সৌদি আরবের তরুণ ক্যালিগ্রাফার ওবায়েদ আল-নাফি। সম্প্রতি তিনি আরবি ক্যালিগ্রাফিতে আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। আরব নিউজের এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের সৃজনশীল যাত্রার বিবর্তন ও গভীর জীবনদর্শনের কথা তুলে ধরেছেন।
প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান গ্লোবাল সেন্টার ফর অ্যারাবিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার পর এই তরুণ শিল্পী তার কাজকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
অনেকের কাছে যেখানে এই অর্জন ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, সেখানে আল-নাফির কাছে এটি হয়ে উঠেছে নতুন এক যাত্রার সূচনা।
বর্তমানে তিনি শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি এবং অর্থপূর্ণ সৃষ্টির অন্বেষণে শৈল্পিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। নিজের সক্ষমতা প্রমাণের চেয়ে ক্যালিগ্রাফির অন্তর্নিহিত ভাবার্থ ফুটিয়ে তোলাকেই তিনি এখন প্রধান সার্থকতা হিসেবে দেখছেন।
তার মতে, এই বিজয় তাকে তৃপ্তির অনুভূতি দেয়নি, বরং তার ওপর আরও বড় দায়িত্ব আরোপ করেছে। তার ভাষায়, প্রকৃত মূল্য কোথায় নিহিত? অর্জনের মুহূর্তে নয়, বরং সেই অর্জনের পর এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতায় নিহিত। এই উপলব্ধি তার শিল্পচর্চাকে আরও গভীর করেছে। এখন তিনি কেবল দক্ষতা প্রমাণে নয়, বরং অর্থের অনুসন্ধানে বেশি মনোযোগী।
তার শিল্পযাত্রা শুরু হয় লেখার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, কোনো টেক্সটকে তিনি আত্মস্থ করেন, তার সঙ্গে বসবাস করেন, যতক্ষণ না তা তার সত্তার অংশ হয়ে ওঠে। এরপর সেই টেক্সটই তাকে তার দৃশ্যমান রূপের দিকে পরিচালিত করে।
স্কেচিং সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি শুধু প্রাথমিক রেখাচিত্র নয়, বরং একটি কাজের ভারসাম্য, ছন্দ, কোথায় তা শ্বাস নেয় এবং কোথায় নীরব হয়ে যায়, তা বোঝার প্রচেষ্টা। আর বাস্তবায়নের মুহূর্তকে তিনি দেখেন সত্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে, যেখানে একটি কাজ হয় জীবন্ত হয়ে ওঠে, নয়তো শুধু প্রচেষ্টা হিসেবেই থেকে যায়।
তিনি মনে করেন- পরিবেশ, স্থাপত্য বা ইতিহাসের অনুষঙ্গ ব্যবহার করার উদ্দেশ্য কেবল তথ্য দেওয়া নয়, বরং দর্শকের অনুভূতিকে স্পর্শ করা। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সম্পর্ক নিয়েও তার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। তার মতে, এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সংঘাত নেই। বরং ঐতিহ্য স্থিতি দেয়, আর আধুনিকতা দেয় স্বাধীনতা। শিকড় যত গভীরে অনুসন্ধান করা যায়, উদ্ভাবন ততই চমৎকার হয়।
সমালোচনাকে তিনি নেতিবাচক নয়, বরং জাগরণের মাধ্যম হিসেবে দেখেন। তার মতে, একটি বাক্যই শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে। এ কারণে তিনি নিজেকে দুটি প্রশ্ন করেন, এই কাজ কি আমাকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং এটি কি আমার পূর্ববর্তী কাজের সঙ্গে নতুন কিছু যোগ করছে। যদি তা না হয়, তবে কাজটি যত সুন্দরই হোক, তা পুনরাবৃত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
প্রযুক্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি সময় ও শ্রম বাঁচায়, কিন্তু অভিজ্ঞতার বিকল্প নয়। প্রকৃত প্রতিযোগিতা অন্যের সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গে বলেও তিনি মনে করেন। তার মতে, বিজয়ী কাজ সবসময় সবচেয়ে সুন্দর নয়, বরং সবচেয়ে প্রভাবশালী ও স্পষ্ট।
তিনি নতুন শিল্পীদের সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত তাড়াহুড়া বা বাহ্যিকতায় মনোযোগী হওয়া প্রতিভার ক্ষতি করতে পারে। ক্যালিগ্রাফির মূলনীতি আয়ত্ত করা, পূর্বসূরিদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা এবং সাহস ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা জরুরি।
সৌদি আরবে শিল্পচর্চার প্রসার ঘটছে বলে উল্লেখ করে আল-নাফি বলেন, সুযোগের অভাব নেই। তবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো জনসাধারণের রুচি উন্নত করা এবং একক দৃষ্টিভঙ্গির বদলে বহুমাত্রিক মতের জন্য জায়গা তৈরি করা।
তার স্বপ্ন ক্যানভাসের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তিনি এমন একটি কাজের কথা বলেন, যা শুধু পড়া নয়, অনুভব করা যায়। এমন এক শিল্প, যার সামনে দাঁড়িয়ে দর্শক নীরব হয়ে যাবে, কারণ তারা এমন কিছু অনুভব করবে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। পাশাপাশি তিনি এমন একটি প্রকল্পের স্বপ্ন দেখেন, যা আরবি ক্যালিগ্রাফিকে জীবন্ত অভিজ্ঞতায় রূপ দেবে এবং সবার জন্য তা উপলব্ধি ও অনুধাবনের পথ উন্মুক্ত করবে।