যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে চান ৪০ শতাংশ ভারতীয়

উন্নত ও সচ্ছল জীবনের আশায় ‘আমেরিকান ড্রিম’ শব্দযুগল বিশ্বজুড়ে খুবই পরিচিত। এই স্বপ্নের টানে হাজারো মানুষ পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। তবে সম্প্রতি নতুন এক জরিপে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেওয়া লাখো ভারতীয়র এই স্বপ্নে ফাটল ধরেছে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকের মধ্যে ৪ জন এখন যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এক সময় যারা ডলারে আয় করা ও সিলিকন ভ্যালিতে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখতেন, তারাই এখন দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

২০২৬ সালের এই প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে পরিচালিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ কাজ করছে। জরিপে দেখা গেছে, ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা নিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার কথা ভাবেন আর ২৬ শতাংশ মাঝেমধ্যে এ নিয়ে চিন্তা করেন। সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি নিয়ে হতাশা; ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা এটি উল্লেখ করেছেন। এরপরই রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ (৫৪ শতাংশ) এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা (৪১ শতাংশ)। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ৫২ লাখের বেশি ভারতীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসী বসবাস করছেনএই প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.৫ শতাংশ হলেও ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা দেশটির মোট কর রাজস্বে প্রায় ৬ শতাংশ অবদান রাখেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয়দের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো অভিবাসন প্রক্রিয়ার জটিলতা। কিছু প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়দের গ্রিন কার্ড পেতে ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষা, এইচ-১বি ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও প্রতিটি ধাপে অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্রের চাপ পরিবারগুলোকে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দিচ্ছে না। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভেঙে পড়া অভিবাসন ব্যবস্থাই’ দক্ষ ভারতীয়দের কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে চলে যাওয়ার প্রধান কারণ হয়ে উঠছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র হয়েছে। পুরো ৭১ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিক ট্রাম্পের কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি এবং সমাজে নিজের জায়গা নিয়ে অনিশ্চয়তা ভারতীয়দের মধ্যে গভীর অস্বস্তি তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু নীতিমালা এমন বার্তা দিয়েছে যে ‘যুক্তরাষ্ট্র শুধু যুক্তরাষ্ট্রে জনগণের জন্যই’, যা ভারতীয়দের মধ্যে নিজেদের পরিচয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসছে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকরা এককভাবে কোনো একটি দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডেমোক্র্যাটিক, রিপাবলিকান উভয় পক্ষের প্রতিই আস্থা কমছে ভারতীয়দের। এক সময় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দৃঢ় সমর্থক ছিলেন ভারতীয়রা। কিন্তু এখন সেই সমর্থন কমে গেছে। ২০২০ সালে যেখানে ৫২ শতাংশ ভারতীয় নিজেদের ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দিতেন, এখন তা কমে ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রিপাবলিকান পার্টিও তাদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। তাদের সমর্থন ১৯ শতাংশেই স্থির রয়েছে। ফলে প্রায় ৩০ শতাংশ ভারতীয় এখন ‘স্বতন্ত্র’ বা দলনিরপেক্ষ রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে ঝুঁকছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতীয়রা এখন দল নয়, বরং নিজেদের জীবিকা, পারিবারিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।