিতে। তাতে মনে হচ্ছে যে, পুরোপুরি কেন্দ্র, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এবং কিছু ক্ষেত্রে আদালতের কোনো কোনো রায়ের বিরুদ্ধেও মানুষের ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটেছে। গত কয়েক মাস ধরে কমিশনের একাধিক সিদ্ধান্ত আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সরকারে আসীন দলের পক্ষপাতিত্ব করা ছাড়া কমিশনের অন্য কোনো কাজ নেই। যাদের নাম বাদ গেছে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য আজও শোনা যায়নি সরকার ও কমিশনের কাছ থেকে। বরং একের পর এক সিদ্ধান্ত ও বিবৃতি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। বিজেপির একাধিক রাজ্যের প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রীরা এই আতঙ্ক বাড়াতে সমানে ইন্ধন জুগিয়েছেন। বিহারের বিজেপি নেতা ঘোষণা করেছেন যে, তাদের রাজ্যে ভোটের তালিকা থেকে বাদ যাওয়া ২২ লাখ লোকের রেশন কার্ড ইতিমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। ফলে আতঙ্ক ছড়িয়েছে জনমনে।

অনেক জেলার লোকদের নাম বাদ গেছে, ফলে নাগরিকত্ব যাবে এ আশঙ্কায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্ত্রী বা সন্তানের নামে ট্রান্সফার করতে লাইন দিয়েছেন। কেউ কেউ সস্তা দরে জমি বিক্রি করে সামনের দিনে কোথাও চলে যেতে হবে ভেবে হাতে টাকা রেখেছেন। এসব নিয়ে অন্যান্য সমস্যা, ফটকাবাজি, সিন্ডিকেট, ব্যাংকে মন্দা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। যাদের নাম বাদ গেছে, তাদের আজও কি পরিমাণ উদ্বেগ, আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে, তা পরিমাপ করা কোনো এআইয়ের পক্ষেও সম্ভব নয়। কমিশন নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের পুলিশ থেকে আমলাদের যেভাবে বদলি করেছেন, তাও নজিরবিহীন। কার্যত এ মুহূর্তে রাজ্যসরকার নিছক ঠুঁটো জগন্নাথ। বিন্দুমাত্র ক্ষমতা নেই। এ রাজ্য চলছে কমিশন, ব-কলমে কেন্দ্রীয় সরকারের মর্জিমাফিক। আড়াই লাখ আধাসামরিক বাহিনী দিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে মুড়ে ফেলা হয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সাঁজোয়া বাহিনীর গাড়ি দেখে কখনো কখনো গুলিয়ে যাচ্ছে আমরা বঙ্গে না যুদ্ধ বিধ্বস্ত কোনো রণাঙ্গনে বসে আছি? গো-বলয়ের নেতাদের বাঙালি সাজতে চাওয়া আরেক বিড়ম্বনা। কেউ বলছেন যে ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’। বলছেন তো বলছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে নেতাজির কথা স্বামীজির নামে চালাচ্ছেন। কেউ তরুণ গায়ক সাহানা বাজপেয়ি সারা পৃথিবীতে রবীন্দ্রসংগীত কে জনপ্রিয় করেছেন বলছেন, কেউ আবার হাতে মাছ নিয়ে চলেছেন বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে। অথচ এই বিজেপিই বিভিন্ন রাজ্যে মাছ বন্ধের ফতোয়া দেয় নানাভাবে।

ভোট বড় বালাই। তাই বাঙালি হতে চাওয়া। কিন্তু ময়ূরপুচ্ছধারীদের ওপর আস্থা রেখে বাঙালিরা ফিরছেন, তা হলফ করে বলতে পারছি না। তবে তৃণমূল জিতবে এটা বলা যায়। যদি কমিশন বা কেন্দ্রীয় সরকারের গভীর কোনো মতলব না থাকে। তৃণমূল কংগ্রেস জিতবে, তার বড় কারণ নিশ্চিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি। তার ওয়েলফেয়ার ইকোনমির প্রতি রাজ্যের গরিব লোকদের অটুট আস্থা। তবে এবারের ভোটে বাম, কংগ্রেস কিছুটা হলেও হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার করবে বলে মনে হয়। বাম রাজনীতি নিয়ে আলাদা করে লেখার ইচ্ছে থাকল। বামদের মধ্যে খুব সামান্য হলেও পশ্চিমবঙ্গে প্রাসঙ্গিক হতে চলেছে সিপিআইএমএল (লিবারেশন)। তাদের প্রার্থী বাছাই থেকে বক্তব্য নতুন করে বাম রাজনীতিকে অক্সিজেন দিতে পারে ভবিষ্যতে। একটা কথা মনে হচ্ছে যদি কোনোভাবে বিজেপি জিতেও যায়, আগামী দিনে হাজার দমনপীড়ন করেও বাংলাকে সে পুরোপুরি বশে রাখতে পারবে না। আগামী ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা নির্বাচন এবং ৪ মে চূড়ান্ত ফল জানা যাবে।

লেখক: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

sdastidar 27 @gmail. com