বাজারে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি নেই। কিন্তু খোলাবাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। সাধারণত দ্রব্যমূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়টি নির্ভর করে বাজারে পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের ওপর। কিন্তু দেশে এ নিয়ম খাটে না। পণ্যের পর্যাপ্ত আমদানি ও সরবরাহ থাকলেও তা বেশি দামে বিক্রি হয়। এর পেছনে কাজ করে বাজার সিন্ডিকেট। পণ্যের ঘাটতি না থাকলেও সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং বাজার তদারকির অভাবে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি অতীতে অসংখ্যবার হয়েছে। ২০২২ সালে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে দেশে সয়াবিন তেল ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। পরে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে পণ্যের দাম কমেনি। ২০২৩-২৪ সালে রমজান ও ঈদের আগে চিনি, ছোলা, ডাল ও ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুদ থাকার পরও অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়িয়েছিল। ৫-৬টি বড় আমদানিকারক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান নিত্যপণ্য বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, যারা চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ায়। আবার জ্বালানির দাম বাড়ার অজুহাতে অধিকাংশ পণ্যের দাম বাড়ে। দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার জন্য সরবরাহ ঘাটতির চেয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজি ও বাজার অব্যবস্থাপনা বেশি দায়ী বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। দীর্ঘসময় সাধারণ মানুষ, বাজারের কারসাজি দেখছে। কিন্তু তারা এতটাই অসহায় যে, কোনো সমন্বিত প্রতিবাদ করতে পারেনি। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে।
সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই রেকর্ড পরিমাণে গম আমদানি হয়েছে। বর্তমানে বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। তবু হঠাৎ করে আটা ও চালের দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শাকসবজি ও মাছ-মাংসের দাম। কৃষি বিভাগ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত আমন মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ চাল ১ কোটি ৮০ লাখ টন উৎপাদিত হয়েছে। অন্তর্র্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ২ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়েছে। খাদ্য বিভাগ বলছে, আমন চালের মজুদ যথেষ্ট পরিমাণে আছে। তারপরও কেন আটা-চালের দাম বাড়ল? এ প্রশ্নের জবাবে একজন ব্যবসায়ী জানান, জ্বালানি তেলের সংকটের সুযোগে অনেক ট্রাক পরিবহনে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে। জানা যাচ্ছে, প্রতি ট্রিপে ৫-৭ হাজার টাকা বাড়তি টাকা যাচ্ছে। এ কারণেই আটা-চালের দাম বেড়েছে। গত বছর এ সময়ে সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে গম আমদানি হয়েছে ৬১ লাখ ৪৪ হাজার টন। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৬৮ লাখ ৬০ হাজার টন। এত মজুদ ও সরবরাহ থাকলেও চাল ও আটার দাম বেড়েছে। যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কার ছায়া যেন ফেলেছে ভোক্তার ওপর। চাল-ডাল-লবণ-মরিচ-আটা-ময়দা, নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে থাকলে শেষ পরিস্থিতি কি সামাল দিতে পারবে কর্র্তৃপক্ষ?
ভোক্তা অধিকার রক্ষার্থে ‘ক্যাব’ কাজ করলেও, সরকার-সংশ্লিষ্ট কেউ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি। এমন পরিস্থিতি সত্ত্বেও বাজার নিয়ন্ত্রণ কর্র্তৃপক্ষ কেন এখনো চুপ আছে! সব ধরনের পণ্য সরবরাহ আশাতীত থাকার পরও, দামের ঊর্ধ্বগতির ফলে সাধারণ মানুষের দমবন্ধ উপক্রম হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারকে আন্তরিক ও সতর্ক থাকতে হবে। সংসদে বিরোধী দলের উচিত, অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর স্বার্থে সম্মিলিতভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কাজ করা। সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের আহামরি চাওয়া নেই। তারা শুধু শান্তি ও নিরাপদে জীবন পার করতে চায়। অমানবিকতা ও পৈশাচিকতার নোংরা দৃষ্টান্ত যারা দলবদ্ধভাবে রাখছে, সরকার আইনানুযায়ী তাদের কঠোর হাতে দমন করবে, এ চাওয়া বেশি কিছু নয়।