আফগানিস্তানে মানবাধিকার সংকট চরমে

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৯ এএম

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর বিদায়ের মধ্য আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে তালেবান। নিয়ন্ত্রণ নিয়েই দেশটিতে কঠোর শরিয়াভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে তালেবান সরকার। গত শনিবার আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে তালেবান পুরো আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, সশস্ত্র বিদ্রোহ দমন করেছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটা স্থিতিশীল করেছে। কিন্তু এই স্থিতিশীলতার আড়ালে তৈরি হয়েছে গভীর মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট। নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা, বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়া, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং দারিদ্র্য তালেবান শাসনের বড় ব্যর্থতা হয়ে উঠেছে। তালেবান শাসনের পাঁচ বছরে আফগানিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের অনুপস্থিতির কারণে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিগত বছরগুলোতে নারীদের স্বার্থবিরোধী শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করেছে তালেবান সরকার। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও চলাফেরার ক্ষেত্রে আরোপ হয়েছে নানা বিধিনিষেধ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটিতে মাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ২৫ লাখের বেশি নারী শিক্ষার্থী। বিবিসি জানিয়েছে, তালেবানের কট্টরপন্থি শাসন দেশটির প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ নারীর অধিকার ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করে এনেছে। চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে পুরুষ অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণে কড়াকড়ি এবং বাল্যবিয়ে উৎসাহিত করার মতো একের পর এক নিয়ম। জাতিসংঘে ডেনমার্কের প্রতিনিধি ক্রিস্টিনা মার্কাস লাসেন বলেন, ‘আফগানিস্তান বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে মেয়েরা মাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আমরা এমন এক ভবিষ্যতের আশা করছি, যেখানে সব আফগান নাগরিক মৌলিক অধিকার, স্বাধীনতা ও সমান মর্যাদা ভোগ করতে পারবে।’ শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বন্ধের প্রভাব সরাসরি পড়েছে দেশটির স্বাস্থ্যসেবা খাতে। আফগানিস্তানে প্রতি ৪ হাজার ৫০ জন নারীর বিপরীতে মাতৃত্বকালীন সেবা দেওয়ার জন্য মাত্র একজন ধাত্রী রয়েছেন। পুরুষ চিকিৎসকের কাছে নারী রোগীদের চিকিৎসা নেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ থাকায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন অনেকে।

তালেবানের এমন দমন-পীড়নের নীতি আর আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা যেন এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে আফগানিস্তানকে। কাবুলের বাসিন্দা ইলার কাছে জীবনের সংজ্ঞাটাই এখন বদলে গেছে। আগে যেখানে পড়াশোনা, চাকরি আর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার শত রকম স্বপ্ন ডানা মেলত, সেখানে এখন সূর্য ওঠার পর কেবল একটা চিন্তা, আজকের দিনটা পার হবে তো? দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইলা বলেন, দারিদ্র্য আর দৈনন্দিন সংকটে মানুষ এতটাই বিধ্বস্ত যে পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা তাদের একপাশে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। এখন শুধু বেঁচে থাকাটাই সবার অগ্রাধিকার। কাবুলের ১৮ বছর বয়সী সাকিবা গয়না তৈরির কাজ করেন। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট যখন তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে, সেই দিনটির কথা মনে পড়লে এখনো শিউরে ওঠেন তিনি। অনলাইন মাধ্যমে বহু কষ্টে মাধ্যমিকের পাঠ শেষ করলেও বিমান চালক হওয়ার স্বপ্ন এখন শুধুই অতীত। সাকিবা বলেন, ‘আকাশের দিকে তাকালেই মনে হতো একটা উড়োজাহাজ চালাচ্ছি, ওপর থেকে দেখছি পৃথিবীকে। বাধা ছাড়া স্বাধীনভাবে ওড়ার স্বপ্ন ছিল আমার।

অন্যদের মতো স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছেন সাবেক সংবাদ পাঠিকা জুহালও। বামিয়ান প্রদেশের এই ৩২ বছর বয়সী নারী সরকারের আদেশের পর চাকরি হারান। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘স্টুডিওতে বসে খবর পড়ার দিনগুলো আমার সত্তা আর গর্বের জায়গা ছিল। এখন সকালে ঘুম থেকে উঠি এই চরম বাস্তবতা নিয়ে যে, সারা দিন আমাকে ঘরের চার দেয়ালের ভেতর বন্দি থেকে কাটাতে হবে’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত